ডেস্ক নিউজ : রমজান মাস মুসলমানদের জন্য সিয়াম, তাকওয়া ও আত্মশুদ্ধির মাস। প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থমস্তিষ্ক মুসলিমদের ওপর রোজা ফরজ। তবে ইসলাম একটি সহজ ও মানবিক জীবনব্যবস্থা; তাই বিশেষ কিছু অবস্থায় রোজার বিধানে শিথিলতা রাখা হয়েছে। কারও ক্ষেত্রে পরে কাজা করতে হয়, কারও ক্ষেত্রে ফিদিয়া যথেষ্ট, আবার কারও ওপর কোনো দায়ই বর্তায় না। নিচে শরিয়তের আলোকে সেই বিধানগুলো সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো।
১. মুসাফিরের রোজা
সফর অবস্থায় মুসাফিরের জন্য রোজা না রাখার অনুমতি রয়েছে। পরে সুবিধামতো তা কাজা করে নেওয়া যাবে। তবে কষ্ট বেশি না হলে সফরেও রোজা রাখা উত্তম।হজরত আনাস ইবনে মালিক (রা.)-কে সফরে রোজা রাখার বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন—
رُخِّصَ لِلْمُسَافِرِ فِي الْفِطْرِ، وَالصَّوْمُ أَفْضَلُ
‘মুসাফিরের জন্য রোজা না রাখার অনুমতি আছে; তবে রোজা রাখা উত্তম।’ (মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা ৯০৬৭)
তবে সফরে রোজা রাখলে তা বিনা ওজরে ভাঙা জায়েজ নয়। ভাঙলে গুনাহ হবে, যদিও কাফফারা নয়—শুধু কাজা করতে হবে। (রদ্দুল মুহতার ২/৪৩১)
সফরের রুখসত (ছাড়) তখনই প্রযোজ্য, যখন সুবহে সাদিকের সময় ব্যক্তি মুসাফির থাকে। যদি সুবহে সাদিকের সময় মুকিম থাকে, তাহলে দিনের বেলায় সফরের নিয়ত থাকলেও রোজা না রাখার সুযোগ নেই।
মুসাফির ব্যক্তি দিনের শেষে মুকিম হয়ে গেলে অবশিষ্ট সময় পানাহার থেকে বিরত থাকবে এবং পরে কাজা করবে। হজরত হাসান আল-বাসরি (রহ.) বলেন—
‘যে মুসাফির রমজানের দিনে আহার করেছে, পরে মুকিম হলে দিনের বাকি অংশে পানাহার থেকে বিরত থাকবে।’ (মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা ৯৪৩৬; ফাতাওয়া তাতারখানিয়া ৩/৪২৮)
২. হায়েজ ও নেফাসগ্রস্ত নারীর রোজা
রমজানের দিনে হায়েজ বা নেফাসগ্রস্ত নারী রোজা রাখবেন না। পরবর্তীতে ওই দিনগুলোর কাজা করতে হবে। যদি দিনের মধ্যে পবিত্র হন, তাহলে দিনের অবশিষ্ট সময় রমজানের সম্মানার্থে পানাহার থেকে বিরত থাকবেন এবং পরবর্তীতে সেই দিনেরও কাজা করবেন। (মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা ৬/২২১, ৯৪৩২; ফাতাওয়া তাতারখানিয়া ৩/৪২৮)
৩. অসুস্থ ব্যক্তির রোজা
রোজা রাখলে রোগ বৃদ্ধি বা সুস্থ হতে বিলম্ব হওয়ার প্রবল আশঙ্কা থাকলে রোজা না রাখার অনুমতি আছে। সুস্থ হওয়ার পর কাজা করে নিতে হবে। তবে সাধারণ বা হালকা অসুস্থতার অজুহাতে রোজা ভাঙা বৈধ নয়। (আলমুহিতুল বুরহানি ৩/৩৫৯, দুররুল মুখতার ২/৪২২)
৪. গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী নারীর রোজা
গর্ভবতী নারী রোজা রাখলে নিজের বা সন্তানের ক্ষতির আশঙ্কা হলে রোজা না রাখার অনুমতি আছে। একইভাবে স্তন্যদানকারী মা যদি আশঙ্কা করেন যে রোজার কারণে শিশুর কষ্ট হবে, তাহলে তিনি রোজা না রাখতে পারেন। পরে কাজা করতে হবে। এ বিষয়ে হাদিসে এসেছে—
إِنَّ اللَّهَ وَضَعَ عَنِ الْمُسَافِرِ الصَّوْمَ وَشَطْرَ الصَّلَاةِ، وَعَنِ الْحَامِلِ وَالْمُرْضِعِ الصَّوْمَ
‘নিশ্চয়ই আল্লাহ মুসাফিরের ওপর থেকে রোজা ও অর্ধেক নামাজ (চার রাকাতকে দুই) হালকা করেছেন; আর গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারীর ওপর থেকেও রোজা শিথিল করেছেন।’ (তিরমিজি ৭১৫; রদ্দুল মুহতার ২/৪২২)
৫. দুর্বল বৃদ্ধ ব্যক্তির রোজা
বার্ধক্য বা জটিল অসুস্থতার কারণে যিনি রোজা রাখার সামর্থ্য হারিয়েছেন এবং ভবিষ্যতেও কাজা করার সম্ভাবনা নেই—তার জন্য রোজা রাখা জরুরি নয়। তিনি প্রতি রোজার পরিবর্তে ফিদিয়া প্রদান করবেন।
৬. নাবালেগ শিশুদের রোজা
নাবালেগ শিশুদের ওপর রোজা ফরজ নয়। তবে তারা যখন শারীরিকভাবে সক্ষম হয়, তখন থেকে ধীরে ধীরে রোজায় অভ্যস্ত করে তোলা উচিত। বালেগ হওয়ার পর রোজা ফরজ হয়ে যায়। রুবাইয়ি বিনতে মুয়াওয়িজ (রা.) বলেন—
كُنَّا نَصُومُ عَاشُورَاءَ، وَنُصَوِّمُ صِبْيَانَنَا، وَنَجْعَلُ لَهُمُ اللُّعَبَ مِنَ الْعِهْنِ، فَإِذَا بَكَى أَحَدُهُمْ عَلَى الطَّعَامِ أَعْطَيْنَاهُ ذَاكَ حَتَّى يَكُونَ عِنْدَ الْإِفْطَارِ
‘আমরা আশুরার রোজা রাখতাম এবং আমাদের শিশুদেরও রোজা রাখাতাম। তাদের জন্য পশমের খেলনা বানাতাম। কেউ খাবারের জন্য কাঁদলে তাকে খেলনা দিতাম— এভাবে ইফতার পর্যন্ত সময় কাটত।’ (বুখারি ১৯৬০)
ইসলামে রোজা ফরজ ইবাদত হলেও তা কষ্টসাধ্য করে তোলাই উদ্দেশ্য নয়। বরং আল্লাহ তাআলা বান্দার সামর্থ্য, অবস্থা ও প্রয়োজন বিবেচনায় বিধানে শিথিলতা দিয়েছেন। সফর, অসুস্থতা, মাতৃত্ব বা বার্ধক্য—প্রত্যেক অবস্থার জন্য রয়েছে সুবিন্যস্ত নির্দেশনা। অতএব, নিজের অবস্থা বিবেচনায় শরিয়তের বিধান জেনে আমল করাই হলো উত্তম পথ। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সহিহভাবে রোজা পালনের তাওফিক দান করুন। আমিন।
কিউএনবি/খোরশেদ/১৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬,/রাত ১১:৪০