এম এ রহিম চৌগাছা (যশোর) : যশোরের চৌগাছায় ইটভাটায় অভিযান চালিয়ে দুই লাখ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। শুক্রবার (২১ ফেব্রুয়ারী) বিকেলে উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের চৌগাছা-মহেশপুর সড়কের ফাঁসতলা এলাকায় মোল্লা ভাটাই অভিযান চালান উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) তাসনিম জাহান। জানা যায়, উপজেলার বিভিন্ন স্থানে ১৫টি ইট ভাটা রয়েছে। যার মধ্যে বেশির ভাগ ইটভাটায় লাইসেন্স নেই। অনুমতিবিহীন এ সকল ভাটাই সার্বক্ষণিক ইট পোড়ানো হচ্ছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র না পেলেও রহস্যজনক ভাবে ভাটাগুলোতে পুড়ানো হচ্ছে ইট। ফলে হুমকির মুখে পড়েছে ফসলি জমি ও প্রাকৃতিক পরিবেশ।
শুক্রবার (২১ ফেব্রুয়ারী) বিকেলে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) তাসনিম জাহান অভিযান চালান। এ সময় তিনি মোল্লা ব্রিক ফিল্ডের ইট পোড়ানোর ক্ষেত্রে জ্বালানী হিসেবে কাঠ ব্যবহার ও ১২০ ফিট নিষিদ্ধ চিমনি ব্যবহারের দায়ে দুই লক্ষ টাকা জরিমানা আদায় করেন। ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩ অনুসারে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে এ জরিমানা করা হয়। এ ছাড়াও এ ধরণের কাজ থেকে বিরত থাকার জন্য সতর্কতা প্রদান করেন।
যশোর পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী উপ-পরিচালক জানান, চৌগাছা উপজেলায় যেসব ইটভাটার পরিবেশের ছাড়পত্র নেই, রুটিং অভিযানের মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে অচিরেই ব্যবস্থা নেয়া হবে। ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০১৩ (সংশোধন ১ জুলাই ২০১৯ থেকে কার্যকর) এ বলা হয়েছে, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র সংরক্ষণ ও উন্নয়নের স্বার্থে আধুনিক প্রযুক্তির অর্থাৎ জিগজ্যাগ ক্লিন, হাইব্রিড হফম্যান ক্লিন, টানেল ক্লিন বা অনুরূপ উন্নততর কোনো প্রযুক্তির ইটভাটা স্থাপন করতে হবে। পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে ছাড়পত্র এবং জেলা প্রশাসকের অনুমোদন বা লাইসেন্স না নিয়ে ইটভাটা চালু করা যাবে না। আর এই আইন অমান্য করলে ১০ বছরের কারাদন্ড ও ১০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে।
তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, উপজেলার হাকিমপুর ইউনিয়নে চৌগাছা-কোটচাদপুর সড়ক ঘেঁষে, নারায়নপুর ইউনিয়নে চৌগাছা-মহেশপুর সড়ক ঘেঁষে ও স্বরুপদাহ ইউনিয়নে চৌগাছা-পুড়াপাড়া সড়ক ঘেঁষে ও বিভিন্ন এলাকায় ১৫টি ইটভাটা রয়েছে। এ সব ইটভাটার দুএকটি ছাড়া কোনোটিরই হালনাগাদ লাইসেন্স নবায়ন নেই। অভিযোগ রয়েছে, অধিকাংশ ইটভাটায় শিশু ও নারী শ্রমিক দিয়ে কাজ করানো হয়ে থাকে। এমনকি ইট তৈরিতে ৬ থেকে ৭ ধরনের ডাইস ব্যবহার করা হয় এবং ইটের সাইজ ছোট-বড় করে প্রতিনিয়তই ক্রেতাদের সাথে প্রতারণা করা হচ্ছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ইটভাটা মালিক জানান, এ উপজেলায় কোনো ভাটারই লাইসেন্স নবায়ন নেই। কিভাবে চলে প্রশ্ন করা হলে তারা জানান, জেলা প্রশাসন ও বন বিভাগ থেকে শুরু করে প্রতিটি সেক্টর ম্যানেজ করেই ভাটা চালানো হয়ে থাকে। আর এসব ম্যানেজ করে থাকেন উপজেলা ইটভাটা মালিক সমিতি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভাটা মালিক বলেন, লাইসেন্স নবায়নের কাগজ কারো নেই। তারপরেও সব দিক ম্যানেজ করে বরাবর যেভাবে চালানো হয়, এ বছরও সেভাবেই ভাটাগুলো পরিচালিত হচ্ছে। সরকার ভাটাগুলো ভেঙে দিলে তাদের কিছুই করণীয় নেই।
দেওয়ান ব্রিক্সের মালিক ও ভাটা সমিতির সভাপতি দেওয়ান তৌহিদুর রহমান বলেন, এ উপজেলায় ১৫টি ইটভাটা রয়েছে। দু একটি ছাড়া কোনোটারই লাইসেন্স নবায়ন নেই। আমরা নবায়নের জন্য যশোর পরিবেশ অধিদপ্তরে লাইসেন্স নবায়নের জন্য সকল কাগজপত্রাদি জমা দিয়েছি। পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে সকল ভাটার লাইসেন্স নবায়ন বন্ধ করে রেখেছেন। তবে প্রতিটি ভাটা মালিক তাদের আয়কর, ভাটার ভ্যাট ও ট্যাক্স সরকারি চালানের মাধ্যমে সরকারের ঘরে জমা দিচ্ছেন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মুসাব্বির হুসাইন বলেন, ইটভাটায় ফসলি জমির টপসয়েল কেটে নেয়ায় জমির উর্বরতা হ্রাস পাচ্ছে। ভাটায় পুড়ানো হচ্ছে কাঠ ফলে উজাড় হচ্ছে খেজুর গাছ ও বন। কালো ধোঁয়ার ভারী শিষায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি সাধন করে। এ অবস্থা চলতে থাকলে ফসলি জমি বন্ধা হয়ে পড়বে। চৌগাছা উপজেলা সরকারি মডেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার বলেন, ভাটার কালো ধোঁয়ার ভারী শিষায় মানবদেহে এজমা, হাঁপানি, সিওপিডি ও ফুসফুসিতে মারাত্মক ক্ষয়ব্যাধি বাসা বাঁধতে পারে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা ইসলাম বলেন, আমার জানা মতে এ উপজেলায় দু-একটি ভাটার কেবল লাইসেন্স নবায়ন আছে বাকী ভাটা গুলোর নেই। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযান শুরু হয়েছে এটা অব্যহত থাকবে।
কিউএনবি/আয়শা/২২ ফেব্রুয়ারী ২০২৫,/বিকাল ৫:৪০