ভোট গ্রহণে বিএনপি ও আওয়ামী লীগপন্থী আইনজীবীদের হামলা-পাল্টা হামলায় উত্তপ্ত সুপ্রিম কোর্ট
Reporter Name
Update Time :
বৃহস্পতিবার, ১৬ মার্চ, ২০২৩
১২৯
Time View
জালাল আহমদ ,ঢাকা : সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ পন্থী আইনজীবীদের হামলা- পাল্টা হামলায় সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণ ছিল দিনভর উত্তপ্ত।পুলিশের হামলায় সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও সাংবাদিকরা গুরুতর আহত হয়েছেন ।আওয়ামী লীগপন্থী আইনজীবীরা বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের চেম্বার ভাংচুর করে।
জানা যায় , সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে ভোট দিতে সকাল ৭ টার আগে থেকেই আইনজীবীরা সমিতি প্রাঙ্গণে আসতে শুরু করেছেন।সকাল ৭ টার পর থেকেই দেখা যায় সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি প্রাঙ্গণে শত শত পুলিশের উপস্থিতি। এছাড়া সাদা পোশাকে দায়িত্ব পালন করছেন বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা। দুই দিনব্যাপী এই নির্বাচনের ভোট গ্রহণ শুরুর হওয়ার কথা সকাল ১০ টা থেকে। কিন্তু নির্বাচন কমিশনার নিয়ে দ্বন্দ্ব তৈরি হওয়ায় ভোট গ্রহণে দুই ঘণ্টা দেরি হয়।
ঘটনার সূত্রপাত:
বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের আপত্তির মুখে দুপুর বারোটায় ভোট গ্রহণ শুরু হয়।এ সময় আওয়ামী লীগপন্থী আইনজীবীরা জাল ভোট দিচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা। বিএনপি-সমর্থিত প্যানেল থেকে সভাপতি প্রার্থী মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, ‘কমিশন বিষয়ে সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত নির্বাচন হবে না।’একজন ভোটার ১০০/১৫০ করে জাল ভোট দিচ্ছে।এ সময় বিএনপি-সমর্থিত আইনজীবীরা ‘ইয়েস, ইয়েস’ বলে রব তোলেন। এর পক্ষে-বিপক্ষে হইচই ও হট্টগোল শুরু হয়।
এ সময় পেশাগত দায়িত্ব পালন করার ১০/১২ জন সাংবাদিকের ওপর হামলা চালায় পুলিশ এবং আওয়ামী লীগপন্থী আইনজীবীরা। গুরুতর আহত এটিএন নিউজের রিপোর্টার জাবেদ আক্তারকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। আহত অন্যরা হলেন- প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ ফটো সাংবাদিক শুভ্র কান্তি দাস, জাগো নিউজের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ফজলুল হক, আজকের পত্রিকার নূর মোহাম্মদ, ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনের জান্নাতুল ফেরদৌস, বৈশাখী টেলিভিশনের ক্যামেরা পার্সন ইব্রাহিম হোসেন, এটিএন বাংলার ক্যামেরা পার্সন হুমায়ুন কবির, মানবজমিনের আব্দুল্লাহ আল মারুফ।
প্রধান বিচারপতির সাথে সাক্ষাৎ :
নির্বাচন কমিশন বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের দাবী আমলে না নেওয়ায় সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবিতে দুপুর দুইটার দিকে প্রধান বিচারপতির সাথে দেখা করেন বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের নেতা মাহবুব উদ্দিন খোকন এবং রুহুল কুদ্দুস কাজল।
সাক্ষাৎকার শেষে মাহবুব উদ্দিন খোকন জানান, আমরা প্রধান বিচারপতির সাথে সাক্ষাৎ করেছি।
আইনজীবী ও সাংবাদিকদের ওপর পুলিশের হামলার কথা বলেছি। তিনি (প্রধান বিচারপতি) ওপেন কোর্টে বলেছেন যে,এটা অপরাধ।
রুহুল কুদ্দুস কাজল এ সময় সাংবাদিকদের জানান, আমরা প্রধান বিচারপতিকে বলেছি, আগে কমিশন এবং পরে নির্বাচন।
পুনরায় নির্বাচনের দাবি:
প্রধান বিচারপতির সাথে মোট চার বার দেখা করেও তার কাছ থেকে কোন প্রতিকার না পেয়ে দুপুর তিনটায় সংবাদ সম্মেলন করেন বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা।এ সময় রুহুল কুদ্দুস কাজল সাংবাদিকদের জানান, নিয়ম অনুযায়ী ভোট গ্রহণের আগেই ব্যালট বাক্স খুলে দেখাতে হয়। কিন্তু নির্বাচন কমিশনারগণ আমাদের কে দেখায় নি। তিনি এ সময় সুপ্রিম কোর্টের ভেতরে ঢুকে আইনজীবী ও সাংবাদিকদের ওপর পুলিশী হামলার নিন্দা জানান।
ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন জানান, আমরা প্রধান বিচারপতির সাথে দেখা জানতে চেয়েছি সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোন পুলিশ চাওয়া হয়েছে কিনা। তিনি (প্রধান বিচারপতি) বললেন সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোন পুলিশ চাওয়া হয় নি।
মাহবুব উদ্দিন খোকন আরো জানান, আমি টানা সাতবার এই সমিতির সাধারণ সম্পাদক ছিলাম। কখনো পুলিশ অনুমতি ছাড়া আইনজীবী সমিতির ভেতরে ঢুকে নি। তিনি এ সময় নতুন করে নির্বাচনের দাবি জানান।
বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের হামলায় তছনছ ব্যালট পেপার:
বিকাল সাড়ে তিনটায় বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা সংবাদ সম্মেলন শেষে এক বিশাল মিছিল বের করে
বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা।এ সময় ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন , রুহুল কুদ্দুস কাজল, গাজী কামরুল ইসলাম সজল মিছিলে নেতৃত্ব দেন। মিছিলটি সুপ্রিম কোর্টের সোনালী ব্যাংকের গেট প্রদক্ষিণ করার সময় কয়েকজন আইনজীবী নির্বাচনী প্যান্ডেলে হামলা করলে আওয়ামী লীগপন্থী আইনজীবীরা পালিয়ে যায়।
হামলায় তছনছ হয়ে যায় ব্যালট পেপার।এ সময় বিক্ষুব্ধ আইনজীবীরা ব্যালট বাক্স ভাংচুর করে। পুলিশ প্রথমে বাধা দিলেও পরে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে আইনজীবীরা। এ সময় পুলিশ পিছু হটে।
বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের চেম্বার ভাংচুর:
সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচন কে কেন্দ্র করে ভোট গ্রহণে বাধা দেওয়া এবং ভোট কেন্দ্রে হামলার অভিযোগে পুলিশ পাহারায় বিকেল সাড়ে তিনটায় জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম সুপ্রিমকোর্ট শাখার সাধারণ সম্পাদক এবং বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এডভোকেট গাজী কামরুল ইসলাম সজল সহ বিএনপি-জামায়াত পন্থী ৫/৬ জন আইনজীবীর রুম ভাংচুর করেছে আওয়ামী লীগপন্থী সাদা দলের আইনজীবীরা। আওয়ামী লীগপন্থী আইনজীবী এডভোকেট সায়েম, এডভোকেট জগলুল কবির হামলা ও ভাংচুরের ঘটনায় নেতৃত্ব দেন।গাজী কামরুল ইসলাম সজলের ১৩১ নাম্বার রুমে ভাংচুর চালানোর সময় বাঁধা দিলে এক মহিলা আইনজীবীকে লাঞ্ছিত করা হয়।
এডভোকেট মোঃ তাহিরুল ইসলাম এবং রঞ্জন চক্রবর্তী ১৪৬ নাম্বার রুমেও ভাংচুর চালায় দুর্বৃত্তরা।
দ্বন্দ্ব শুরু যেভাবে:
গতবারের ১৫ এবং ১৬ মার্চ সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির ভোট গ্রহণের পর ১৭ মার্চ গণনায় দেখা যায় , সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির কার্যনির্বাহী কমিটির ১৪টি পদের মধ্যে সভাপতি সহ ৬টি পদে এগিয়ে ছিল আওয়ামী লীগ সমর্থিত আইনজীবীরা এবং সাধারণ সম্পাদক ,দুটি সহ- সাধারণ সম্পাদক,কোষাধ্যক্ষসহ অপর ৮টি পদে এগিয়ে ছিল বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা। ফলাফল ঘোষণার একটু আগেই আওয়ামী লীগপন্থী সাদা দলের আইনজীবীরা সাধারণ সম্পাদক পদে পুনরায় ভোট গণনার দাবিতে বিক্ষোভ করে। পুনরায় ভোট গণনার বিষয়টি সমিতির গঠনতন্ত্রে নেই বলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার তাদের দাবি প্রত্যাখ্যান করে ফলাফল ঘোষণায় অনড় থাকে। আওয়ামী লীগপন্থী আইনজীবীরা এ সময় প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে বিতর্কে জড়িয়ে যায়। এমনকি প্রধান নির্বাচন কমিশনারের দিকে খালি পানির বোতল এবং ব্যালট পেপার ছুঁড়ে মারে। ক্ষুব্ধ হয়ে ফলাফল ঘোষণা না করেই পদত্যাগ করেন তিনি। এর পর আওয়ামী লীগপন্থী আইনজীবীরা নিজেদের লোক কে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ দিয়ে সাধারণ সম্পাদক পদ টি বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের কাছ থেকে কেড়ে নেন।তখন থেকেই আওয়ামী লীগপন্থী সাদা দলের আইনজীবীদের সঙ্গে বিএনপিপন্থী নীল দলের আইনজীবীদের মধ্যে বিরোধ চলে আসছে।
এ বছর যেভাবে দ্বন্দ্ব তৈরি হলো:
এবারের নির্বাচন পরিচালনার জন্য আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্যানেল আইনজীবী শাহ খসরুজ্জামানকে আহ্বায়ক করে সাত সদস্যের উপ–কমিটি ঘোষণা করেন। অন্যদিকে বিএনপি সমর্থিত প্যানেল হতে আইনজীবী এ জেড এম ফরিদুজ্জামান আহ্বায়ক করে সাত সদস্যের নির্বাচন পরিচালনার উপ কমিটি ঘোষণা করা হয়। তবে গত ২ মার্চ উভয়পক্ষের সম্মতিতে নির্বাচন পরিচালনার জন্য সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মো. মনসুরুল হক চৌধুরীকে আহ্বায়ক করে সাত সদস্য বিশিষ্ট উপ-কমিটি পুর্নগঠন করা হয়। কিন্তু সোমবার মনসুরুল হক চৌধুরী ‘ব্যক্তিগত কারণ’ দেখিয়ে পদত্যাগপত্র জমা দেন। এরপর সৃষ্টি হয় পুরনো দিনের সেই একই বিরোধ।১৫ ও ১৬ মার্চ অনুষ্ঠেয় সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচন পরিচালনাসংক্রান্ত উপকমিটির আহ্বায়ক সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মো. মনসুরুল হক চৌধুরীর পদত্যাগ ঘোষণার পর মঙ্গলবার সন্ধ্যার পর সমিতি প্রাঙ্গণে আহ্বায়ক কমিটির প্রধান কে হবেন তা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। আওয়ামী লীগ সমর্থিত আইনজীবীরা নির্বাচন পরিচালনা উপকমিটির আহ্বায়ক হিসেবে মো. মনিরুজ্জামানকে মনোনীত করেন। অন্যদিকে বিএনপি সমর্থিত আইনজীবীরা এ এস এম মোকতার কবির খানকে আহ্বায়ক মনোনীত করেন। একপর্যায়ে পক্ষে-বিপক্ষে মিছিল, হইচই ও হট্টগোল শুরু হয়। সেই সাথে দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া এবং হাতাহাতির ঘটনা ঘটে এবং আইনজীবী সমিতি ভবনের বিভিন্ন জায়গায় ব্যালট পেপার পড়ে থাকতে দেখা যায়।
এক নজরে এবারের নির্বাচন:
এ বছর সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে ১৪টি পদের বিপরীতে ২৯ জন প্রার্থী রয়েছেন। এবারের নির্বাচনে ভোটার সংখ্যা ৮ হাজার ৬০২ জন আইনজীবী। এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত সাদা প্যানেলে সভাপতি পদে বর্তমান সভাপতি সিনিয়র অ্যাডভোকেট মো. মোমতাজ উদ্দিন ফকির, সম্পাদক পদে বর্তমান সম্পাদক অ্যাডভোকেট আব্দুন নুর দুলাল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
আওয়ামী লীগ সমর্থিত সাদা প্যানেলের অন্য প্রার্থীরা হলেন— সহ-সভাপতি পদে মোহাম্মদ আলী আজম ও জেসমিন সুলতানা, ট্রেজারার পদে মাসুদ আলম চৌধুরী, সহ-সম্পাদক পদে নুরে আলম উজ্জ্বল এবং হারুনুর রশিদ।
অন্যদিকে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত নীল প্যানেলের সভাপতি পদে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এবং সমিতির ৭ বারের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন ও সম্পাদক পদে সমিতির তিনবারের নির্বাচিত সাবেক সম্পাদক ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
এই প্যানেলের অন্য প্রার্থীরা হলেন— সহ-সভাপতি পদে অ্যাডভোকেট হুমায়ুন কবির মঞ্জু, সরকার তাহমিনা সন্ধ্যা, সহ-সম্পাদক পদে ব্যারিস্টার মাহফুজুর রহমান মিলন, অ্যাডভোকেট মো. আব্দুল করিম ও কোষাধ্যক্ষ পদে রেজাউল করিম প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।
কার্যনির্বাহী সদস্য পদে অ্যাডভোকেট আশিকুজ্জামান নজরুল, ফাতিমা আক্তার, ফজলে এলাহি অভি, ব্যারিস্টার ফয়সাল দস্তগীর, অ্যাডভোকেট শফিকুল ইসলাম, মোস্তাফিজুর রহমান আহাদ ও রাসেল আহমেদ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।