শুক্রবার, ২২ মে ২০২৬, ১১:৪২ অপরাহ্ন

নবীজির জীবনে চাচা আবু তালেবের যত অবদান

Reporter Name
  • Update Time : শুক্রবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৩
  • ১০৩ Time View

ডেস্ক নিউজ : মুসলিম না হয়েও ইসলামের ইতিহাসে চির ভাস্বর আবু তালিব৷ তিনি ছিলেন প্রিয় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আপন চাচা৷ মরুর ভরদুপুরে উত্তপ্ত সূর্যের আলোয় তিনি বটগাছের ভূমিকা পালন করতেন৷ আবার দুশমনের আক্রমণে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে যেতেন৷ নিজে ইসলাম গ্রহণ না করেও ইসলাম শক্তিশালী করতে অবদান রেখেছিলেন একমাত্র আবু তালিব। তার আলোচনা ছাড়া অসম্পূর্ণ ইসলামের ইতিহাস।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্মের পর থেকে যুবক এবং নবুওয়াত লাভ পর্যন্ত তাকে আগলে রেখেছিলেন প্রিয় চাচা আবু তালিব৷ মাত্র ছয় বছর বয়সে মাকে হারান প্রিয় নবী। বছর দুই না যেতেই দাদার ছায়া থেকেও বঞ্চিত হন৷ ঠিক এই সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব নেন আবু তালিব। ইতিহাসের গ্রন্থগুলো সাক্ষী দেয় নিজের সন্তানের থেকেও তিনি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বেশি যত্ন করতেন৷ 

তাদের অনুরোধের পর আবু তালিব মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামসহ সবাইকে নিয়ে কাবা প্রাঙ্গণে উপস্থিত হলেন। এরপর তিনি নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কাবাঘরের দেয়ালের সঙ্গে পিঠ ঠেকিয়ে বসিয়ে দিলেন৷  

নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শাহাদাত আঙ্গুল আকাশের দিকে রেখে দোয়া করলেন৷ দোয়া করার আগে আকাশে কোনো মেঘের চিহ্ন ছিল না; কিন্তু তিনি আঙ্গুলে ইশারা করার প্রেক্ষিতে সবদিক থেকে মেঘ দৌঁড়ে আসা শুরু করলো এবং বৃষ্টি শুরু হলো৷ এতো বৃষ্টি হলো যে, নদীনালা-জলাশয় পানিতে ভরে গেলো৷ 

ইসলামের শুরু লগ্নে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সবে মাত্র প্রকাশ্যে দাওয়াত দেওয়া শুরু করেছেন৷ উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে কুরাইশরা আসলেন আবু তালিবের কাছে৷ প্রথমবারে ব্যর্থ হয়ে দ্বিতীয়বার এসেছেন তারা৷ আবেদন করলেন, ‘আবু তালিব, আপনি আমাদের মধ্যে প্রবীণ ও সম্মানী ব্যক্তি৷ আমরা আগেও আপনার কাছে আবেদন জানিয়েছি যে, আপনার ভাতিজাকে বাধা দিন৷ কিন্তু আপনি তাকে আমাদের ধর্ম বিশ্বাসে বিরোধিতা করতে বাধা দেননি৷ আল্লাহর কসম আমরা বরদাশত করতে পারব না যে, আমাদের বাপ-দাদাদের মন্দ বলা হবে, আমাদের জ্ঞানীদের মূর্খ বলা হবে আর উপাস্যদের দোষী বানানো হবে৷’

আবু তালিব বেগতিক অবস্থা বুঝতে সক্ষম হলেন৷ ডেকে পাঠালেন প্রিয় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে। বললেন, ‘ভাতিজা, তোমার কওমের লোকেরা আমার কাছে এসব কথা বলেছে৷ তাই আমার ও নিজের উপর দয়া করো এবং আমার উপর সাধ্যাতীত বোঝা চাপিয়ে দিয়ো না৷ তোমার কওম তোমার যে সব কথা অপছন্দ করে, তা থেকে বিরত হও৷ এর কারণে আমাদের ও তাদের মধ্যে সম্পর্ক নষ্ট হচ্ছে৷’

পুরো জাতি একদিকে আর ভাতিজা একাই একদিকে৷ তবুও একজন ধীমান গোত্র প্রধান এবং মুহাম্মদ স.-এর ধর্মের অনুসারী না হয়েও তিনি তাকে একা ছেড়ে দিলেন না৷ প্রতিউত্তরে বললেন, ‘ভাতিজা, যাও৷ তোমার যা মনে চায় তাই বলো৷ আল্লাহর কসম! আমি তোমাকে কারও হাতে তুলে দিব না৷’ — (সীরাতে ইবনে ইসহাক: ১/১৯৬, সীরাতে ইবনে হিশাম: ১/২৬৬, সীরাত বিশ্বকোষ: ৩/২১৭)

কুরাইশদের দ্বিতীয় দল ব্যর্থ হওয়ার পরেও তারা হাল ছাড়েনি৷ তৃতীয়বার তারা ভাতিজার দিয়ত হিসেবে ওয়ালীদ বিন মুগীরার সুদর্শন যুবক উমারাকে নিয়ে উপস্থি হলো৷ প্রস্তাব করলো মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তাদের হাতে তুলে দিয়ে উমারাকে গ্রহণ করতে৷ যেন তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হত্যা করতে পারে৷ 

আবু তালিব তাদের এ প্রস্তাব তাৎক্ষণিক প্রত্যাখ্যান করলেন এবং কুরাইশ সর্দারদের জবাব দিলেন, ‘আল্লাহর কসম! তোমরা আমার সাথে ইনসাফ করনি। তোমরা তোমাদের সন্তানকে আমার হাতে তুলে দিতে চাচ্ছ এজন্য যে, আমি তোমাদের জন্য তাকে প্রতিপালন করব৷ বিনিময়ে আমার ভাতিজাকে তোমাদের হাতে তুলে দিব আর তোমরা তাকে হত্যা করবে৷ আল্লাহর কসম, এটা কিছুতেই সম্ভব নয়। তোমরা কি জানো না যে, উট যখন তার বাচ্চাকে হারিয়ে ফেলে তখন সে অন্য কাউকে ভালোবাসতে পারে না!’— (সীরাত বিশ্বকোষ: ৩/২১৯)

আবু তালিব ছাড়া হয়তো অন্য কেউ হলে এই লোভনীয় প্রস্তাব গ্রহণ করে ফেলত। কারণ, দিনশেষে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের পূর্বপুরুষদের ধর্ম অস্বীকার করেছে৷ কিন্তু আবু তালিব এমনটা করেননি৷ বরং কুরাইশদের কড়া জবাব দিয়ে ইতিহাসে অনন্য উপমা স্থাপন করেছেন৷

মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি আবু তালিবের অনুগ্রহ এখানেই শেষ নয়৷ আবু তালিবকে যখন তারা পরপর লোভনীয় প্রস্তাব ও হুমকি-ধমকি দিয়ে বাগে আনতে পারলো না তখন কুরাইশরা আবু তালিবকে হুমকি দিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হত্যার পায়তারা শুরু করলো৷  

হত্যার ষড়যন্ত্রের কথা জানতে পেরে আবু তালিব আর কালক্ষেপণ না করে বনু হাশিম ও বনু মুত্তালিবকে একত্রিত হওয়ার নির্দেশ দিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন। ভাতিজাকে (রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিরাপত্তা দেওয়ার কারণে আবু তালেবকে তার বংশসহ তিন বছরের জন্য বয়কটের স্বীকার হতে হয়৷ 

বয়কটের ভয়াবহতা এমন ছিল যে, এর বর্ণনা দিতে গিয়ে সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লহু তায়ালা আনহু বলেন, ‘একবার আমার ভীষণ ক্ষুধা লাগে৷ রাতের বেলায় হাঁটার সময় আমার পায়ের নিচে ভেজা কিছু একটা লাগে৷ আমি তা উঠিয়ে মুখে নিয়ে গিলে ফেলি। আমি এখনও জানি না সেটা কী ছিল!’ — (আর রওযুল উনুফ: ২/১৬১, সীরাত বিশ্বকোষ: ৩/৪৩৫)

আবু তালিব ছিলেন রাসুল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুখদুঃখের সাথী ও অভিভাবক৷ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি তার অনুগ্রহ ও অবদান চিরস্মরণীয়৷ একোবারে শৈশব থেকে অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব নেন। আগলে রাখেন আমৃত্যু নবুওয়াত লাভের পর ইসলামে শুরুর কঠিন দিনগুলোতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কাফেরদের রোষানল থেকে নিরাপদ রাখেন তিনি। তাইতো তার মৃত্যুর বছরকে শোকের বছর বলে ঘোষণা করেছিলেন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।

 

 

কিউএনবি/আয়শা/২২ সেপ্টেম্বর ২০২৩,/দুপুর ২:২৪

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

May 2026
M T W T F S S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
2627282930  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit