আন্তর্জাতিক ডেস্ক : তেহরানের আকাশে যখন আগুনের লেলিহান শিখা আর মুহুর্মুহু বিস্ফোরণের শব্দে রাতের নিস্তব্ধতা খানখান হয়ে ভেঙে পড়ল, তখন গোটা বিশ্ব রুদ্ধশ্বাসে তাকিয়ে ছিল পারস্য উপসাগরের এই প্রাচীন শক্তির দিকে। ইসরায়েল-আমেরিকার যৌথ হামলায় কেঁপে ওঠা ইরানের প্রতিটি অলিগলি এখন যুদ্ধের দামামায় উত্তাল, যেখানে সাধারণ মানুষের মনে কেবল একটিই প্রশ্ন কে চালাচ্ছেন এই দেশ এবং কার ইশারায় নির্ধারিত হবে আগামী দিনের ভাগ্য?
পরিস্থিতি এতটাই বেগতিক যে খোদ সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিতে হয়েছে বলে খবর চাউর হয়েছে। ফলে তেহরানের শাসনব্যবস্থার ভেতরে থাকা গভীর উদ্বেগেরই বহিঃপ্রকাশ ঘটছে।
ইরানের এই টালমাটাল অবস্থায় দেশটির ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু নিয়ে কৌতূহল এখন তুঙ্গে। কারণ সেখানে গণতন্ত্রের মোড়কে লুকিয়ে আছে এক জটিল ধর্মতান্ত্রিক শাসনকাঠামো। আপাতদৃষ্টিতে দেশটিতে একজন নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট এবং সংসদ থাকলেও পর্দার আড়ালে আসল কলকাঠি নাড়েন খোদ সর্বোচ্চ নেতা এবং তাঁর অনুগত একদল প্রভাবশালী সামরিক ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব। যুদ্ধের এই সংকটকালে সাধারণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার চেয়েও গুরুত্ব পাচ্ছে একটি বিশেষ ছোট বৃত্ত, যারা যুদ্ধের নীতি নির্ধারণ থেকে শুরু করে পাল্টা আক্রমণের পরিকল্পনা পর্যন্ত সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছে।
এই বিশাল সাম্রাজ্যের চূড়ায় আসীন ব্যক্তিই হলেন আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। তার হাতে ন্যস্ত রয়েছে রাষ্ট্রের চূড়ান্ত এবং নিরঙ্কুশ ক্ষমতা। ইরানের সংবিধানে তাকে দেওয়া হয়েছে এমন কর্তৃত্ব যেখানে সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান হওয়া থেকে শুরু করে বৈদেশিক নীতির প্রতিটি বাঁক পরিবর্তনের চাবিকাঠি তাঁর হাতেই থাকে। এমনকি রাষ্ট্রের কোনো আইন বা নির্বাহী সিদ্ধান্ত যদি তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে যায়। তিনি সরাসরি ডিক্রি জারির মাধ্যমে তা বাতিল করার ক্ষমতা রাখেন। বিচার বিভাগ থেকে শুরু করে গোয়েন্দা সংস্থা পর্যন্ত প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে তাঁর মনোনীত ব্যক্তিরাই আসীন থাকেন।
সর্বোচ্চ নেতার ক্ষমতার এই দুর্গ পাহারা দেয় ‘গার্ডিয়ান কাউন্সিল’ নামক এক শক্তিশালী ১২ সদস্যের পর্ষদ। যারা মূলত ছাঁকনির মতো কাজ করে। এই কাউন্সিলের ছয়জন সদস্যকে সরাসরি নিয়োগ দেন খামেনি নিজে এবং বাকি ছয়জনও পরোক্ষভাবে তাঁর পছন্দের বৃত্ত থেকেই আসেন। তাদের কাজ হলো সংসদ থেকে পাস হওয়া যেকোনো আইন তদারকি করা এবং নির্বাচনে দাঁড়ানো প্রার্থীদের যোগ্যতা যাচাই করা। ফলে কে প্রেসিডেন্ট হবে বা কে পার্লামেন্টে বসবে, তার চূড়ান্ত অনুমোদন আসে এই কাউন্সিলের মাধ্যমেই, যা মূলত সর্বোচ্চ নেতার ইচ্ছারই প্রতিফলন।
ইরানের শাসনব্যবস্থায় প্রেসিডেন্ট পদটি জনগনের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত মনে হলেও বাস্তবে তা ক্ষমতার এক সীমাবদ্ধ অলিন্দ মাত্র। প্রেসিডেন্ট কেবল দৈনন্দিন শাসনকাজ এবং অর্থনৈতিক বিষয়গুলো দেখাশোনা করেন, কিন্তু প্রতিরক্ষা বা জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত বড় কোনো সিদ্ধান্তে তাঁর একক কোনো হাত নেই। এমনকি মন্ত্রিসভা গঠনের সময়ও তাকে সর্বোচ্চ নেতার অলিখিত সম্মতির দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়। ফলে যুদ্ধের মতো চরম মুহূর্তে প্রেসিডেন্টের ভূমিকা হয়ে পড়ে অনেকটা সর্বোচ্চ নেতার বার্তাবাহকের মতো।
রণক্ষেত্রে এবং গোয়েন্দা তৎপরতায় আসল দাপট দেখায় ইসলামি রেভোল্যুশনারি গার্ড কোর আইআরজিসি, যারা সাধারণ সেনাবাহিনীর সমান্তরালে থেকেও অনেক বেশি শক্তিশালী। এই বাহিনী সরাসরি সর্বোচ্চ নেতার কাছে জবাবদিহি করে এবং দেশের অর্থনীতি থেকে শুরু করে বিদেশের মাটিতে ছায়া যুদ্ধ চালানো পর্যন্ত সবখানেই এদের অবাধ বিচরণ রয়েছে। আইআরজিসির কুদস ফোর্স মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ইরানের প্রভাব বিস্তারের মূল কারিগর হিসেবে কাজ করে, যা দেশটিকে একটি সামরিক শক্তিতে রূপান্তরিত করেছে।
সংকটকালীন সময়ে যখন দ্রুত সিদ্ধান্তের প্রয়োজন হয়, তখন দৃশ্যপটে আসে সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল (এসএনএসসি)। এই কাউন্সিলে সামরিক প্রধান, গোয়েন্দা কর্মকর্তা এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ একত্রিত হয়ে যুদ্ধের কৌশল নির্ধারণ করেন। যদিও এখানে অনেক পক্ষের প্রতিনিধিত্ব থাকে, কিন্তু চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য তাদের সেই সর্বোচ্চ নেতার টেবিল পর্যন্তই দৌড়াতে হয়। এই ব্যবস্থার কারণেই ইরানের শাসনকাঠামো অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে আলাদা, যেখানে ধর্ম ও সামরিক শক্তি এক সুতোয় গাঁথা।
ইরানি জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা নন, বরং সংকটের এই মুহূর্তে দেশটির ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণ করবেন খামেনি এবং তাঁর নিবেদিতপ্রাণ সেনাপতিরা। একের পর এক বিমান হামলা আর ড্রোন বিস্ফোরণের ধোঁয়ার আড়ালে ইরানের এই অনন্য শাসনব্যবস্থা এখন তার ইতিহাসের কঠিনতম পরীক্ষা দিচ্ছে।
সূত্র: গালফ নিউজ
কিউএনবি/অনিমা/০১ মার্চ ২০২৬,/রাত ৫:৫৭