ডেস্ক নিউজ : সরকার অবৈধ শাসন কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে রাষ্ট্রের সকল প্রতিষ্ঠানকে নগ্নভাবে দলীয়করণ করে চলেছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আজ বুধবার গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ মন্তব্য করেন। মির্জা ফখরুল বলেন, রাষ্ট্রের সকল প্রতিষ্ঠানকে ভিন্নমত দমন করার কাজে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে সরকার। গুম, খুন, ক্রসফায়ারের নামে হত্যা, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গুলোকে ব্যবহারের মাধ্যমে রাষ্ট্রকে জনগণের বিরুদ্ধে দাঁড় করানো হয়েছে।
ফলশ্রুতিতে লজ্জা জনকভাবে আমাদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে এবং তার কর্মকর্তাদের মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় পড়তে হয়েছে যা জাতির জন্য কলংকজনক। তিনি অভিযোগ করে বলেন, সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস আলী, ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের কমিশনার চৌধুরী আলমসহ প্রায় ৬০০ জন রাজনৈতিক নেতাকর্মী গুম হয়েছে। সহস্রাধিক নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয়েছে। ২৫ লাখ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে।
ফখরুল বলেন, দেশ আজ এক ভয়ানক অবস্থার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। জনগণের ভোটবিহীন এই সরকার, জনগণ ও তার প্রতিনিধিত্বকারী বিরোধী রাজনৈতিক দলের অধিকার এবং মতামতকে প্রথম থেকেই নাকচ করতে চেয়েছে। সে কারণেই তারা জনআস্থা অর্জনকারী তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে বাতিল করেছে এবং বিচারবিভাগের উপরে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। এভাবেই তারা পদ্ধতিগতভাবে বাংলাদেশের আইন বিভাগ, বিচার বিভাগ এবং নির্বাহী বিভাগকে ধ্বংসের শেষপ্রান্তে এনে দাঁড় করিয়েছে। রাষ্ট্র চতুর্থ স্তম্ভ গণমাধ্যমের গলা টিপে ধরেছে ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট জারি করে।
তিনি আরো বলেন, এক যুগ ধরে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমান ফ্যাসিস্ট ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক গোষ্ঠী দেশের সকল সাংবিধানিক ও বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান সমুহকে যেভাবে ধবংস করে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশকে প্রায় একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রের পর্যায়ে এনে দাঁড় করিয়েছে। তা জনগণ বরদাস্ত করবে না। অনুষ্ঠানে বক্তব্য প্রদানকালে প্রসঙ্গক্রমে মার্কিন কংগ্রেসম্যান বাংলাদেশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক সাম্প্রতিক নিষেধাজ্ঞার প্রসঙ্গটি সম্পর্কেও কথা বলেন। তিনি বাংলাদেশের এলিট ফোর্স হিসেবে প্রতিষ্ঠিত র্যাব সদস্যদের বিরুদ্ধে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রসঙ্গও উত্থাপন করেন।
বিএনপির এই নেতা বলেন, আমাদের অত্যন্ত ঘনিষ্ট প্রভাবশালী বন্ধুরাষ্ট্রের বিদেশ বিষয়ক সংসদীয় কমিটির প্রধানের বক্তব্যকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে দেশি ও বিদেশি গণমাধ্যমে ধুম্রজাল সৃষ্টি করে শুধু সচেতন মানুষদের সাথেই প্রতারণা করেনি। ওয়াশিংটন দূতাবাস বাংলাদেশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে চরমভাবে হেয়প্রতিপন্ন করেছে। কারণ, কংগ্রেসম্যান মিকস নিজেই গত ৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ দূতাবাসের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিকে নাকচ করে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম তার নিজস্ব ওয়েবসাইট এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটির ওয়েবসাইটে তার বক্তব্য তুলে ধরেছেন।
মার্কিন হাউজ অব ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটির ওয়েব সাইটে প্রকাশিত বিবৃতিতে সুস্পষ্টভাবে র্যাবের বর্তমান ও সাবেক কয়কজন কর্মকর্তাদের ওপর দেওয়া নিষেধাজ্ঞায় দৃঢ় সমর্থন দিয়ে তিনি বলেন, মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য বাইডেন প্রশাসনের সিদ্ধান্তকে আমি দৃঢ়ভাবে সমর্থন করি। বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক দৃঢ় করা আমি সবসময় সমর্থন করব। আগামী নির্বাচন অবাধ ও তার সুষ্ঠতা নিশ্চিতকরণসহ বাংলাদেশের মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সাহায্য করার জন্য কাজ করব।
তিনি বলেন, বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে অনুষ্ঠিত একটি বেসরকারি সংবাদ সম্মেলনের সূত্র ধরে সেখানে অবস্থিত দূতাবাসের পক্ষ থেকে একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছিল। যেখানে সুস্পষ্টভাবে আওয়ামী লীগের একজন সক্রিয় কর্মীর বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। যা বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। যা দূতাবাসকে রাষ্ট্রের বদলে আওয়ামী লীগের প্রচার প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার প্রমাণ। আমরা লক্ষ্য করেছি, বিদেশে বসবাসরত বাংলাদেশি একাডেমিশিয়ান, সাংবাদিক এবং মানবাধিকারকর্মীরা যখন দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি, গণতান্ত্রিক পরিস্থিতি, নির্বাচনের অনিয়ম, জনগণের ভোটাধিকার, ইত্যাদি সামগ্রিক এই হতাশাজনক পরিস্থিতি জনগণের সামনে তুলে ধরে তখনই সরকার রাষ্ট্রীয় বাহিনির শক্তিকে ব্যবহার করে।
তিনি আরো বলেন, সাম্প্রতিক ওয়াশিংটন, নিউইয়র্ক, ব্রাসেলসসহ দূতাবাসের দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাদের কর্মকাণ্ড আবারও তা প্রমাণিত হলো। দেশের বরেণ্য বীর মুক্তিযোদ্ধা বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও অবিভক্ত ঢাকার সর্বশেষ মেয়র প্রয়াত সাদেক হোসেন খোকার লাশকেও তারা চরমভাবে অপমান করেছিল। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যসহ বাংলাদেশি অধ্যুষিত বিভিন্ন শহরের কর্মকর্তাগণ সরকারি দলের অনুষ্ঠান সমূহে নিয়মিত উপস্থিত থেকে দলীয় কর্মীর মতো আচরণ করেন। যা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মর্যাদাকেই ধূলিসাৎ করেছে। পেশাদারী কর্মকর্তা-কর্মচারীগণ ক্ষুদ্ধ হলেও মৌন থাকতে বাধ্য হচ্ছেন।
তিনি এ সময় বলেন, বিএনপি সুস্পষ্টভাবে বলতে চায় এখনো সময় আছে। এই অপতৎপরতা বন্ধ করে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার গঠন করার ব্যবস্থা নিন। সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অবাধ ভোটাধিকার নিশ্চিত করার কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করুন। নিশিরাতের ভোট নয়, জনগণের নির্বিঘ্ন ভোট প্রদানের জন্য জন্য সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের মধ্য দিয়ে প্রকৃত অর্থে জনগণের সরকার গঠন করার মৌলিক শর্ত পূরণ করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
কিউএনবি/আয়শা/৯ই ফেব্রুয়ারি, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ/বিকাল ৫:৩৫