ডেস্ক নিউজ : রমজানকে স্বাগত জানিয়ে ঘরবাড়ি ও শহর-নগরের সাজসজ্জা ছিল মুসলিম ঐতিহ্যের অন্যতম অংশ। আর সাহরি ও ইফতার ঘিরে রয়েছে নানা প্রথা। মধ্যযুগীয় আরব ভূগোলবিদ ও পরিব্রাজক শামসুদ্দিন আল-মাকদিসি (মৃত্যু ৩৮০ হি.) তাঁর ‘আহসানুত তাকাসিম ফি মারিফাতিল আকালিম’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ইয়েমেনের আদন অঞ্চলের অধিবাসীরা রমজানের দুই দিন আগে ঘরবাড়ির ছাদ সাজিয়ে দুফ বাজাতেন। রমজান শুরু হলে সাহরির সময় থেকে একদল লোক শেষ রাত পর্যন্ত কবিতা পাঠ করে পুরো শহরে ঘুরতে থাকত।
মোটকথা রমজানে সাহরি ও ইফতার ঘিরে একটা উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করত। অটোমান শাসনামলে রমজানের কামান আসে। সাধারণত ইফতারের সময়ের পাশাপাশি সাহরির সময়ও কামান দাগানোর প্রথা শুরু হয়। শিহাবুদ্দিন আল-হাল্লাক আল-বাদিরি (মৃত্যু ১১৭৫ হিজরি) তাঁর ‘হাওয়াদিসু দিমাশক আল-ইয়াওমিয়্যাহ’ গ্রন্থে লিখেছেন, ১১৫৫ হিজরিতে রমজানের চাঁদ দেখার ঘোষণা হলে শাম অঞ্চলের সব মিনারে প্রদীপ জ্বালানো হয়। মধ্যরাতে কামান দাগিয়ে সবাইকে নিশ্চিত করা হয়। তখন সাহরির জন্য মানুষ ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এমনকি গভীর রাতে বাজারের খাবার ও রুটির দোকানও খোলা হয়। ঘরবাড়ি ও শহর-নগরের সাজসজ্জার পাশাপাশি মসজিদেও থাকত আলোকসজ্জা। ইবনে আসাকির (মৃত্যু ৫৭১ হি.) তাঁর ‘তারিখু দিমাশক’ গ্রন্থে লিখেছেন, ওমর আল-ফারুক (রা.) ছিলেন ইসলামের ইতিহাসের প্রথম ব্যক্তি যিনি প্রদীপ জ্বালিয়ে মসজিদ আলোকিত করেছিলেন। আলী বিন আবু তালিব (রা.) রমজান মাসে অনেক মসজিদ অতিক্রম করতেন, যেখানে প্রদীপ প্রজ্বলিত থাকত। তিনি বলতেন, আল্লাহ ওমর (রা.)-এর কবরকে আলোকিত করুন, যেভাবে তিনি আমাদের জন্য মসজিদগুলো আলোকিত করেছেন।
পবিত্র রমজান মাসে মসজিদের সাজসজ্জা, প্রদীপ প্রজ্বালন ও সুগন্ধি ছড়ানো নিয়ে সব খলিফা ও গভর্নরের মধ্যে বিশেষ আগ্রহ ছিল। রমজান মাস শুরুর মুহূর্তে আব্বাসি খলিফা আল-মামুন তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী আবু জাফর আহমদ বিন ইউসুফ আল-আজালিকে বিভিন্ন অঞ্চলের গভর্নর ও কর্মকর্তাদের একটি পত্র লিখতে বলেন, যেন তারা রমজান মাসজুড়ে মসজিদের সৌন্দর্য বর্ধন ও আলোকসজ্জার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেয়। ইবনে ইউসুফ (মৃত্যু ২৮০ হি.) তাঁর ‘কিতাবু বাগদাদ’ গ্রন্থে লিখেছেন, রমজান মাসে মানুষ যেন বেশি আলোকসজ্জা করে এই বিষয়ে আল-মামুন আমাকে গভর্নরদের উদ্দেশে একটি পত্র লেখার নির্দেশ দেন। আমি কী লিখব তা ভেবে পাচ্ছিলাম না। এমনকি কারো সন্ধান পাইনি, যার কাছে এই বিষয়ে জিজ্ঞাসা করব। এমন সময় মনে হলো কেউ যেন আমাকে এ কথা বলছে, এতে ভিক্ষুকরা সাহচর্য পাবে ও কর্মজীবীরা আলো পাবে। পথিক সঠিক পথের দিশা খুঁজে পাবে। আল্লাহর ঘর অন্ধকারের নিঃসঙ্গতা থেকে পবিত্র থাকবে। আমি এসবের সঙ্গে আরো কিছু কথা যুক্ত করে লিখে দিই।
রমজানে কর্ডোভা গ্র্যান্ড মসজিদের সাজসজ্জার প্রতি আন্দালুসের মন্ত্রী আল-মানসুর বিন আবু আমিরের বিশেষ আগ্রহ ছিল। ইবনে আজারি (মৃত্যু : ৭১২ হিজরি) তাঁর ‘আল-বায়ানুল মুগরিব’ গ্রন্থে লিখেছেন, প্রতি রমজানে মসজিদের প্রদীপ প্রজ্বলনের কাজে পুরো বছরের মোট চাহিদার অর্ধেক তেল ও মোট শণের সলতের তিন-চতুর্থাংশ ব্যবহৃত হতো। শুধু মোমবাতির জন্য তিনটি বড় ভাণ্ডার থাকত, যার সবগুলো রমজানে ব্যবহৃত হতো। ইমামের পাশে বড় মোমবাতি জ্বালানো হতো, যার ওজন ছিল ৬০ রিতিল বা ২২-৩২ কেজি।
মসজিদের সাজসজ্জা নিয়ে ফাতেমি সুলতানদের আগ্রহ ছিল প্রবল। মিসরের কায়রোতে অবস্থিত জামিউল আজহার, হাকেমি মসজিদ ও জামে রাশিদাসহ বিভিন্ন মসজিদ রমজান মাসে বর্ণিল রূপ ধারণ করত। আল-মাকরিজি তাঁর ‘আল-মাওয়াইজ ওয়াল ইতিবার’ গ্রন্থে লিখেছেন, ফাতেমি খলিফা হাকিম বিআমরিল্লাহর পক্ষ থেকে রমজান মাসে জামিউল আজহারের জন্য দুটি তন্দুর ও ২৭টি প্রদীপ এবং জামি রাশিদার জন্য একটি তন্দুর ও ১২টি প্রদীপ বরাদ্দ থাকত। রমজান শুরুর দুই দিন আগে সাজসজ্জা ও সুগন্ধির প্রয়োজনীয় সামগ্রী ও খোঁজখবর নিতে বিচারকরা শহরের সব মসজিদ ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করতেন।
কিউএনবি/আয়শা/২৬ মার্চ ২০২৩,/রাত ৯:৪৪