এম এ রহিম চৌগাছা (যশোর) : যশোরের চৌগাছায় কলেজ কর্তৃপক্ষের সহযোগীতায় প্রতিনিয়ত বাড়ছে প্রক্সি পরীক্ষার্থী। এসব ভুয়া পরীক্ষার্থীদের হাতেগোনা কয়েকজন ধরা পড়লেও ধরা ছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে সিন্ডিকেটের মুল হোতারা। এ নিয়ে প্রকৃত পরীক্ষার্থী ও অভিভাকদের মধ্যে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
২০২৩ সালে ২৭ আগষ্ট তারিখ থেকে শুরু হয়েছে এইচএসসি বিএম শাখার পরীক্ষা এবং ১ সেপ্টেম্বর শুরু হয়েছে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের এইচএসসি পরীক্ষা। এসব পরীক্ষায় অন্যান্য বছরের মতো এবছরেও বেশকিছু পরীক্ষার্থী রয়েছেন যারা সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের চাকরি করেন। অনেকে অবস্থান করছেন বিদেশে। তাদের পরীক্ষাগুলো কর্তৃপক্ষ টাকার বিনিময়ে লোক ভাড়া করে প্রক্সি পরীক্ষার্থী দিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করে থাকেন। এ ক্ষেত্রে তারা টার্গেট করেন দরিদ্র ও মেধাবী ছাত্রদের।
২৭ আগস্ট সর্ব প্রথম উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইরুফা সুলতানা গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ভুয়া পরীক্ষার্থীদের ব্যাপারে জানতে পারেন। তিনি উপজেলা সহকারি কমিশনার (ভুমি) গুনজন বিশ্বাসকে ভুয়া পরীক্ষার্থীদের আটকের নির্দেশনা দেন। ঐদিনই তার নির্দেশনা মোতাবেক গুঞ্জন বিশ্বাস বিএম শাখার প্রক্সি পরীক্ষার্থী এমএম কলেজের শিক্ষার্থী মাসুম হোসেনকে আটক করেন।
পরবর্তীতে ১ সেপ্টেম্বর শুক্রবার বিকেলে চৌগাছা মৃধাপাড়া মহিলা কলেজ কেন্দ্রে উন্মুক্ত বিশ্বিবদ্যালেয়র এইচএসসি ২য় বর্ষের ইংরেজি ২য় পত্র পরীক্ষা চলাকালে চৌগাছা সরকারি কলেজের ২১০১১৩৯৫০২২ রোল নম্বরধারী পরীক্ষার্থী ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলার রায়চন্ডি গ্রামের গাজী এমদাদুল হক এর পরিবর্তে চৌগাছা উপজেলার আন্দারকোটা গ্রামের আল আমিন হোসেন, ২১০১১৩৯৫০১২ রোল নম্বরধারী পরীক্ষার্থী যশোর সদর উপজেলার তীরেরহাট গ্রামের মেহেদী হাসানের পরিবর্তে একই গ্রামের হাসান ইমাম এবং ২১০১১৩৯৫০২২ রোল নম্বরধারী পরীক্ষার্থী খুলনার ফুলতলা উপজেলার গিলাতলা গ্রামের শাহিনুর ইসলামের পরিবর্তে যশোর সদর উপজেলার আপন মোড়ের আরিফ হোসেনকে পরীক্ষা চলাকালিন সময় সহকারী কমিশনার (ভুমি) গুঞ্জন বিশ্বাস তাদেরেক আটক করেন।
একইদিন চৌগাছা সরকারি কলেজ কেন্দ্রে উপজেলার এবিসিডি কলেজের ২১০১১৯৮২১০৭ রোল নম্বরধারী পরীক্ষার্থী রাজশাহীর বোয়ালিয়া থানার শিরাইন কলোনীর শাহিন বাপ্পির পরিবর্তে যবিপ্রবির শিক্ষার্থী চৌগাছার আন্দারকোটা গ্রামের মাস্টার নুরুল মমিনের ছেলে সজিব এবং ২১০১১৯৮২০২৫ রোল নম্বরধারী পরীক্ষার্থী ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার দাদপুর গ্রামের মেহেদী আল মামুনের পরিবর্তে তার আপন ভাই ইমরান হোসেনেক পরীক্ষা দেয়ার সময় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইরুফা সুলতানা আটক করেন।
কেন্দ্র সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ছয় প্রক্সি পরীক্ষার্থী যাদের পরিবর্তে পরীক্ষা দিতে এসেছিলেন তাদের মধ্যে ২১০১১৩৯৫০১২ রোল নম্বরধারী পরীক্ষার্থী যশোর সদর উপজেলার তীরেরহাট গ্রামের মেহেদী হাসান জাতিসংঘ মিশনে বিদেশে কর্মরত রয়েছেন বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কলেজ শিক্ষক জানিয়েছেন। অপর একটি সুত্র জানিয়েছে প্রবাসী, জাতিসংঘের শান্তি মিশনসহ সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মরত দেশের বিভিন্ন জেলার বাসিন্দাদের প্রক্সি পরীক্ষার সুযোগ তৈরি করে দেয় সংশ্লিষ্ট কলেজের একটি চক্র। তারা এসব চাকরি জীবিদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে পরীক্ষার্থী ভাড়া করে পরীক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করে দেন।
সুত্র আরো জানায় দেশের প্রত্যেক জেলা উপজেলা সদরে রয়েছে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের এসএসসি, এইচএসসি ও ডিগ্রী পরীক্ষা কেন্দ্র। আগ্রহী পরীক্ষার্থীরা তাদের এলাকার কলেজগুলোতে পরীক্ষা না দিয়ে সুযোগের আশায় চৌগাছায় পরীক্ষা দিতে আসেন। রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল বিভাগের মতো দুরবর্তী স্থান থেকে চৌগাছায় এসে কারো পক্ষে প্রক্সি পরীক্ষার্থী ভাড়া করা সম্ভব না। তারা ভর্তি হওয়ার সময় কলেজের দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকদের সাথে প্রক্সি পরীক্ষার্থীর ব্যাপারে চুক্তি করে থাকেন।
আটককৃত সকল প্রক্সি পরীক্ষার্থীরা তারা কেউই প্রকৃত পরীক্ষার্থীদের চেনেন না। বিএম শাখার আটককৃত প্রক্সি পরীক্ষার্থী এমএম কলেজের শিক্ষার্থী মাসুম হোসেন আটক অবস্থায় জানায় চৌগাছা পৌর কলেজের শিক্ষক মোস্তাফিজুর রহমান তাকে পরীক্ষার দিন ৬/৭ বার ফোন করে ৭শ টাকার বিনিময়ে তাকে প্রক্সি দেওয়ার জন্য ডেকে নিয়ে আসেন। ১ লা সেপ্টেম্বর চৌগাছা মহিলা কলেজ থেকে আটককৃত পরীক্ষার্থীরা জানান তাদেরকে কেন্দ্র সংশ্লিষ্ট কয়েকজন শিক্ষক টাকার বিনিময়ে পরীক্ষা দেওয়ার জন্য ডেকে নিয়ে আসেন। তারা আমাদেরকে বলেন, কেন্দ্র সচিবসহ সবাই ঠিক আছে তোমাদের কিছুই হবেনা। তাদের কাছে শিক্ষার্থী কার্ডের ছবি পরিবর্তনের ব্যাপারে জানতে চাইলে তারা বলেন এসবের আমরা কিছুই জানিনা।
চৌগাছা থানায় অবস্থানকালে কেন্দ্র সচিব আলমগীর হোসেনর কাছে প্রক্সি পরীক্ষার্থীদের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি অত্যন্ত বিরক্তি প্রকাশ করে বলেন, আমাকে ডিষ্টার্ব করবেন না। মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে এসব করেছেন কিনা জিজ্ঞাসা করলে তিনি নিশ্চুপ থাকেন। পকেট থেকে সেল ফোন বের করে বিভিন্ন ব্যাক্তির নিকট ফোন দিতে থাকেন। অপরদিকে শনিবার যশোর আদালতের গারদখানায় থাকা আটক শিক্ষার্থী এবং আদালত চত্তরে থাকা শিক্ষার্থীদের কয়েকজন অভিভাবক এ প্রতিবেদককে বলেন এ কেমন আইন বুঝলাম না ! কেন্দ্র সচিবসহ শিক্ষকরা আমাদের কোমলমতি ছেলেদেরকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে এসে পরীক্ষা দেওয়ালেন, আবার তারাই বাদী হয়ে ছলেদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করলেন।
এ তো সেই প্রবাদের মত “যার জন্য করলাম- চুরি সেই বলে চোর”। অভিভাবকরা দুনীর্তিবাজ কেন্দ্র সচিবসহ এ কাজে সহায়তাকারীদের মামলার আসামী করার দাবী জানান। তারা পুলিশের তদন্তকারী কর্মকর্তার নিকট দাবী করেন যাতে সঠিকভাবে তদন্তপূর্বক চার্জশীটে দোষী সবাইকে আসামী করা হয়। এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কলেজের বেশ কয়েকজন শিক্ষক বলেন, এইচএসসিতে প্রক্সি পরীক্ষার্থীর সংখ্যা খুবই নগন্য এটা ডিগ্রি পরীক্ষার ক্ষেত্রে আরো অনেক বেশি। চাকরিজীবি এসব পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা ভাগা ভাগি নিয়ে কলেজের শিক্ষক কর্মচারীদের মধ্যে প্রায়ই মনমালিন্যের সৃষ্টি হয়। তারা দাবী করেন অধ্যক্ষের সাথে যাদের সুস¤পর্ক থাকে তারাই এসব দায়িত্ব পেয়ে থাকেন।
একজন অধ্যক্ষ জানান ঐদিন একটি কলেজ কেন্দ্রে পরীক্ষা শুরুর আগেই ছয়জন প্রক্সি পরীক্ষার্থীকে বের করেদেয় কলেজ কর্তৃপক্ষ। অন্য কেন্দ্র গুলোতে এ পদক্ষেপ নিলে কয়েজন মেধাবী ছেলেকে আজ হাতে হাতকড়া পরতে হতো না। প্রক্সি পরীক্ষার্থীদের ব্যাপারে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইরুফা সুলতানা বলেন, প্রক্সি পরীক্ষার্থী আটকের অভিযান অব্যহত থাকবে। এ ব্যাপারে কাউকে ছাড় দেওয়া হবেনা। ভবিষ্যতে মূল সিন্ডিকেটের সদস্যদেরকে আইনের মুখোমুখি করা হবে।
কিউএনবি/আয়শা/০২ সেপ্টেম্বর ২০২৩,/রাত ১০:৪৩