ডেস্ক নিউজ : পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে কয়েক দিন ধরে উত্তাল গাজীপুরের শিল্পাঞ্চল। শ্রমিকদের বিক্ষোভ, মহাসড়ক অবরোধ, যানবাহন ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটছে প্রতিদিনই।
শুধু ছবি বা ভিডিও ধারণের কারণে কেন এমন হামলা? সহিংসতার দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি হলেই কেন কেড়ে নেওয়া হচ্ছে মোবাইল, ভেঙে ফেলা হচ্ছে ক্যামেরা? কারা চায় না এসব ঘটনার প্রকৃত চিত্র প্রকাশ হোক? এসব প্রশ্ন এখন গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে কর্মরত সাংবাদিক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে।
স্থানীয় সাংবাদিকদের অভিযোগ, শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির দাবিতে চলমান আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে একটি পক্ষ ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনা ঘটাচ্ছে। এসব কর্মকাণ্ডের ছবি বা ভিডিও ধারণ করা হলে জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় প্রকাশের আশঙ্কায় সাংবাদিক ও সাধারণ মানুষের ওপর হামলা চালানো হচ্ছে। ফলে আন্দোলনের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরার পাশাপাশি সহিংসতার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করার কাজও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
হামলার শিকার সাংবাদিকদের মধ্যে রয়েছেন সময় টিভির গাজীপুর প্রতিনিধি ও তার ক্যামেরাপারসন, এখন টিভির প্রতিনিধি, কালের কণ্ঠের কালিয়াকৈর প্রতিনিধি, দীপ্ত টিভির গাজীপুর প্রতিনিধি, দৈনিক দেশ রূপান্তর ও এশিয়া পোস্টের গাজীপুর প্রতিনিধি এবং এসএ টিভির ক্যামেরাপারসন। এ ছাড়া বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলনের ছবি তুলতে গিয়ে সাধারণ মানুষের মোবাইল কেড়ে নেওয়া, ভাঙচুর ও মারধরের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
মঙ্গলবার গাজীপুর মহানগরীর নাওজোর এলাকায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে পুরোনো কাগজপত্রে আগুন ধরিয়ে দেয় আন্দোলনকারীদের একটি অংশের কয়েকজন যুবক। এ সময় তাদের চিৎকার করে বলতে শোনা যায়, কেউ যেন ছবি না তোলেন।
ঘটনাস্থলে সাংবাদিকরা উপস্থিত থাকলেও ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ছবি ধারণ করতে পারেননি। কয়েকজন সাধারণ মানুষ মোবাইল ছবি তোলার চেষ্টা করলে তাদের বাধা দেওয়া হয়। কারও কাছ থেকে ফোন কেড়ে নেওয়া হয়, আবার কারও মোবাইল ভেঙে ফেলা হয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
স্থানীয় সাংবাদিকদের ভাষ্য, শুধু নাওজোর নয়, শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় একই ধরনের ঘটনা ঘটছে। কোথাও অগ্নিসংযোগের দৃশ্য ধারণ করতে গেলে, কোথাও যানবাহন ভাঙচুরের ছবি তুলতে গেলেই বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে সংবাদকর্মীদের। অনেক ক্ষেত্রে হামলার শিকার হওয়ার আশঙ্কায় সাংবাদিকরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকেও ছবি বা ভিডিও ধারণ করতে পারছেন না। এতে সহিংসতার প্রকৃত চিত্র ও ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় সামনে আনা কঠিন হয়ে পড়েছে।
সাংবাদিকদের পাশাপাশি ছবি ধারণ করতে গিয়ে সাধারণ মানুষের ওপর হামলার ভয়াবহ দৃষ্টান্ত পাওয়া গেছে সোমবার গাজীপুর মহানগরীর বাংলাবাজার এলাকায়। সেখানে শ্রমিক আন্দোলনের দৃশ্য নিজের মোবাইলে ধারণ করতে গিয়ে হামলার শিকার হন তৌফিক হোসেন নামে এক পোশাক শ্রমিক। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে ঢাকার একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন মঙ্গলবার সকালে তার মৃত্যু হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার সময় তৌফিক শ্রমিকদের বিক্ষোভের দৃশ্য মোবাইলে ধারণ করছিলেন। এ সময় কয়েকজন পোশাক শ্রমিক তাকে মারধর করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে তিনি গুরুতর আহত হন। পরে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন তার মৃত্যু হয়। তবে কী কারণে তার ওপর হামলা চালানো হয়েছিল এবং হামলায় কারা জড়িত, তা তদন্ত করে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
ছবি ধারণ করতে গিয়ে একজন শ্রমিকের প্রাণহানির ঘটনা চলমান আন্দোলনে সাংবাদিক ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার বিষয়টিকে আরও গুরুতর করে তুলেছে। এ বিষয়ে বাসন থানার ওসি মো. হারুন অর রশিদ জানান, ছবি তুলতে গিয়ে সাংবাদিকরা হামলার শিকার হয়েছেন বলে তারা জানতে পেরেছেন। সাধারণ মানুষ হামলা ও সহিংসতার ছবি ধারণ করতে গেলে তাদের ওপরও হামলা, মোবাইল ফোন ভাঙচুর ও ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে বলে তথ্য পেয়েছেন। তবে এসব ঘটনায় এখন পর্যন্ত থানায় লিখিত কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি।
কোনাবাড়ী থানার ওসি ইফতেখার হোসেন যুগান্তরকে বলেন, আন্দোলনের ছবি ও ভিডিও ধারণ করতে গিয়ে বারবার হামলার শিকার হচ্ছেন সাংবাদিকরা। অনেক ক্ষেত্রে ছবি বা ভিডিও ধারণের চেষ্টা করলেই তাদের ক্যামেরা ভাঙচুর করা হচ্ছে। এতে ঘটনাস্থলে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আন্দোলনকারীদের হামলায় একাধিক সাংবাদিক আহত হওয়ার পাশাপাশি তাদের ক্যামেরা ও অন্যান্য সরঞ্জামের ক্ষতি হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ছবি তুললে হামলাকারীদের পরিচয় প্রকাশ পেয়ে যেতে পারে-এমন আশঙ্কা থেকেই হয়তো এ ধরনের ঘটনা ঘটানো হচ্ছে। কোনাবাড়ী থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক বাবুল হোসেন যুগান্তরকে বলেন, পোশাক শ্রমিকরা মাসিক ন্যূনতম ৩০ হাজার টাকা মজুরির দাবিতে কয়েক দিন ধরে আন্দোলন করছেন। এ আন্দোলনের খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকরা বারবার হামলার শিকার হচ্ছেন, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ কিংবা বিশৃঙ্খলার ছবি ও ভিডিও ধারণ করতে গেলেই তাদের বাধা দেওয়া হচ্ছে। এমনকি বিএনপির নেতাকর্মীদের ওপরও হামলার অভিযোগ রয়েছে। তিনি আরও বলেন, সাংবাদিকরা পেশাগত দায়িত্ব পালন করছেন। আন্দোলনের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে তাদের বাধা দেওয়া বা হামলা করা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
কিউএনবি/আয়শা/০৪ নভেম্বর ২০২৬,/রাত ৮:২১