স্পোর্টস ডেস্ক : ‘যত গতি তত ঝুঁকি’। বাংলাদেশে রাস্তাঘাটে সাইনবোর্ডে প্রায়ই চোখে পড়ে এই সতর্কবাণী। যানবাহনে অতিরিক্ত গতির নেশা মানেই নিয়ন্ত্রণের মাত্রা কমে আসা, ফল দুর্ঘটনা। ২০২৩ ওয়ানডে বিশ্বকাপেও প্রযোজ্য এই সতর্কবার্তা। যে বোলাররা যত বেশি গতিতে বোলিং করতে চাইছেন, তারাই রান বিলিয়ে যাচ্ছেন উদার হাতে। মার্ক উড, হারিস রউফদের মতো গতিশীল বোলাররা দিন শেষে দলের জন্য সুফল বয়ে আনার চেয়ে দুর্ভোগই বয়ে আনছেন বেশি। কাল দক্ষিণ আফ্রিকা বাংলাদেশের বিপক্ষে মেরেছে ১৯টি ছক্কা, ১২টাই হজম করেছেন ৩ পেসার মিলে।
পাকিস্তানের হারিস রউফকে নিয়ে সম্প্রতি একটি তথ্যচিত্র বানিয়েছে ইএসপিএন ক্রিকইনফো। সেখানে হারিস বলেছেন তার উঠে আসার গল্প, টেপ বল টুর্নামেন্টে খেলে গতির নেশায় বিভোর হওয়ার গল্প, পিএসএলের ট্রায়াল থেকে জীবন বদলে যাওয়ার গল্প। হারিস জীবনে প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলেছেন মাত্র ৯টা। আফগানিস্তানের সঙ্গে পাকিস্তানের হেরে যাওয়া ম্যাচের পর ওয়াসিম আকরাম একটি টিভি অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘হারিস রউফ যতদিন প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট না খেলবে সে ওয়ানডে বোলিং শিখবে না।’
বাংলাদেশের সাবেক পেসার এবং পেস বোলিং কোচ তারেক আজিজও দেশ রূপান্তরকে বললেন একই কথা, প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট না খেললে ওয়ানডে বোলিং আয়ত্তে আসবে না। হাসান মাহমুদ এখন পর্যন্ত প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে খেলেছেন ১৫টা ম্যাচ, ২০২২ সালের বিসিএলের পর আর খেলেননি। শরিফুল ইসলাম খেলেছেন ১৬টা প্রথম শ্রেণির ম্যাচ যার ৭টাই টেস্ট। মোস্তাফিজও লাল বলে বোলিং করতে আগ্রহী নন। প্রায় দেড় বছর পর, ২০২২ সালের জুনে মোস্তাফিজ একটা টেস্টে খেলেছিলেন বাংলাদেশের হয়ে। এরপর আর খেলেননি।
বিপিএল দল রংপুর রাইডার্স এবং ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের দল শেখ জামাল ধানমন্ডির পেস বোলিং কোচের দায়িত্ব পালন করা তারেক আজিজ দেশ রূপান্তরকে বললেন, ‘প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট না খেললে পেসারের মাসল মেমোরি ডেভেলপ করে না। লম্বা সময় বল করা, নির্দিষ্ট লাইন এবং লেন্থে বল করা এসব অভ্যাস তৈরি হয় না। টি-টোয়েন্টিতে ব্যাটসম্যানের মাইন্ড বুঝে বল করতে হয়। ব্যাটসম্যান ওভারের সব বলেই মারার জন্য তৈরি থাকে, সে অন্তত চারটা বলে ঝুঁকি নেবে। কিন্তু ওয়ানডেতে ব্যাটসম্যান জানে তার হাতে সময় আছে। সে বলের মেরিট অনুযায়ী খেলবে। ভালো বলে ঝুঁকি নেবে না বাজে বলে মারবে। ক্লাসেন এবং ডি কক তাই করেছে। ওরা কোনো র্যাশ শট খেলেনি। ক্লিন হিট করেছে।’
পেসাররা গতি বেশি তুলতে গিয়ে কেন মার খাচ্ছেন এর ব্যাখ্যায় তারেক জানালেন, ‘গতি দিয়ে পেসাররা চায় ব্যাটসম্যানকে পেছনের পায়ে খেলাতে। এখন ভারতে যে উইকেটে খেলা হচ্ছে সেখানে বাউন্স নির্দিষ্ট করে দেওয়া, দেখবেন উইকেটে একটা হাইটের পর বাউন্স ওঠে না। এই সব উইকেটে সঠিক লেন্থটা খুঁজে পাওয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ। হারিস কিংবা উড ওরা চাচ্ছে পায়ের সামনে থেকে বল ওঠাতে, কিন্তু হচ্ছে না। হয় বল বেশি সামনে পড়ে যাচ্ছে অথবা বেশি পেছনে পড়ে যাচ্ছে।’
বিশ্বের অনেক জায়গায়, যেমন ইংল্যান্ডে খেলা হয় ডিউক বলে। বিশ্বকাপে খেলা হচ্ছে কোকাবুরা বলে। দুই প্রান্তে দুটো নতুন বল হওয়াতে আর বলের সিম সেলাইতে পরিবর্তন আসায় বল পুরনো হচ্ছে কম, রিভার্স সুইং করানো যাচ্ছে কম। তারেক বললেন, ভারত আটঘাট বেঁধে তৈরি হয়েছে দেখেই তাদের পেসাররা সাফল্য পাচ্ছে যেখানে পাকিস্তান, ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ার মতো প্রথাগত পেসশক্তির বোলারদের সাফল্য আসছে না আনুপাতিক হারে, ‘ভারতের বুমরা, শামি, হার্দিক এরা দেখবেন সিম বোলিং করে। ওদের বলের রিলিজ পয়েন্টটা দেখবেন। ওরা সিমের পজিশনে অনেক রকম ভিন্নতা এনে বল করছে। ক্রস সিমে বল করছে।’
তারেক আজিজের মতে, বাংলাদেশের বোলারদের বিশ্বকাপের প্রস্তুতিই হয়েছে কম। দেশে খেলে সাফল্য পেলেও নিষ্প্রাণ উইকেটে কীভাবে বল করতে হবে সেই দক্ষতাটা গড়ে ওঠেনি বোলারদের মধ্যে। সেই সঙ্গে মানসিকভাবেও তাদের পরিপক্বতা আসেনি। একটা বাজে ওভার কিংবা খারাপ স্পেলের পর কীভাবে ঘুরে দাঁড়াতে হয়, নিজেকে অনুপ্রাণিত করতে হয় সেই পরিপক্বতা তাদের ভেতর এখনো আসেনি। পেশাদার ক্রিকেটে লম্বা সময় অনেকে খেললেও প্রকৃত পেশাদারি আসেনি। তাই তো মুম্বাইয়ের ছোট মাঠ, সমান বাউন্সের নিষ্প্রাণ উইকেট আর উত্তপ্ত দুপুর মিলে কড়া পরীক্ষাই নিয়েছে বাংলাদেশের উঠতি দুই পেসার হাসান মাহমুদ ও শরিফুল ইসলামের। হাসান খেয়েছেন আধ ডজন ছক্কা, শরিফুল এক হালি। একটা দুটো উইকেটে সেই মার হজমের কষ্ট কি আর দূর হয়!
কিউএনবি/আয়শা/২৫ অক্টোবর ২০২৩,/দুপুর ২:০০