আলমগীর মানিক, রাঙামাটি : রাঙামাটিতে দীর্ঘ দুই দশক ধরে চলা বিশুদ্ধ পানির সংকট নিরসনে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)–এর অর্থায়নে ৩৩৪ কোটি টাকার পানি সরবরাহ প্রকল্প দ্রুত এগিয়ে চলছে। পাহাড়ি বৈচিত্র্য ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতায় দীর্ঘদিন ধরে পানি সংকটে ভোগা রাঙামাটিবাসীর জীবনে বড় পরিবর্তন আনবে এই প্রকল্প এমনটি ধারনা স্থানীয়দের।

রাঙামাটির জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (ডিপিএইচই)থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানাগেছে, “পার্বত্য চট্টগ্রামে সমন্বিত ও টেকসই পৌর পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন” প্রকল্পের আওতায় রাঙামাটি পৌর এলাকায় ২৫ এমএলডি ক্ষমতার আন্তর্জাতিক মানের অত্যাধুনিক ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট নির্মাণ করা হচ্ছে।

প্রকল্পের অংশ হিসেবে পর্যটন শহরজুড়ে ৮,৩০০ মিটার সঞ্চালন লাইন এবং প্রায় ২০০ কিলোমিটার বিতরণ লাইন নির্মাণ চলছে। বর্তমানে মাত্র ৩০ শতাংশ মানুষ পানি পেলেও প্রকল্প শেষ হলে পৌর এলাকার ১০০ শতাংশ নাগরিক নিরাপদ পানির আওতায় আসবে। ইতোমধ্যে কাপ্তাই হ্রদের পানি শোধন করে পৌরসদরে সরবরাহ শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছে জনস্বাস্থ্য বিভাগ। ২০৫০ সাল পর্যন্ত বাড়তে থাকা জনসংখ্যার চাহিদা পূরণে এটি সক্ষম হবে বলেও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এছাড়াও পৌর এলাকার বাইরের বিচ্ছিন্ন আইল্যান্ডগুলোর জন্য স্থাপন করা হচ্ছে ১৩টি উৎপাদক নলকূপ ও স্বতন্ত্র পাইপলাইন ব্যবস্থা। জেলার ১০টি উপজেলার ৫০টি ইউনিয়নে স্থাপন করা হয়েছে ১,৮০০টি পানির উৎস ও ১৮০টি কমিউনিটি– বেইজড পাইপড ওয়াটার সাপ্লাই স্কিম, যেগুলো থেকে প্রতিটি স্কিমে নিয়মিত পানি পাচ্ছে ৮– থেকে ১০ পরিবার।
পাশাপাশি সাজেকসহ দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে ১৩টি রুরাল পাইপড ওয়াটার সাপ্লাই স্কিমের কাজ দ্রুত এগোচ্ছে জানিয়ে জনস্বাস্থ্য বিভাগ কর্তৃপক্ষ জানায়, সাজেকের পর্যটন এলাকায় নির্মিত হচ্ছে ১০০ ঘনমিটার/ঘণ্টা ক্ষমতার পানি শোধনাগার, ৬ কিলোমিটার সঞ্চালন এবং ১২ কিলোমিটার বিতরণ লাইন, যা পর্যটন রিসোর্ট, স্থানীয় গ্রামসহ আশপাশের বসতিগুলোতে প্রথমবারের মতো টেকসই পানি সুবিধা দেবে।
কাপ্তাই উপজেলার বিজিবি ক্যাম্পে, বাঘাইছড়ির সাজেক থানা এলাকায় মাচালং বাজারে ভূ-উপরস্থ পানি শোধনাগার নির্মাণকাজ বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। পাশাপাশি ভূ-গর্ভস্থ পানি সরবরাহের ১০টি প্যাকেজের মধ্যে কাপ্তাইয়ের চন্দ্রঘোনা ইউনিয়ন, লংগদুর গাথাছড়া, রাজস্থলী উপজেলার পরিষদ এলাকা, কাউখালীর রাঙ্গীপাড়া এলাকায় কাজ চলমান ও বাকী ০৫টি প্যাকেজের দরপত্র প্রক্রিয়াধীন আছে। উক্ত ১০টি রুরাল পাইপড ওয়াটার সাপ্লাই স্কীমে উৎপাদক নলকূপের স্থাপনপূর্বক ওভারহেড ট্যাংক ও পানি সরবরাহ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে নিরাপদ পানি সরবরাহ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে। প্রতিটি স্কীমে অন্তত ২০০ পরিবার নিরাপদ পানির সুবিধাভোগ করবে বলে জানিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিভাগ কর্তৃপক্ষ।
স্বাস্থ্যবিধি উন্নয়নে নির্মাণ করা হয়েছে ১০টি পাবলিক টয়লেট এবং সাজেকে উন্নত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রস্তুতির কাজ চলছে। এছাড়া পিইডিপি-৪ প্রকল্পে জেলার দুর্গম বিদ্যালয়গুলোতে স্থাপন করা হয়েছে ৪২৮টি ওয়াশব্লক ও ৩৯৫টি গভীর নলকূপ, যা পাহাড়ি শিশুদের স্যানিটেশন ও নিরাপদ পানির নিশ্চয়তা দিয়েছে।
রাঙামাটি জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী পরাগ বড়ুয়া জানিয়েছেন, আধুনিক ও টেকসই পানি ব্যবস্থার পথে রাঙামাটি অনেকদূর এগিয়েছে। তিনি বলেন, সাজেক পর্যটন এলাকাসহ রাঙামাটি জেলার বিভিন্ন পাথুরে এলাকায় নিরাপদ পানি সরবরাহ প্রকল্পের আওতায় ঝর্ণার পানি পরিশোধনের নিমিত্তে ৪৮টি জিএফএস সিস্টেমের মাধ্যমে রাঙামাটি জেলার বিভিন্ন দূর্গম উপজেলায় পানি সরবরাহ চলমান আছে। এতে করে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমবে, প্রাকৃতিক দুর্যোগে সংকট হ্রাস পাবে এবং বিশুদ্ধ পানি নিশ্চিত হলে স্থানীয়দের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমার পাশাপাশি পর্যটন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সামগ্রিক জীবনমানে বৈপ্লবিক উন্নয়ন ঘটবে।
রাঙামাটি জেলায় দীর্ঘ কয়েক দশক সময়কালে ধারাবাহিকভাবে সৃষ্ট বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট নিরসনে জনস্বাস্থ্য বিভাগের ৩৩৪ কোটি টাকার এই সমন্বিত প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে রাঙামাটিবাসীর দীর্ঘদিনের বিশুদ্ধ পানির সংকট নিরসন হবে এমনটাই স্থানীয়দের প্রত্যাশা।
কিউএনবি/আয়শা/২৯ নভেম্বর ২০২৫,/রাত ৯:২৩