ডেস্কনিউজঃ রাজধানীর কলাবাগানের তেঁতুলতলা মাঠ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে গতকাল বুধবার নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদলের বৈঠকে কোনো সমাধান মেলেনি। তবে আপাতত থানা ভবনের নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার বিষয়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আশ্বাস পাওয়া গেছে।
এদিকে পুলিশের তদারকিতে ওই মাঠে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের কাজ গতকালও চলেছে। অন্যদিকে নির্মাণকাজ বন্ধের দাবিতে ওই মাঠে গাছ লাগানোসহ নানা প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছেন প্রতিবাদকারীরা।
কাজ বন্ধ না হলে প্রয়োজনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সিটি করপোরেশন ঘেরাও করা হবে বলেও ঘোষণা দিয়েছেন তাঁরা।
সচিবালয়ে গতকাল দুপুরে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের সঙ্গে বৈঠক করেন। পরে মন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, তেঁতুলতলার যে মাঠ নিয়ে আন্দোলন চলছে, সেটি কখনোই মাঠ ছিল না। এটি একটি খাসজমি। এই মাঠ কেনা হয়েছে পুলিশের পক্ষ থেকে। থানা ভবন নির্মাণের জন্য এর চেয়ে সুন্দর জায়গা পেলে বিকল্প সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। আপাতত এটি পুলিশের সম্পত্তি।
সেখানে নির্মাণকাজ চলবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘নির্মাণকাজ হবে কি হবে না সেটা পরের কথা। জায়গাটি পুলিশের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে। বরাদ্দ যেহেতু হয়েছে, জায়গাটি এখন পুলিশের। ’
মন্ত্রী বলেন, ‘যেহেতু এটা পুলিশের সম্পত্তি; কিছুক্ষণ আগে যাঁরা এসেছিলেন তাঁরাও আমাদের কাছে একটি আবেদন করেছেন, বিকল্প কিছু করা যায় কি না; সেই পর্যন্ত নির্মাণকাজ স্থগিত রাখার জন্য। আমি বলেছি, আমরা তো এখনই কনস্ট্রাকশনে যাচ্ছি না। খুঁজুন, আমরা দেখব। আপনারা যদি এর চেয়ে ভালো অফার দিতে পারেন, অবশ্যই দেখব। এটাই বলা হয়েছে। ’
থানার জন্য গড়ে তোলা সীমানাপ্রাচীরের পাশেই গাছের চারা রোপণ করেন মাঠ রক্ষার আন্দোলনকারীরা।
প্রাচীর নির্মাণ স্থগিত রাখার জন্য ডিএমপি কমিশনারকে বলবেন কি না, জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, ‘আমি বলেছি, আমরা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে ঠিক করব। ’
বৈঠক শেষে মানবাধিকারকর্মী খুশী কবির সাংবাদিকদের বলেন, তেঁতুলতলা মাঠের নির্মাণকাজ আপাতত বন্ধে ডিএমপি কমিশনারের সঙ্গে কথা বলে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং বিকল্প কোনো স্থানে থানা ভবন নির্মাণ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করার কথা জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

পরিবেশবিদ সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, থানা ভবন নির্মাণ বন্ধের দাবিতে এলাকাবাসীর সই করা একটি স্মারকলিপিও প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
বৈঠক থেকে তেঁতুলতলা মাঠে গিয়ে স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, ‘আমরা আশাবাদী। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছেও আমরা আবেদন করব। ’
তেঁতুলতলা মাঠে কর্মসূচি
গতকাল মানবাধিকারকর্মী, পরিবেশ আন্দোলনকর্মী ও সাংস্কৃতিককর্মীরা তেঁতুলতলা মাঠে জড়ো হয়ে প্রতিবাদ জানান। তাঁরা মাঠে বৃক্ষরোপণ, দেয়াললিখন ও সাইনবোর্ড টাঙানো কর্মসূচিতে অংশ নেন। পাশেই চলছিল থানার জন্য সীমানাপ্রাচীর তৈরির কাজ। এরই মধ্যে শিশুদের খেলার আয়োজন এবং পুতুল খেলা প্রদর্শন করা হয়। দেয়ালঘেঁষে ১৪টি দেশীয় গাছও রোপণ করা হয়। পুলিশ তাদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে কোনো বাধা দেয়নি। স্থানীয় বাসিন্দা, নাগরিক প্রতিনিধি ও শিশুরাও বাধা দেয়নি নির্মাণকাজে।
মন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনার সিদ্ধান্ত তেঁতুলতলা মাঠে পৌঁছার পর সেখানে প্রতিবাদ কর্মসূচিতে বক্তারা বলেন, থানা ভবন নির্মাণের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে মাঠ শিশু-কিশোরদের ফিরিয়ে দিতে হবে।
‘আমাদের মাঠে আমরাই খেলব’ লেখা একটি সাইনবোর্ড মাঠে টাঙিয়েছেন আন্দোলনকর্মীরা। এক পর্যায়ে স্থানীয় শিশু-কিশোররা মাঠে উপস্থিত হয়ে নানা স্লোগান দেয়। এ সময় তাদের হাতে বিভিন্ন খেলার সামগ্রী দেখা যায়। তারা মাঠে খেলা শুরু করে। তাদের জন্য পুতুল নাটক প্রদর্শন করেন সাংস্কৃতিককর্মীরা। নাগরিক প্রতিনিধিরা ১৪টি দেশীয় গাছের চারা রোপণ করেন।
সেখানে প্রতিবাদ সমাবেশে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে. চৌধূরী বলেন, ‘ঢাকা শহরে আমরা শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মরে যাওয়ার অবস্থায় আছি। সেখানে যদি মাঠ দখল হয়ে যায়, তাহলে এ এলাকার নতুন প্রজন্ম কোথায় যাবে? তারা (পুলিশ) বলেছে ভবন নির্মাণে রাজউকের অনুমোদন নেওয়া হয়েছে, কিন্তু রাজউক বলছে জানে না। তাহলে কিভাবে এখানে থানা ভবন নির্মাণ হয়?’
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) নির্বাহী কমিটির মহাসচিব নূর খান বলেন, ‘অবিলম্বে সরকারের পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত আসুক, এটিকে শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার মাঠ হিসেবেই বিবেচনা করা হোক। ’
বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সাধারণ সম্পাদক জামসেদ আনোয়ার বলেন, ‘তেঁতুলতলা মাঠ শিশু-কিশোরদের ফিরিয়ে দেওয়া না হলে প্রয়োজনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ঘেরাও করা হবে। ’
দুপুরে মাঠে গিয়ে কর্মসূচিতে একাত্মতা ঘোষণা করেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘থানা ভবন বানানোর জন্য কোথাও জায়গা না পেলে মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আপনার বাড়ির একটু জায়গা দেন। তাতে আপনার সুনাম হবে। আর কোথাও জায়গা না পেলে পাশের বহুতল ভবনের চারতলা-পাঁচতলা নিয়ে নেন, সেখানে থানা করেন। ’ তেঁতুলতলা মাঠ ‘শিশুদের ফুসফুস, বয়স্কদের ফুসফুস’ মন্তব্য করে জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘এই ফুসফুস নষ্ট করতে দেওয়া যাবে না। এখান থেকে ইট-পাথর সরাতে হবে। তা না হলে আমরা এখানে আস্তানা গাঁড়ব। ’
এদিকে আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক সৈয়দা রত্না গতকাল তাঁর ছেলেকে নিয়ে তেঁতুলতলার মাঠে যান। তিনি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি, দেয়াললিখন ও সাইনবোর্ড টাঙানো কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি শিশুদের সঙ্গে ক্রিকেট খেলেন। রত্না বলেন, ‘আমি এই মাঠ উন্মুক্ত দেখতে চাই। ’
গতকাল সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, মাঠের উত্তর দিক শুধু খোলা আছে। সে অংশে পাঁচ ইঞ্চি গাঁথুনির চার ফুট উচ্চতার দেয়াল উঠে গেছে। একজন শ্রমিক বলেন, চার ফুট দেয়ালের ওপর এক ফুটের মতো ১০ ইঞ্চির ঢালাই হবে। সেই ঢালাইয়ের ওপর দেওয়া হতে পারে কাঁটাতার বা কাচ, যাতে দেয়াল ডিঙিয়ে মাঠে কেউ প্রবেশ করতে না পারে। মাঠের পাশেই পুলিশের দুটি গাড়ি আছে। সেখানে পোশাকে ২০ জন পুলিশ সদস্যকে অবস্থান করতে দেখা গেছে। সাদা পোশাকেও আছেন কয়েকজন পুলিশ সদস্য।
কিউএনবি/বিপুল/ ২৮ এপ্রিল ২০২২খ্রিস্টাব্দ / রাত ০২:৩৮