বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬, ০৪:১০ অপরাহ্ন

রোজার নিয়ত— বিধান ও সময়

Reporter Name
  • Update Time : বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৪৮ Time View

ডেস্ক নিউজ : রোজা ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। কিন্তু কেবল সেহরি খাওয়া বা না খাওয়াই রোজার মূল বিষয় নয়— রোজার ভিত্তি হলো নিয়ত। নিয়ত ছাড়া কোনো ইবাদত শুদ্ধ হয় না। তাই রোজার শুদ্ধতার জন্য নিয়তের বিধান, সময় ও পদ্ধতি সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকা জরুরি। নিচে রোজার নিয়ত সম্পর্কিত বিষয়গুলো ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরা হলো।

রোজার নিয়ত করা ফরজ। ‘নিয়ত’ বলা হয় মূলত অন্তরের ইচ্ছাকে। নিয়ত মুখে উচ্চারণ করা জরুরি নয়; বরং অন্তরে দৃঢ় সংকল্প থাকাই যথেষ্ট। কেউ যদি অন্তরে ইচ্ছা করে—‘আগামীকাল আমি রোজা রাখব’— তাহলেই নিয়ত হয়ে যাবে।

তবে মুখে উচ্চারণ করা উত্তম। যারা আরবি জানেন না, তারা বাংলাতেও বলতে পারেন—

‘আমি আগামীকাল রোজা রাখার নিয়ত করলাম।’

কয়েকটি আরবি  নিয়ত তুলে ধরা হলো—

نَوَيْتُ أَنْ أَصُومَ غَدًا مِنْ شَهْرِ رَمَضَانَ هٰذِهِ السَّنَةِ فَرْضًا لِلّٰهِ تَعَالَى

উচ্চারণ: ‘নাওয়াতু আন আছুমা গাদান মিন শাহরি রামাদানা হাজিহিসনাতি ফারদান লিল্লাহি তাআলা।’

অর্থ: ‘আমি এ বছরের রমজান মাসের আগামী দিনের ফরজ রোজা আল্লাহ তাআলার উদ্দেশ্যে রাখার নিয়ত করলাম।’

نَوَيْتُ أَنْ أَصُومَ غَدًا لِلَّهِ تَعَالَى مِنْ شَهْرِ رَمَضَانَ هَذِهِ السَّنَةِ فَرْضًا

উচ্চারণ: ‘নাওয়াতু আন আছুমা গাদান লিল্লাহি তাআলা মিন শাহরি রামাদানা হাজিহিসনাতি ফারদান।’

অর্থ: ‘আমি আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির জন্য এ বছরের রমজান মাসের আগামীকালের ফরজ রোজা রাখার নিয়ত করলাম।’

আরেকটি সংক্ষিপ্ত রূপ—

نَوَيْتُ صَوْمَ غَدٍ عَنْ أَدَاءِ فَرْضِ رَمَضَانَ لِلّٰهِ تَعَالَى

উচ্চারণ: ‘নাওয়াতু আন ছাওমা গাদিন আন আদায়ি ফারদি রমদানা লিল্লাহি তাআলা।’

অর্থ: ‘আমি আগামী দিনের রমজানের ফরজ রোজা আদায়ের নিয়ত করলাম, আল্লাহ তাআলার জন্য।’

আরও সংক্ষিপ্তভাবে বলা যায়—

نَوَيْتُ صَوْمَ غَدٍ لِلَّهِ تَعَالَى فَرْضًا

উচ্চারণ: ‘নাওয়াতু ছাওমা গাদিন লিল্লাহি তাআলা ফারদান।’

অর্থ: ‘আমি আল্লাহ তাআলার জন্য আগামীকালের ফরজ রোজার নিয়ত করলাম।’

ইবাদতের ক্ষেত্রে নিয়তের গুরুত্ব সম্পর্কে হাদিসে এসেছে—

إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ

‘নিশ্চয়ই সব আমল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।’ (বুখারি ১, মুসলিম ১৯০৭)

রমজানের ফরজ রোজার নিয়তের সময়

রমজানের ফরজ রোজার নিয়ত রাতে করা উত্তম। উম্মুল মুমিনিন হজরত হাফসা (রা.) থেকে বর্ণিত—

مَنْ لَمْ يُجْمِعِ الصِّيَامَ قَبْلَ الْفَجْرِ فَلَا صِيَامَ لَهُ

‘যে ব্যক্তি ফজরের আগে রোজা রাখার নিয়ত করবে না, তার রোজা (পূর্ণাঙ্গ) হবে না।’ (আবু দাউদ ২৪৫৪, ১/৩৩৩)

নিয়তের সময় শুরু হয় রোজার আগের দিনের সূর্যাস্তের পর থেকে। যেমন— মঙ্গলবারের রোজার নিয়ত সোমবার সূর্যাস্তের পর থেকে করা যাবে। তবে সোমবার সূর্যাস্তের আগে মঙ্গলবারের রোজার নিয়ত করা যথেষ্ট নয়।

রাতে নিয়ত না করলে কী করবেন?

যদি কেউ রাতে রোজার নিয়ত করতে না পারে, তাহলে দিনে সূর্য ঢলার প্রায় এক ঘণ্টা আগে পর্যন্ত নিয়ত করলে রোজা হয়ে যাবে, তবে শর্ত হলো— সুবহে সাদিকের পর থেকে নিয়তের পূর্ব পর্যন্ত রোজা ভঙ্গকারী কোনো কাজ করা যাবে না।

অর্থাৎ সুবহে সাদিকের পর কিছু খাওয়া, পান করা বা রোজা নষ্টকারী কিছু করলে পরে নিয়ত করার সুযোগ থাকবে না।

এ বিষয়ে সালামা ইবনুল আকওয়া (রা.) বলেন— ‘(আশুরার রোজা যখন ফরজ ছিল) আল্লাহর রাসুল (সা.) আসলাম গোত্রের এক ব্যক্তিকে ঘোষণা করতে বললেন—যে সকাল থেকে কিছু খায়নি, সে বাকি দিন রোজা রাখবে।’ (বুখারি ২০০৭)

এ বর্ণনা থেকে দিনের মধ্যে নিয়তের বৈধতার দলিল পাওয়া যায়।

ফিকহি দৃষ্টান্ত

আবদুল করিম জাযারি (রহ.) বলেন, এক রমজানে সকালে কিছু লোক চাঁদ দেখার সাক্ষ্য দিলে ওমর ইবনে আবদুল আজিজ (রহ.) বলেন— ‘যে ব্যক্তি ইতিমধ্যে কিছু খেয়েছে, সে বাকি দিন খাওয়া থেকে বিরত থাকবে; আর যে খায়নি, সে বাকি দিন রোজা রাখবে।’ (বাদায়েউস সানায়ে ২/২২৯)

প্রতিটি রোজার জন্য পৃথক নিয়ত

পুরো রমজানের জন্য একবারে নিয়ত যথেষ্ট নয়; বরং প্রত্যেক দিনের রোজার জন্য আলাদা নিয়ত করতে হবে। কারণ প্রতিটি রোজা স্বতন্ত্র আমল, আর প্রতিটি আমলের জন্য নিয়ত জরুরি।

সেহরি না খেলেও রোজা হবে?

রোজা রাখার জন্য সাহরি খাওয়া শর্ত নয়। কেউ যদি রাতে নিয়ত করে ঘুমিয়ে পড়ে এবং সুবহে সাদিকের পর জেগে ওঠে—তার রোজা শুদ্ধ হবে। এমনকি রাতে নিয়ত না করলেও, সুবহে সাদিকের পর (রোজা ভঙ্গকারী কিছু না করলে) নিয়ত করলে রোজা শুদ্ধ হবে—ফরজ রমজানের রোজার ক্ষেত্রে।

নফল, কাজা ও কাফফারার রোজার নিয়ত

নফল রোজা: রমজানের রোজার মতোই; দিনে নিয়ত করা যায় (শর্তসাপেক্ষে)।

কাজা ও কাফফারা রোজা: অবশ্যই রাতে নিয়ত করতে হবে। সুবহে সাদিকের পর নিয়ত গ্রহণযোগ্য নয়।

মানতের রোজা (অনির্দিষ্ট দিন): আগের দিন সূর্যাস্তের পর থেকে সুবহে সাদিকের আগ পর্যন্ত নিয়ত করতে হবে।

একাধিক রোজা কাজা থাকলে

যদি কারও একাধিক রমজানের কাজা রোজা থাকে, তাহলে নিয়তের সময় নির্দিষ্ট করে বলতে হবে— কোন রমজানের কাজা আদায় করছে। তবে যদি সংখ্যা বেশি হয়ে নির্দিষ্ট করা কঠিন হয়, তাহলে এভাবে নিয়ত করতে পারবে—

‘জীবনের সর্বপ্রথম কাজা রোজা রাখলাম।’

রোজার শুদ্ধতা নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। নিয়ত মূলত অন্তরের অঙ্গীকার, যা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা হয়। মুখে উচ্চারণ উত্তম হলেও শর্ত নয়। সঠিক সময়ে সঠিক নিয়ত করা রোজার পূর্ণতা নিশ্চিত করে।

আসুন, আমরা রোজাকে কেবল বাহ্যিক সংযমে সীমাবদ্ধ না রেখে— সচেতন নিয়ত, আন্তরিক ইবাদত ও আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে আদায় করি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সব রোজা কবুল করুন। আমিন।

 

 

কিউএনবি/আয়শা/১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬,/রাত ১১:১৯

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

May 2026
M T W T F S S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
2627282930  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit