
ডেস্ক নিউজ : রাষ্ট্রীয় সম্মান ‘গার্ড অব অনার’ না জানিয়ে কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরে বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মোতালেব শিকদারের দাফনের ঘটনা তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের সচিব, জনপ্রশাসন সচিব ও জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের (জামুকা) মহাপরিচালককে এ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আজ রবিবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) এ সংক্রান্ত রিটে সম্পূরক আবেদনের শুনানি করে এ আদেশ দেন বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম ও বিচারপতি মো. ইকবাল কবিরের হাইকোর্ট বেঞ্চ।
আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল কাজী মাইনুল হাসান ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল নাসিম ইসলাম রাজু। আইনজীবী সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এ ঘটনার তদন্তের নির্দেশনা চেয়ে সম্পূরক আবেদন করেছিলাম। আদালত তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। ঠিক কতদিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে হবে তা এই মুহুর্তে বলা যাচ্ছে না। ’
রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ছাড়া দাফনের ঘটনা তদন্ত চেয়ে এবং ব্যর্থতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করেন আবদুল মোতালেব শিকদারের ছেলে রানা শিকদার। গত ৪ ফেব্রুয়ারি এ রিটের শুনানিতে আদালত উষ্মা প্রকাশ করেন। বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারক সেদিন বলেছিলেন, ‘বীর মুক্তিযোদ্ধারা দেশের সূর্যয় সন্তান। এমন একজন সূর্য সন্তানকে গার্ড অব অনার ছাড়া দাফন করে মুক্তিযোদ্ধাকে অপমান করা হয়েছে। এটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। ’
পরে আদালত রুল দেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মোতালেব শিকদারের মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় সম্মান ‘গার্ড অব অনার’ না জানানোর ব্যর্থতা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না এবং এ ব্যর্থতার দায় নিরূপনে বাজিতপুর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কেন তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হবে না, তা জানতে চাওয়া হয় রুলে। মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের সচিব, জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের মহাপরিচালক, জনপ্রশাসন সচিব, কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক, বাজিপুরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে রুলের জবাব দিতে বলা হয়। এর মধ্যেই সম্পূরক আবেদনে তদন্তের অন্তবর্তী আদেশ হলো।
আবদুল মোতালেব শিকদার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘লাল মুক্তিবার্তায় বাবার নাম রয়েছে। তাছাড়া মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তিনি ভাতা পেতেন। তিনি ভাতাপ্রাপ্ত একজন মুক্তিযোদ্ধা। ” মুক্তিযোদ্ধাদের মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মান জানিয়ে দাফন করা হয় একটি নীতিমালার আওতায়। ২০২০ সালের ১৫ নভেম্বর ‘বীর মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুতে রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মান প্রদর্শন আদেশ, ২০২০’ জারি করে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। সরকারের প্রতিনিধি হিসাবে জেলা বা উপজেলা প্রশাসনের ডিসি বা ইউএনওরা গার্ড অব অনার দেওয়ার ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিয়ে থাকেন।
ওই আদেশ জারির বিবৃতিতে বলা হয়, নতুন আদেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মান প্রদর্শনের জন্য মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে (www.molwa.gov.bd) প্রকাশিত প্রমাণকের যেকোনো একটিতে নাম থাকতে হবে। প্রমাণকগুলোর মধ্যে রয়েছে মুক্তিযোদ্ধাদের ভারতীয় তালিকা, মুক্তিযোদ্ধাদের ভারতীয় তালিকা (পদ্মা), মুক্তিযোদ্ধাদের ভারতীয় তালিকা (মেঘনা), মুক্তিযোদ্ধাদের ভারতীয় তালিকা (সেক্টর) এবং মুক্তিযোদ্ধাদের ভারতীয় তালিকা (সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী)। লাল মুক্তিবার্তার মধ্যে রয়েছে লাল মুক্তিবার্তা (চূড়ান্ত লাল বই), লাল মুক্তিবার্তা স্মরণীয় যারা বরণীয় যারা।
আদেশে বলা হয়, কোনো বীর মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যু হলে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক বা উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে জানাতে হবে। মহানগর ও জেলা সদরে জেলা প্রশাসক এবং উপজেলা পর্যায়ে হলে উপজেলা নির্বাহী অফিসার বীর মুক্তিযোদ্ধাকে সম্মান প্রদর্শনের জন্য সরকারের পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করবেন। রাষ্ট্রীয় বা জন গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যস্ত থাকলে জেলা প্রশাসকের পক্ষে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক এবং উপজেলা নির্বাহী অফিসারের পক্ষে সহকারী কমিশনার (ভূমি) সরকারের প্রতিনিধিত্ব করবেন।
রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মান প্রদর্শনের নিয়ম সম্পর্কে বলা হয়েছে, মৃত বীর মুক্তিযোদ্ধার কফিন জাতীয় পতাকা দ্বারা আবৃত করতে হবে। তবে সৎকার বা সমাধিস্থ করার আগে জাতীয় পতাকা খুলে ফেলতে হবে। সরকারের অনুমোদিত প্রতিনিধি কফিনে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। অনুমোদিতসংখ্যক পুলিশ বাহিনীর সশস্ত্র সদস্যরা সশস্ত্র সালাম প্রদান করবেন এবং বিউগলে করুন সুর বাজাতে হবে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা গার্ড অব অনার পরিচালনা করবেন। ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রাষ্ট্রীয় বা জনগুরুত্বপূর্ণ কাজের কারণে থাকতে না পারলে থানার পরবর্তী জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করবেন। উল্লেখ্য, গত ২৮ জানুয়ারি বাজিতপুর পৌরসভার বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মোতালেব শিকদার মারা যান। পরদিন তার দাফনের সময় সবাই উপস্থিত হলেও যাননি উপজেলা নির্বাহী অফিসার। এ কারণে মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মোতালেব শিকদারকে গার্ড অব অনার ছাড়াই দাফন করা হয়। এ ঘটনায় এলাকাবাসী ক্ষোভও প্রকাশ করেন। এরপর গত ৩১ জানুয়ারি ওই বীর মুক্তিযোদ্ধাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ছাড়া দাফনের ঘটনা তদন্ত চেয়ে এবং ব্যর্থতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে এ রিটটি করা হয়।
কিউএনবি/আয়শা/১৩ই ফেব্রুয়ারি, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ/বিকাল ৩:৫৯