স্পোর্টস ডেস্ক : ১৭ ফেব্রুয়ারি নতুন মন্ত্রিসভা শপথ গ্রহণের পর থেকেই সচিবালয়ে শুরু হয়েছে ব্যস্ততা। আজ দ্বিতীয় কর্মদিবসেও সেখানে ছিল কর্মচাঞ্চল্য। প্রধানমন্ত্রী সচিবালয়ে এসে অফিস করেছেন, আর স্ব স্ব মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন মন্ত্রীরাও। সচিব ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক, প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা, আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা এবং শুভেচ্ছা-অভিনন্দন গ্রহণ—সব মিলিয়ে দিনভর কর্মতৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো।
ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী: সত্যিই ভিন্ন অনুভূতি। খেলোয়াড় থেকে এখন ক্রীড়াঙ্গনের সর্বোচ্চ দায়িত্বে এসেছি। চেয়ারে বসার মুহূর্তেই মনে হয়েছে, খেলোয়াড়দের এবং দেশের ক্রীড়াঙ্গনের জন্য নিজেকে সম্পূর্ণভাবে উজাড় করে দিতে হবে। আমি তৃণমূল থেকে শুরু করে জাতীয় দলের খেলোয়াড় হিসেবে দীর্ঘ সময় কাটিয়েছি। তাই প্রতি স্তরে খেলোয়াড়দের যে প্রতিবন্ধকতা দেখা দেয়, তা ভালোভাবে জানি। আমি চাই, আমি এবং আমার সমসাময়িকরা যেসব সমস্যার মধ্য দিয়ে ক্যারিয়ার শেষ করেছি, পরবর্তী প্রজন্মের খেলোয়াড় যেন সেই সমস্যায় না পড়েন। আমার লক্ষ্য কেবল খেলোয়াড় নয়, খেলাধুলার সঙ্গে যুক্ত কোচ, সংগঠক ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা।
বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে সরকারের কাছে মূলত দু’টি চাওয়া থাকে—অবকাঠামো উন্নয়ন এবং ক্রিকেট ছাড়া অন্যান্য ফেডারেশনের আর্থিক অনুদান বৃদ্ধি। আমি জানি, ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের বাজেটও সীমিত। প্রধানমন্ত্রীর মাধ্যমে আপনি ক্রীড়াঙ্গনের এই সংকটগুলো সমাধানে কতটুকু আশাবাদী?
ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী: প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত ক্রীড়ানুরাগী। আমাদের নির্বাচনের ইশতেহারেও ক্রীড়ার বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখ ছিল। বিশেষ করে তৃণমূল পর্যায়ে স্পোর্টস ফ্যাসিলিটিজ বৃদ্ধি। প্রধানমন্ত্রী সব সময় ক্রীড়া উন্নয়ন ও বিকাশে পাশে থাকবেন।
স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বহু সাবেক ক্রীড়াবিদ ও সংগঠক সংসদ সদস্য হলেও কখনো ক্রীড়াঙ্গন একত্র হয়ে কাউকে সরাসরি ক্রীড়া মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে চায়নি। কিন্তু জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পরও ক্রীড়াঙ্গন সরাসরি আপনাকে এই দায়িত্বে দেখতে চেয়েছে। এটা কিভাবে দেখছেন?
ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী: আমি আসলে সবার প্রতি কৃতজ্ঞ। সবাই আমাকে এত ভালোবাসে। ক্রীড়াঙ্গনের মানুষ যেমন আমাকে এই দায়িত্বে চেয়েছে, তেমনি আমার এলাকা মিরপুর পল্লবীবাসীও আমাকে ভোট দিয়েছেন। সবার কাছে আমি সমানভাবে কৃতজ্ঞ। তাদের এই ভালোবাসা আমি কাজের মাধ্যমে দিতে চাই। এজন্য সবার দোয়া ও সহযোগিতা চাই।
বাংলাদেশের ফুটবলের স্মরণীয় মুহূর্তের মধ্যে অন্যতম ২০০৩ সালের ঢাকা সাফ ফুটবলে ভারতের বিপক্ষে আপনার টাইব্রেকার সেভ। এরপর ডিফেন্ডার সুজনের গোলে বাংলাদেশের সাফ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার দৌড় উল্লাস। সেই ঐতিহাসিক সাফ ট্রফি ফেডারেশনে নেই। ক্রীড়া জাদুঘর বা ইতিহাস সংরক্ষণে কোনো উদ্যোগ নেবেন কি?
ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী: বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। অনেক খেলায় এ ধরনের অর্জন রয়েছে। সেগুলো বর্তমানে কোন অবস্থায় আছে বা নেই, তা আমি খুঁজে দেখব এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেব।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আসর অলিম্পিক। সরাসরি অলিম্পিক খেলার যোগ্যতা অর্জন করা আরচ্যার রোমান সানা ইতোমধ্যে আমেরিকা পাড়ি জমিয়েছেন। সাম্প্রতিক সময়ে আরও অনেক মেধাবী ক্রীড়াবিদ দেশান্তরী হয়েছেন। ক্রীড়া মেধাপাচার রোধে আপনার বিশেষ কোনো ভূমিকা থাকবে কি?
ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী: বর্তমান ও সাবেক উভয় ক্রীড়াবিদদের সুরক্ষা প্রয়োজন। এজন্য আমরা জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের বেতন ও আর্থিক কাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছি। অবসর নেওয়ার পর খেলোয়াড়দের কর্মসংস্থান হিসেবে ক্রীড়া শিক্ষক বা কোচ হিসেবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। অনেক খেলাই এখনো পেশা হিসেবে সঠিকভাবে গড়ে ওঠেনি। আমরা চাই খেলা পেশা হোক, পেশা হলেই অনেক সংকটই স্বাভাবিকভাবে কাটবে।
ক্রীড়াবিদদের সাধারণ অভিযোগ—সব সরকারই ফুটবল ও ক্রিকেটে বেশি মনোযোগ দেয়। অন্য খেলাগুলো থেকে যায় অবহেলিত। এ বিষয়ে আপনি কোনো নীতি অনুসরণ করবেন?
ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী: আমরা সব খেলাকেই সমান গুরুত্ব দিতে চাই। চতুর্থ শ্রেণি থেকে পাঁচটি খেলাকে বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ নিয়ে খুব শিগগিরই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করব। ওই পাঁচটি খেলার মধ্যে জনপ্রিয় দুই খেলা ক্রিকেট ও ফুটবলের পাশাপাশি আরও তিনটি খেলা থাকবে। দাবা, আর্চারি, শুটিং, সাঁতার, অ্যাথলেটিক্সসহ অন্যান্য খেলাকেও আমরা সমান গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে নিতে চাই।”
দেশের দুই শীর্ষ ক্রীড়া ফেডারেশন ফুটবল ও ক্রিকেট। এই দুই ক্রীড়া সংগঠন সরকারের অবকাঠামো ও সকল সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করে। অথচ অধিকাংশ সময় জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ বা মন্ত্রণালয় এই ফেডারেশন থেকে প্রকৃত জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পারে না। এ ব্যাপারের আপনার মতামত কী?
ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী: ফেডারেশন স্বাধীনভাবে কাজ করবে, আবার আমাদেরকে জবাবদিহি করতে হবে। আমরা সকল ফেডারেশনের কাজে প্রয়োজনীয় বিষয়ে সহায়তা অবশ্যই করব, তবে দিন শেষে খেলার ফলাফল মূল্যায়ন এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতাও নিশ্চিত করব।
ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের স্বল্প বাজেট। সেই অর্থের প্রকৃত সদ্ব্যবহার হয় না। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ, বিকেএসপি, ফেডারেশন ভিন্ন ভিন্নভাবে প্রতিভা অন্বেষণ করে। অর্থ ব্যয় হয় অনেক, কিন্তু আদৌ সেভাবে প্রতিভা মেলে না। ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে তেমন সমন্বয় নেই।
ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী: আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব নিয়েছি মাত্র দুই দিন। অনেক বিষয় রয়েছে পরিকল্পনাহীন এবং সমন্বয়হীনভাবে। এগুলো খুঁজে খুঁজে বের করে একটি সিস্টেমে আনতে হবে। এজন্য অবশ্যই সময় প্রয়োজন। ক্রীড়াঙ্গনের সকলের সহযোগিতাও প্রয়োজন। আপনাদের সাংবাদিকদের সঙ্গে আগামী রোববার বসছি, এরপর ফেডারেশনগুলোর সঙ্গে। এই আলোচনায় নিশ্চয়ই অনেক বিষয় উঠে আসবে। সেগুলো পর্যালোচনা করে আমরা সামনে এগিয়ে যাব।
যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী পদাধিকার বলে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের চেয়ারম্যান। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ ফেডারেশনগুলোর অভিভাবক। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ অ্যাক্ট, ফেডারেশন নির্বাচন বিধিমালা, ফেডারেশন-অ্যাসোসিয়েশন স্বীকৃতি নীতিমালা থাকলেও সেভাবে বাস্তবায়ন হয় না। ফেডারেশনের জবাবদিহিতা নিশ্চয়তার আগে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের স্বকীয়তা অর্জনে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে?
ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী: পলিসি লেভেলের বিষয়গুলো আরো সুদৃঢ় করা প্রয়োজন। আমি ক্রীড়াঙ্গনে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে চাই। এজন্য অবশ্যই নীতিমালা, আইনগুলো ঐ রকমই হতে হবে। এই বিষয়গুলো সামনে পর্যালোচনা করব এবং প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করব।
ক্রীড়াঙ্গনে নারী নিপীড়নের অভিযোগ উঠে প্রায়ই। সাম্প্রতিক সময়ে এটা অনেক বড় আকারে উঠেছে। আপনার সময়ে নারী ক্রীড়াবিদদের সুরক্ষায় কী করবেন?
ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী: বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে নারীদের অবদান অনেক। নারীদের প্রকৃত সম্মান ও মর্যাদা নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব। সকল ক্রীড়াবিদের সমান সম্মান নিশ্চিত করতে হবে। অবশ্যই ক্রীড়াঙ্গন নারীবান্ধব থাকবে।
ফুটবল, ক্রিকেট বাদে সকল ফেডারেশনে অ্যাডহক কমিটি। অনেক কমিটি নিয়ে বিতর্ক ও সমালোচনা রয়েছে। সার্চ কমিটি অ্যাডহক কমিটি গঠনে সুপারিশ করেছে। সেই সার্চ কমিটির কর্মকর্তারা আবার বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের কমিটিতে রয়েছেন। সামগ্রিকভাবে কমিটিগুলোকে কীভাবে দেখছেন?
ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী: মাত্র দায়িত্ব নিয়ে কাজ শুরু করেছি। ফেডারেশনগুলোর কর্মকাণ্ড আমরা পর্যালোচনা করব। এরপর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে। আমরা গণতান্ত্রিক নির্বাচন ব্যবস্থায় বিশ্বাসী। তৃণমূল থেকে নির্বাচন শুরু হয়ে ফেডারেশনেও হবে। সরকারের মেয়াদ পাঁচ বছর। আগামী পাঁচ বছর পর দায়িত্ব শেষে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনকে কোথায় রেখে যেতে চান?
ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী: অবশ্যই ক্রীড়াঙ্গনকে একটি সুন্দর ও শক্ত অবস্থানে রেখে যেতে চাই। তবে এখনই সুনির্দিষ্ট করে কিছু বলতে চাই না। মাত্র দুই দিন হলো দায়িত্ব নিয়েছি। প্রথম দিন থেকেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছি। আমাদের সরকারের ১৮০ দিনের একটি কর্মসূচি রয়েছে। ধাপে ধাপে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে এগোতে চাই।
কিউএনবি/আয়শা/১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬,/রাত ৯:৩৩