রবিবার, ০১ মার্চ ২০২৬, ০৫:১৯ অপরাহ্ন
শিরোনাম
জুলাই অভ্যুত্থানকারীদের সুরক্ষায় জুলাই সনদের নীতিতেই আছে সরকার: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ‎লালমনিরহাট খামারবাড়িতে উড়ছে না জাতীয় পতাকা, বিধিমালা জানেন না উপ-পরিচালক! অঘোষিত কোয়ার্টার ফাইনালে আজ মুখোমুখি ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও ভারত পার্বত্য চট্টগ্রামে ১৮০ দিনের মধ্যে দৃশ্যমান উন্নয়ন নিশ্চিতের নির্দেশ পার্বত্যমন্ত্রী দীপেন দেওয়ানের ‎লালমনিরহাটে ৯ মাসের অন্তঃসত্ত্বাকে ধর্ষন চেষ্টা,  গণধোলাইয়ের শিকার বখাটে যুবক জয়পুরহাটে দ্বিতীয় স্ত্রীকে শ্বাসরোধে হত্যার অভিযোগ, স্বামী পলাতক কেনিয়ায় হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় এমপিসহ ৬ জনের মৃত্যু ইরানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্বে তিন শীর্ষ নেতা কানাডার ক্যালগেরি’র সেলেসটিয়া প্রোডাকশন হাউজের ইফতার মাহফিল মধ্যপ্রাচ্যে প্রবাসীদের নিয়ে সরকার উদ্বিগ্ন: পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়

তিতাস নদী পাড়ের এক দুঃখিনী কন্যার কান্না

লুৎফর রহমান রাজনীতিবিদ ও লেখক।
  • Update Time : বুধবার, ২৮ জুন, ২০২৩
  • ১১৩৮ Time View

তিতাস নদী পাড়ের এক দুঃখিনী কন্যার কান্না
—————————————————–
গত বছর ২০২২ খ্রিস্টাব্দের ৯ই মে আমি একটি পোস্ট দিয়েছিলাম আমার ফেসবুক টাইমলাইনে। শিরোনাম ছিল ”তিতাস নদী পাড়ের এক যৈবতী কন্যার কান্না”। লেখাটি পড়ে অনেকেই চোখের জল ফেলেছিল বলে আমাকে জানিয়েছিলেন। লেখাটি লিখতে যেয়ে আমারও মন ভিজে গিয়েছিল। অন্যের কষ্টের কথা আমার নিজের মধ্যে বাসা বাঁধে যেন একরাশ কান্না নিয়ে।

এই এক বছরে তিতাস নদী পাড়ের কথিত নীরা চৌধুরী নামের মেয়েটির জীবন যুদ্ধ থেমে থাকেনি। আমিও নানান ঝামেলা ও ব্যস্ততার কারণে মেয়েটির কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। কিন্তু হটাৎ করে মেয়েটি ধূমকেতুর মত আবির্ভাব ঘটিয়েছে ভার্চুয়াল জগতে। প্রায় এক বছর মেয়েটি কোথায় ছিল, কেমন ছিল, কি অবস্থায় ছিল তা আমার জানার কথা নয়। আমার জীবনে আলোর ঝলকানি নিয়ে কিছু মানুষের আবির্ভাব ঘটে, তারা তুলে ধরে তাদের জীবনের খন্ডচিত্র। সে কাহিনী আমার হৃদয়ে দাগ কাটলে আমি কলমের খোঁচায় আরেক চিত্র আঁকতে থাকি আমার নিজের আনন্দ ভুবন সৃষ্টির জন্যে। আমি তাদের কথা লিখি আমার ভালোলাগার অনুভূতি সৃষ্টির জন্যে।

এক বছর আগে নীরা চৌধুরীকে নিয়ে আমার লেখাটি আবার পুনঃ প্রকাশ করলাম। এর কারণতো অবশ্যই আছে। পুরোনো কাহিনীর পুনরাবৃত্তির উদ্যেশ্য হলো এই এক বছরে নীরার জীবনে ঘটে গেছে ভয়াবহ কিছু। ৯৫ সালে তিতাস নদীতে ঝড়ে নৌকা ডুবে সেদিনের ৬ মাস বয়সী নীরা তার মা’কে হারিয়েছে। ২৮ বছর আগে তিতাস নদীতে কচুরিপানার উপর ভেসে যাওয়া ৬ মাস বয়সী নীরা আজও ভেসে বেড়াচ্ছে ঢাকা শহরের নিষ্ঠুর এক জীবন অভিযাত্রায়। নীরার বর্তমানের জীবনযুদ্ধের কাহিনী বলার আগে, আমি বলতে চাই ২৮ বছর আগে শুরু হওয়া সেই নীরার কাহিনী।

নীরা ঢাকার ফার্মগেটে এক ছাত্রীনিবাসে থাকে। সে অনেক আগে থেকেই আমার ফেসবুক বন্ধু লিস্টে ছিল। কিন্তু তার উপস্থিতি কোনোদিনই লক্ষ্য করিনি। নিভৃতচারিনী আমার এই তরুণী ফেসবুক বন্ধুর নাম নীরা চৌধুরী। নীরা শুরু করল তার কাহিনী।

১৯৯৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসের মাঝমাঝি কোন একদিনের কথা। আমি তখন ৬ মাস বয়সী এক শিশু কন্যা। আমার দাদীর এক ভাইয়ের ক্যান্সার হয়েছে। শেষ অবস্থা। দাদী তার ভাইকে শেষ বারের মত দেখার জন্যে আমাদের বাড়ী থেকে রওয়ানা দিলেন। সঙ্গে ছিলেন আমার ফুফু, ১০ বছর বয়সী ফুফুর মেয়ে, কিশোর ২ জন চাচাতো ভাই আর মা সহ মায়ের কোলে আমি।

আমাদের বাড়ী কুমিল্লা জেলার এক উপজেলায়। দাদীর বাড়ীর যাত্রাপথের মাঝামাঝি তিতাস নদী পার হতে হয়। সেদিন মেঘ মুক্ত আকাশ আর স্বাভাবিক আবহাওয়া ছিল। বাংলা ভাদ্র মাসের পড়ন্ত বিকেলে দাদী আমাদেরকে নিয়ে নৌকায় নদী পাড়ি দিচ্ছেন। নৌকা যখন মাঝ নদীতে তখন হটাৎ করেই ঝড় বৃষ্টি শুরু হল। ভাদ্র মাসে তিতাস তখন এক প্রমত্তা নদী।

তীব্র ঝড় বৃষ্টিতে নৌকা ডুবে গেল। মা আমাকে নিয়ে নদীতে হাবুডুবু খাচ্ছে। মা এক হাত দিয়ে ৬ মাস বয়সী আমাকে উঁচু করে ধরে সাঁতার কাটার চেষ্টা করছে। মা’র পড়নে ছিল শাড়ীর উপরে বোরকা। এই জন্যে মা সাঁতার কাটতে পারছিলনা। তিতাসের তীব্র স্রোতের বিরুদ্ধে আমার মায়ের বেঁচে থাকার সংগ্রাম যখন নিঃশেষ প্রায় তখন কোথা থেকে যেন একদলা কচুরিপানার স্তুপ ভেসে আসছিল। মা আমাকে কচুরিপানার স্তুপে নিক্ষেপ করে নিমিষেই তলিয়ে গেল তিতাস একটি নদীর তলে।

ঝড় বৃষ্টি সহসাই থেমে যায়। তিতাস পাড়ের গ্রামবাসীরা উদ্ধারে নামে। তারা আমাকে উদ্ধার করে কচুরিপানার স্তুপ থেকে। আমার ফুফু তার ১০ বছরের মেয়েকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেও মরে যায়, ফুফাতো বোনও মারা যায়। শুধু বেঁচে যায় আমার দাদী, চাচাতো ২ ভাই আর আমি। মায়ের লাশ পাওয়া যায় দেড় মাইল দূরে।

ফোনের অপরপ্রান্তে তরুণী নীরা চৌধুরী ফুঁফিয়ে কাঁদছে। আমার চোখের চশমা খুলে আমি রুমালে মুচছি। পৃথিবীতে এত কান্না কোথায় লুকিয়ে ছিল এতদিন ? একটু সময় নিয়ে নীরা আবার শুরু করল। এবার সে শুরু করল আমাকে নিয়ে।

আপনি যখন নিতান্তই শিশু তখন আপনার মা মারা যায়। হয়তোবা আপনার মায়ের কিছু অস্পষ্ট স্মৃতি আপনার স্মৃতিতে অম্লান হয়ে আছে। আপনি আপনার মা’কে কবরে শুইয়ে দিতে দেখেছেন। তাঁকে কবর দিতে দেখেছেন। সদ্য নতুন কবরে মা’কে খোঁজার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু মা আমার কাছে অন্ধকার একটি অধ্যায়। মা সম্পর্কে আমার কিছুই ধারণা নেই। কচুরিপানা থেকে আমাকে উদ্ধার করে গ্রামবাসীরা হাসপাতালে নিয়ে যায়। ডরোথি পাল্মা নামে এক নেটিভ ক্রিশ্চিয়ান ডাক্তার আমাকে প্রানান্তকর চেষ্টা চালিয়ে বাঁচিয়ে তুলে। শৈশব থেকে কৈশোর, কৈশোর থেকে আজ অবধি এই ডরোথি পাল্মার সাথে আমার যোগাযোগ আছে। তিনি নিজের মেয়ের মত আমাকে ভালোবাসেন। কল্পনায় যখন মা এর মুখ স্মরণ করার চেষ্টা করি, তখন শুধু ডরোথি পাল্মার মুখটাই ভেসে উঠে।

আমি বললাম, এখন তোমার কি অবস্থা ? তুমি কেমন আছ ?

নীরা জবাব দেয়, আমি এখনও কচুরিপানার উপর ভেসে বেড়াচ্ছি। আমার বাবা সরকারী চাকুরীজীবি ছিলেন। মধ্যবয়সী বাবা আমার কারণে আর দ্বিতীয় বিয়ে করেননি। যদি সৎমা আমাকে কষ্ট দেয় ? বাবা এখন রিটায়ার্ড লাইফে, বার্ধক্য তাকে তিল তিল করে গ্রাস করছে। এখন তিনি অসুস্থ। আমার ৩ জন বড়ভাই। বড়জন থাকেন আমাদের গ্রামের বাড়ীতে। মেজো ভাই ঢাকায় পরিবার নিয়ে থাকেন। ছোটখাট এক চাকুরী করেন। আর সব ছোটভাই মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমিকের জীবন নিয়ে আছেন। বড় দুই ভাই বিবাহিত। ছেলেমেয়ে আছে।

তুমি কচুরিপানার মত এখনও ভাসছে কেন ? কি সমস্যা তোমার ? আবারও ভিন্ন এক কাহিনী শুরু করল নীরা।

আমার জন্মটাই অপয়া,অলুক্ষণে। আমার ভাই, আত্মীয় স্বজনরা মনে করে আমার জন্যেই আমার মা মারা গেছেন। আমাকে বাঁচানোর চেষ্টা না করলে হয়ত তিনি বেঁচে যেতেন। আমি যেন অপাংক্তেয় একজন। ভাই-ভাবীরা আমাকে বিষ দৃষ্টিতে দেখে। সৎ মায়ের দেয়া কষ্টের কারণে বাবা বিয়ে করলেন না। তিনি এখন ভাই ভাবীদের কাছে এক বোঝা। আমাকে লেখাপড়ার খরচ দিতে চায়না। আমাদের কয়েকটি দোকান ভাড়া দেয়া আছে। বাবা এই টাকা আমার লেখাপড়ার জন্যে নির্দিষ্ট করেছেন, কিন্তু ভাইরা এখন সে টাকা দেয়না। আমি টিউশনি করে আমার লেখাপড়ার খরচ চালাচ্ছি । ভাবীরা কথিত সৎ মায়ের চেয়েও অনেক বেশি কষ্ট দেয় আমাকে।

হটাৎ করে নীরা আবার ফুঁফিয়ে কেঁদে উঠল। জানেন ভাইয়া, এবারের এই ঈদের ৩ দিন আগে গ্রামের বাড়ীতে গিয়েছি। ভাইরা আমাকে কিছুই দেয়নি। দুই ভাবীই আমাকে নিয়ে অনেক নোংরা কুৎসিত মন্তব্য করেছে। রোজায় শুয়ে বসে কাটিয়েছি ঢাকায়। এজন্যে ওজন বেড়ে গেছে। বড়ভাবী আমার নিতম্ব দেখে বলে, কোন নাগর জুটিয়েছিস? এত মোটা হচ্ছিস কেন ?

আমি ধীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মেসেঞ্জার অফ করে দেই। ইউটিউবে খুঁজতে থাকি ঋত্বিক কুমার ঘটকের ছবি ”তিতাস একটি নদীর নাম”।

ছবিঃ রূপক

পাদটীকাঃ একবছরে ঘটে যাওয়া নীরার কাহিনী বড় কষ্ট, বড় বেদনার। তার কাহিনী লিখতে যেয়ে নতুন কোন পর্ব কাহিনীর যদি সৃষ্টি হয়, তাহলে অবাক হবেন না প্লিজ। ইচ্ছা আছে নীরাকে নিয়ে নতুন কাহিনী সৃষ্টির।

লেখকঃ লুৎফর রহমান একজন রাজনীতিবিদ ও লেখক। তিনি নিয়মিত লেখালেখির পাশাপাশি ইলেক্ট্রনিক নিউজ মিডিয়ার সম্পাদক ও প্রকাশক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র লুৎফর রহমান ৮০ এর দশকের স্বৈরাচার বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস তুলে ধরতে দুটি রাজনৈতিক উপন্যাস লিখেছেন, যা দেশ বিদেশে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় জীবনের খন্ডচিত্র এঁকে তিনি এখন ব্যাপক পরিচিত।

 

 

 

 

কিউএনবি/রুমা/২৮.০৬.২০২৩/ রাত ১২.০৮

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

March 2026
M T W T F S S
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
2425262728  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit