ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন এন্ড জেণ্ডার স্টাডিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক অমিয় সৃজন সাম্য’র বিরুদ্ধে একই বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থীকে যৌন নিপীড়ন ও প্রতারণার অভিযোগের তদন্তে অগ্রগতি না পেয়ে আশু প্রতিকার চেয়েছেন অভিযোগকারী ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী।জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক অমিয় সৃজন সাম্য’র বিরুদ্ধে ভুক্তভোগী নারী শিক্ষার্থী যৌন নিপীড়ন ও প্রতারণার প্রতিকার চেয়ে গত ৮ অক্টোবর ২০২৩ তারিখে বিভাগের চেয়ারপার্সনের বরাবর লিখিত অভিযোগ জমা দেন। অভিযোগপত্রে ওই শিক্ষার্থী উল্লেখ করেন, অমিয় সৃজন সাম্য তাকে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সম্পর্ক শুরু করেন। পরবর্তীতে এই সম্পর্কের ভিত্তিতে তার অনিচ্ছাসত্ত্বেও তাকে শারীরিক সম্পর্কে বাধ্য করে। এই ঘটনায় অভিযোগকারী ভেঙে পড়লে অভিযুক্ত শিক্ষক বারবার বিয়ের বিষয়ে আশ্বস্ত করেন। কিন্তু পরবর্তীতে তাদের সম্পর্ক চলাকালীন সময়েই ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে অভিযুক্ত শিক্ষক গোপনে অন্য মেয়েকে বিয়ে করেন।
অভিযোগকারী শিক্ষার্থী একইসঙ্গে সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য ড. মোঃ আখতারুজ্জামানের নিকট অভিযোগ পত্রের অনুলিপি জমা দেন। এদিকে বিভাগের চেয়ারপার্সন ড. উম্মে বুশরা ফাতেহা সুলতানার কাছে অভিযোগটা আসার পর তিনি তৎকালীন উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. আখতারুজ্জামান বরাবর অভিযোগটি ফরওয়ার্ড করে দেন।ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর অভিযোগের প্রেক্ষিতে সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. জিয়া রহমানকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের একটি ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি (ঘটনা অনুসন্ধান কমিটি) গঠন করেছিলেন তৎকালীন ভিসি অধ্যাপক ড. মোঃ আখতারুজ্জামান। নবাগত উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এস এম মাকসুদ কামাল নভেম্বরের শুরুতে দায়িত্ব গ্রহণের পর তাঁর সঙ্গে দেখা করে বিষয়টি মৌখিকভাবে অবহিত করেন ওই শিক্ষার্থী। এ বিষয়টি সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন তদরকি করছেন বলেও উপাচার্য ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীকে আশ্বস্ত করেন।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী জানান, “আমি ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে অভিযোগ করার পর দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও উল্লেখযোগ্য কোন অগ্রগতি দেখতে পাচ্ছি না। ফ্যাক্টচেকিংয়ের পর থেকে চলমান তদন্ত প্রক্রিয়া যেন থেমে আছে। বিচারে বিলম্ব হওয়ার পেছনে কি কারণ থাকতে পারে সে বিষয়ে আমি অবগত না। দ্রুততম সময়ে আমি এই অভিযোগের সমাধান চাই”।এই বিষয়ে ঘটনা অনুসন্ধান কমিটির প্রধান সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ড. জিয়া রহমান জানান, “আমরা ইতোমধ্যেই ঘটনায় অভিযুক্ত এবং অভিযোগকারী উভয়ের বক্তব্য নিয়েছি। কমিটির এক সদস্য বিদেশে ছিলেন বিধায় তদন্ত রিপোর্ট জমা দিতে দেরি হচ্ছে”।
বিভাগের শিক্ষার্থী উপদেষ্টা অমিয় সৃজন সাম্য কর্তৃক পক্ষপাতমূলক আচরণের বিচারের দাবিতে গত ১৪ সেপ্টেম্বর (২০২৩) তারিখ ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন এবং অবস্থান কর্মসূচি পালন করে বিভাগের কয়েকজন পুরুষ শিক্ষার্থী। তারা আরও অভিযোগ করেন শিক্ষার্থী উপদেষ্টা অমিয় সৃজন সাম্য কর্তৃক স্বজনপ্রীতি, পক্ষপাতিত্বমূলক আচরণ বিভাগের ছেলেদের জন্য শিক্ষার পরিবেশ হুমকিজনক করে তুলছে ।তিনি ক্লাস গ্রহণে অনিয়মিত এবং শিক্ষার্থীদের ব্যাপারে উদাসীন বলেও জানা গেছে।
এদিকে যৌন নিপীড়নের দায়ে অভিযুক্ত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ এন্ড ইনফরমেটিক্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জাবি শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি এবং বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের সাবেক সহ-সভাপতি মাহমুদুর রহমান জনিকে ২০ ফেব্রুয়ারি সিন্ডিকেট সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে গত ১২ ফেব্রুয়ারি গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. নাদির জুনাইদকে ৩ মাসের বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ করেন তারই বিভাগের একজন নারী শিক্ষার্থী।
কিন্তু সাড়ে চার মাস অতিবাহিত হলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক অমিয় সৃজন সাম্য’র বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তে অগ্রগতি না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন অভিযুক্ত শিক্ষার্থী। যৌন নিপীড়নের শিকার হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯০ শতাংশ ছাত্রীই অভিযোগ করেন না বলে জানান বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ। যৌন নিপীড়নের ফলে নারীদের জন্য ক্রমেই অনিরাপদ হয়ে উঠছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো।
শাস্তি থেকে রেহাই দিতে অনেক ক্ষেত্রে অভিযুক্ত শিক্ষককে স্কলারশিপ নিয়ে বিদেশ চলে যাওয়ার ক্ষেত্রেও সহযোগীতা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাবশালী মহল। প্রত্যেক বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন নিরোধ কেন্দ্র’ থাকলেও সেগুলো কতটা কার্যকর না নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন।ঘটনার বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মাকসুদ কামাল জানান, “আমি ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটির বিষয়ে অবগত নই। ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি আমি গঠন করি নি। তবে আমি এই বিষয়ে খোঁজখবর নিবো”।বিশ্ববিদ্যালয়ে যে কোন ঘটনা ঘটলে তার তদন্ত এবং শাস্তি হয় বলে দাবি করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সর্বোচ্চ অভিভাবক।
কিউএনবি/অনিমা/০৬ মার্চ ২০২৪/দুপুর ২:৫৫