বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:১৯ অপরাহ্ন

তুমি বোরখা পড় না, বোরখা পড়লে তোমাকে বেশ্যার মতো দেখায়

জিন্নাতুল ইসলাম জিন্না, লালমনিরহাট প্রতিনিধি ।
  • Update Time : সোমবার, ৫ জুন, ২০২৩
  • ১৩১ Time View

জিন্নাতুল ইসলাম জিন্না, লালমনিরহাট প্রতিনিধি : লালমনিরহাটে পুর্ব সাপটানা উচ্চ বিদ্যালয়ের ১০ম শ্রেণির এক ছাত্রী স্কুলে বোরখা পড়ে আসার অপরাধে বেশ্যা বলেছে বলে অভিযোগ উঠেছে ওই স্কুলের কম্পিউটার শিক্ষক ফেরদৌস আলী নামে এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে।

এ নিয়ে ঘরোয়া ভাবে সালিশ করার চেস্টা করা হলে ফুসে উঠে এলাকাবাসী সোমবার (৫ জুন) বেলা ১২টার দিকে লালমনিরহাট পৌরসভার পুর্ব সাপটানা উচ্চ বিদ্যালয়ের ওই কম্পিউটার শিক্ষকের বিচারের দাবিতে শিক্ষার্থীরা ক্লাস বর্জন করে সড়ক অবরোধসহ বিক্ষোভ করেছে। তাদের আন্দেলনের মুখে তাৎক্ষনিক তদন্ত কমিটি করে ওই শিক্ষকের ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে শিক্ষার্থীদের শান্ত করা হয়। পরস্থিতি উত্তপ্ত হওয়ায় জরুরি মিটিং ডেকে স্কুল ছুটি দেয় প্রতিষ্ঠান প্রধান ও সভাপতি। 

জানা যায়, পুর্ব সাপ্টানা উচ্চ বিদ্যালয়ের কম্পিউটার শিক্ষক ফেরদৌস আলী ১০ম শ্রেণির রাশিদা খাতুন (ছদ্ম নাম) নামে এক ছাত্রীকে প্রায় বিরক্ত করতেন। ওই ছাত্রী বোরখা পড়ে স্কুলে আসায় শিক্ষক ফেরদৌস তাকে বোরকা না পড়েই স্কুলে আসতে বলেন এবং বলেন তুমি দেখতে এমনেতেই সুন্দর তোমাকে বোরখা পড়ে আসতে হবে না।

এর পরেও গত বুধবার ওই ছাত্রী বোরখা পড়ে স্কুলে আসে। এতে ওই শিক্ষক ক্ষিপ্ত হয়ে ক্লাসে গিয়ে তাকে বলে তুমি বোরকা পড়ে আসো কেন? তখন ওই শিক্ষার্থী প্রতিবাদ করলে শিক্ষক ফেরদৌস তাকে বলেন তুমি বোরকা পড়ে আসলে তোমাকে বেশ্যার মতো দেখা যায়। এ কথা বলার পর পরই ওই ছাত্রী কাদঁতে কাদঁতে বিষয়টা তার প্রধান শিক্ষক মোঃ গোলাম সরওয়ারকে বলেন।  প্রধান শিক্ষক ওই শিক্ষকের বিচার করবেন বলে বিষয়টা আর কাউকে না বলার জন্য তাকে বুঝিয়ে চলে যেতে বলেন। এর পর দুইদিন পেরিয়ে গেলেও ওই শিক্ষকের কোন বিচার না করায় ছাত্রী রাশিদা স্কুলের গভর্নিং বডির সভাপতি শফিকুল ইসলামকে বিষয়টা অবগত করেন। তিনিও ওই শিক্ষকের ব্যবস্থা নিবেন বলে আর কাউকে না বলার জন্য অনুরোধ করেন।

স্কুলের প্রধান শিক্ষক গোলাম সরওয়ার ও ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি শফিকুল ইসলামকে জানালেও কার্যকর কোন ব্যবস্থা না নেওয়ায় অসহায় মেয়েটি বাধ্য হয়ে বাড়ি চলে গিয়ে তার পরিবারকে জানায়। কোন কাজ না হওয়ায় সোমবার ১২টার দিকে ওই স্কুলের সকল শিক্ষার্থীরা লম্পট শিক্ষক ফেরদৌসের বিচারের দাবিতে ক্লাস বর্জন করে রাস্তায় নেমে সড়ক অবরোধ করে। বিষয়টা বেগতিক দেখে তাৎক্ষনিক প্রধান শিক্ষক ও স্কুলের গভর্নিং বডির সভাপতি সফিকুল ইসলাম একটি কমিটি করে ওই শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্ত করা হবে বলে আশ্বাস দিলে শিক্ষার্থীরা ক্লাসে ফিরে যায়।

পরদিন বৃহস্পতিবার বিকেলে গোপনে স্কুলের সভাপতি ও প্রধান শিক্ষকের যোগসাজসে বিষয়টিকে ধামাচাপা দেওয়ার জন্য সালিশ বৈঠক করে এবং মেয়ের পরিবারকে বিভিন্ন হুমকি ধমকি দেওয়া হয়। বিষয়টি জানাজানি হলে এলাকাবাসী ক্ষুদ্ধ হয়ে প্রতিবাদ জানাতে শুরু করে। এরই অংশ হিসেবে সোমবার দুপুরে স্কুলে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশের ডাক দেয়। মানববন্ধন এলাকাবাসী উপস্থিত হতে শুরু করলে সভাপতির লোকজন  এলাকাবাসীর দিকে চড়াও হয় এবং কর্মসূচি ভেস্তে যায়। পরে বাধ্য হয়ে মেয়েটির পরিবার মেয়েকে নিয়ে বাসা চলে যায়। এক পর্যায়ে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হলে সভাপতি ও প্রধান শিক্ষক কৌশলে জরুরি মিটিংয়ের কথা বলে স্কুল ছুটি ঘোষণা করেন।

উল্লেখ্য, এর আগেও ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে অন্য এক ছাত্রীর সাথে অশালীন আচরণ করলে সেবার তিনি সবার কাছে ক্ষমা চেয়ে পার পান। প্রভাবশালী হওয়ায় বারবার এমন কান্ড করে পার পাচ্ছেন বলেও অভিযোগ এলাকাবাসীর।
দশম শ্রেণীর ওই ছাত্রীর সহপাঠীরা জানান, স্কুলের টিফিনের পরে আমাদের বান্ধবী ক্লাসে ছিল। সে বোরখা পড়ে আসায় তাদের কম্পিউটার স্যার তাকে খারাপ ভাষায় কথা বলে। আমরা এর বিচার চাই।

এলাকাবাসী ফারুক মিয়া বলেন, এর আগেও শিক্ষক ফেরদৌস আলী ছাত্রীর সাথে খারাপ আচরণ করেন। প্রভাব খাটিয়ে সেবারও মাফ চেয়ে পার পান। তাই আবারও এই ঘটনা ঘটিয়েছেন। তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া না হলে আমরা কঠোর আন্দোলন গড়ে তুলবো। মেয়েটির চাচা বলেন, আমি সভাপতিকে বিচার দিয়েছিলাম। তিনি এ বিষয়ে কাউকে বলতে নিষেধ করেছেন।  এছাড়াও বলেছেন না পোষালে আপনার মেয়েকে নিয়ে যান। মেয়েটির বাবা রফিকুল পরিবারের অন্যান্য লোকজন নিয়ে সভাপতির কাছে আবারও বিচার চাইতে গেলে তিনি উলটো তার মেয়ের চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলেন বলে অভিযোগ মেয়ের পরিবারের।

এ ব্যাপারে পূর্ব সাপটানা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক গোলাম সরওয়ার বলেন, কম্পিউটার শিক্ষক একজন ছাত্রীকে অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করেছে বিষয়টি তিনি জেনেছেন। মেয়েটি অভিযোগ করায় ওই শিক্ষক তার বাড়িতে গিয়ে মাফ চেয়ে আসে। আজ এলাকাবাসীর দাবীর প্রেক্ষিতে আমরা জরুরি মিটিং ডেকেছি। মিটিংয়ে কারণ দর্শানোর নোটিশ সহ প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি শফিকুল ইসলাম বলেন, ওই স্যার তো ক্ষমা চেয়েছে। এখানে আর কি করা লাগবে। সাংবাদিকরা আসে ধান্দা করার জন্য। আমরা প্রতিষ্ঠানিকভাবে এর ব্যবস্থা নেবো। 

সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জান্নাত আরা ফেরদৌস বলেন, বিষয়টি জানা ছিলনা। এখন পর্যন্ত কোন অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।  এ বিষয়ে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুল বারী বলেন, এ বিষয়ে ওই শিক্ষকসহ সংশ্লিষ্ট সকলের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হবে। এটি তদন্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ উল্ল্যাহ বলেন, এ বিষয়ে কোন অভিযোগ পাওয়া যায়নি। খোঁজখবর নিয়ে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 

কিউএনবি/আয়শা/০৫ জুন ২০২৩,/বিকাল ৩:২১

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

September 2026
M T W T F S S
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit