আন্তর্জাতিক ডেস্ক : নতুন বছরের প্রথম সপ্তাহেই পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নতুন মাত্রা পেয়েছে। পাকিস্তান বিমান বাহিনীর প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল জহির আহমেদ বাবর সিধু এবং বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খানের বৈঠকের পর পাকিস্তান সেনাবাহিনী জানিয়েছে, বাংলাদেশে তাদের নিজস্বভাবে তৈরি জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান বিক্রির সম্ভাবনা জোরালো হয়েছে।
সুপার মুশশাক একটি হালকা প্রশিক্ষণ বিমান, যা দুই থেকে তিন আসনের এবং একক ইঞ্জিনবিশিষ্ট। পাকিস্তান ছাড়াও আজারবাইজান, তুরস্ক, ইরান ও ইরাকসহ ১০টির বেশি দেশে এটি ব্যবহৃত হচ্ছে। এর পরদিনই বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, পাকিস্তান ও সৌদি আরব প্রায় ২০০ কোটি ডলারের সৌদি ঋণকে জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান চুক্তিতে রূপান্তরের বিষয়ে আলোচনা করছে।
এটি দুই দেশের মধ্যে সাম্প্রতিক প্রতিরক্ষা চুক্তির ধারাবাহিকতা। একই সময়ে ডিসেম্বরের শেষ দিকে লিবিয়ার বিদ্রোহী গোষ্ঠী লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মির (এলএনএ) সঙ্গে প্রায় ৪০০ কোটি ডলারের একটি সম্ভাব্য অস্ত্রচুক্তির খবরও প্রকাশ পায়, যেখানে জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান অন্তর্ভুক্ত থাকার কথা বলা হয়।যদিও পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে এসব চুক্তি নিশ্চিত করেনি এবং বাংলাদেশ এখনো কেবল আগ্রহ প্রকাশ করেছে, বিশ্লেষকদের মতে ২০২৫ সালের সামরিক ঘটনাপ্রবাহ জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমানের গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়েছে।
২০০৭ সালে প্রথম প্রকাশিত এই যুদ্ধবিমানের ব্লক-১ সংস্করণ ২০০৯ সালে এবং উন্নত ব্লক-৩ সংস্করণ ২০২০ সালে পরিষেবায় যুক্ত হয়। ব্লক-৩ সংস্করণকে ৪.৫ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান হিসাবে ধরা হয়। এতে রয়েছে এএইসএ রাডার, আধুনিক ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ব্যবস্থা, আকাশ-থেকে-আকাশ ও আকাশ-থেকে-ভূমি আঘাতের সক্ষমতা এবং বিয়ন্ড-ভিজ্যুয়াল-রেঞ্জ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের সুযোগ।
২০১৫ সালে মিয়ানমার প্রথম জেএফ-১৭ কেনে। এরপর ২০২১ সালে নাইজেরিয়া এবং ২০২৪ সালে আজারবাইজান এই যুদ্ধবিমান নিজেদের বহরে যুক্ত করে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে আজারবাইজান তাদের বিজয় দিবসে জেএফ-১৭ প্রদর্শন করে। এছাড়া ইরাক, শ্রীলঙ্কা ও সৌদি আরব অতীতে আগ্রহ দেখালেও চুক্তি হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, জেএফ-১৭-এর মূল আকর্ষণ এর তুলনামূলক কম দাম (প্রতি ইউনিট আনুমানিক ২৫–৩০ মিলিয়ন ডলার), কম রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এবং রাজনৈতিক শর্তহীন বিক্রির সুযোগ। যেখানে রাফাল বা গ্রিপেনের মতো যুদ্ধবিমানের দাম ৯০ থেকে ১০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি, সেখানে জেএফ-১৭ অনেক দেশের জন্য সাশ্রয়ী বিকল্প।
২০২৫ সালের মে মাসে ভারত-পাকিস্তান চার দিনের যুদ্ধে পাকিস্তান বিমান বাহিনীর কার্যকারিতা আলোচনায় আসে। যদিও জেএফ-১৭ সরাসরি ভূপাতিত করার ঘটনায় ব্যবহৃত হয়নি বলে দাবি করা হয়, পাকিস্তানের মতে এটি যুদ্ধ গঠনে সক্রিয় ছিল। এসব ঘটনা পাকিস্তানকে তাদের বিমান রপ্তানি জোরদারে সুযোগ করে দিয়েছে।
একজন নিরাপত্তা বিশ্লেষক বলেন, জেএফ-১৭ হয়তো সর্বাধুনিক নয়, কিন্তু এটি ‘গুড এনাফ’ একটি বহুমুখী যুদ্ধবিমান, যা সীমিত বাজেটের দেশগুলোর জন্য কার্যকর। বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৪ সালে সরকার পরিবর্তনের পর বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্ক নতুন দিকে মোড় নিয়েছে। জেএফ-১৭ বা সুপার মুশশাক কেনা কেবল অস্ত্র কেনা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারত্বের ইঙ্গিত।
একজন অবসরপ্রাপ্ত পাকিস্তানি এয়ার কমোডর বলেন, যুদ্ধবিমান কেনা মানে ৩০–৪০ বছরের অঙ্গীকার। এতে প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও কৌশলগত সমন্বয় জড়িত। বাংলাদেশ যদি জেএফ-১৭ বা চীনা জে-১০-এর দিকে এগোয়, তবে ভবিষ্যৎ কৌশলগত অবস্থানও স্পষ্ট হয়ে যাবে। সব মিলিয়ে, সাশ্রয়ী মূল্য, যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা এবং পশ্চিমা শর্তমুক্ত বিকল্প হিসাবে জেএফ-১৭ আজ পাকিস্তানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামরিক রপ্তানি পণ্যে পরিণত হয়েছে।
কিউএনবি/মহন/১০ জানুয়ারি ২০২৬,/দুপুর ১:০০