শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ১১:২৪ পূর্বাহ্ন

ইরানের নিখুঁত হামলায় ভীষণ চাপে যুক্তরাষ্ট্র: রয়টার্স

Reporter Name
  • Update Time : শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬
  • ১৯ Time View

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : উপসাগরীয় অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ও অর্থনৈতিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে একের পর এক নিখুঁত হামলা চালিয়েছে ইরান ও তাদের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো। 

এসব হামলায় তেল রফতানি, গ্যাস উৎপাদন, বিমানবন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও পানিশোধন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে আঞ্চলিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কৌশলও জটিল হয়ে পড়েছে।

ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা রয়টার্সের এক অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরুর পর থেকে উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্তত সাতটি দেশে ৮৪টি অবকাঠামোগত স্থাপনায় কমপক্ষে ১৩৫টি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরাক, কাতার, কুয়েত, ওমান ও বাহরাইন এসব হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে।

রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, হামলাগুলোর অনেকগুলোই ছিল নির্দিষ্ট যন্ত্রপাতি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লক্ষ্য করে চালানো। এতে কিছু ক্ষেত্রে পুরো স্থাপনার কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়, আর কোথাও দীর্ঘমেয়াদি মেরামতের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

তেল ও গ্যাস স্থাপনায় বড় ক্ষতি
ইরানের হামলার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরা বন্দর। হরমুজ প্রণালির বাইরে অবস্থিত এই বন্দরটি ইরানের অবরোধ এড়িয়ে তেল রফতানির গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বন্দরটিতে অন্তত ১৯ বার হামলা হয়েছে বলে রয়টার্সের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

হামলায় তেল স্থানান্তরের গুরুত্বপূর্ণ পাইপলাইন ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মে মাসের একটি ড্রোন হামলার পর পরিশোধিত জ্বালানি রফতানি প্রায় এক মাস বন্ধ ছিল। পরে কার্যক্রম পুনরুদ্ধার হলেও বারবার হামলায় বন্দরটির কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে।

কাতারের রাস লাফান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) স্থাপনাতেও হামলা চালানো হয়। এতে গ্যাস তরল করার কাজে ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ শীতলীকরণ সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

কাতারএনার্জির প্রধান সাদ আল-কাবির মতে, ক্ষতিগ্রস্ত সরঞ্জাম পুরোপুরি মেরামত করতে তিন থেকে পাঁচ বছর লাগতে পারে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, এসব হামলায় বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ এলএনজি সরবরাহ হুমকির মুখে পড়ে।

সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনেও হামলা হয়েছে। হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে লোহিত সাগর দিয়ে তেল রফতানির এই বিকল্প পথে সেপ্টেম্বরের এক হামলার পর অপরিশোধিত তেল পরিবহন বন্ধ হয়ে যায়। এতে বৈশ্বিক তেল সরবরাহের প্রায় ৪ শতাংশ ঝুঁকিতে পড়ে।

বিমানবন্দর, ডেটা সেন্টার ও বিদ্যুৎকেন্দ্রও লক্ষ্যবস্তু
হামলা শুধু জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বাহরাইন, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের বিমানবন্দরেও আঘাত হেনেছে ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র। কুয়েতের বিমানবন্দরে আটবার হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনে অ্যামাজনের ডেটা সেন্টারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাহরাইনের একটি স্থাপনায় হামলার ছয় মাস পরও সেবা পুরোপুরি চালু করা যায়নি বলে রয়টার্স জানিয়েছে।

আবুধাবির এমিরেটস গ্লোবাল অ্যালুমিনিয়ামের আল তাওয়েলা কারখানায় হামলায় ১ হাজার ২৬২টি অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদন সেলের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। আগস্টের শেষ নাগাদ সেগুলোর মাত্র এক-চতুর্থাংশ চালু করা সম্ভব হয়েছিল। স্বাভাবিক উৎপাদনে ফিরতে ২০২৭ সাল পর্যন্ত সময় লাগতে পারে বলে কোম্পানিটি জানিয়েছে।

কুয়েতের বিদ্যুৎ ও পানিশোধন স্থাপনাগুলোও হামলার শিকার হয়েছে। মরুভূমিপ্রধান দেশটি পানীয় জলের প্রায় ৯০ শতাংশের জন্য সমুদ্রের পানি লবণমুক্ত করার স্থাপনাগুলোর ওপর নির্ভরশীল। রয়টার্সের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মার্চ থেকে জুলাইয়ের মধ্যে দেশটির আটটি যৌথ বিদ্যুৎ ও পানিশোধন স্থাপনার অন্তত চারটিতে হামলা হয়েছে।

সৌদি আরবের তেল উৎপাদনে ধাক্কা
সৌদি আরবের নয়টি বৃহত্তম শোধনাগারের পাঁচটি এবং তিনটি বড় তেল প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র ইরান-সংশ্লিষ্ট হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে রয়টার্সের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। যুদ্ধের প্রথম ছয় মাসের বেশির ভাগ সময় দেশটির দৈনিক তেল উৎপাদন ৭০ লাখ ব্যারেলের নিচে ছিল। যুদ্ধের আগে উৎপাদন ছিল দৈনিক এক কোটির বেশি ব্যারেল।

এতে বর্তমান দরে সৌদি আরবের ৫০ বিলিয়ন ডলারের বেশি রাজস্ব হারানোর হিসাব দিয়েছে রয়টার্স। দেশটির জাজান শোধনাগারেও জুলাইয়ের শেষ থেকে সেপ্টেম্বরের শুরু পর্যন্ত অন্তত চারবার হামলা হয়। হামলার পর শোধনাগারটির উৎপাদন শূন্যে নেমে আসে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইরানের নিখুঁত লক্ষ্যভেদ নিয়ে উদ্বেগ
রয়টার্স ৩৬ জনের সাক্ষাৎকার, স্যাটেলাইট চিত্র, ভিডিও এবং সরকারি বিবৃতি বিশ্লেষণ করে অনুসন্ধানটি তৈরি করেছে। ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলোর শিল্পবিশেষজ্ঞ ও সাবেক মার্কিন কর্মকর্তাদের মধ্যে ১৪ জনের মূল্যায়ন ছিল, গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতির ব্যাপক ক্ষতি কেবল আকাশ থেকে ধ্বংসাবশেষ পড়ে হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম।

তবে উপসাগরীয় দেশগুলোর সরকার অনেক ঘটনায় দাবি করেছে, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ভূপাতিত ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ থেকে ক্ষতি হয়েছে। কয়েকটি দেশে হামলার পরের ছবি বা ভিডিও প্রকাশের ওপরও বিধিনিষেধ রয়েছে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান সংবেদনশীল স্থাপনার নকশা ও গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতির অবস্থান সম্পর্কে তথ্য পেয়েছিল বলে কয়েকজন কর্মকর্তা ধারণা করছেন। রাশিয়া ও চীনের কাছ থেকে গোয়েন্দা তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনার কথাও মার্কিন কর্মকর্তারা উল্লেখ করেছেন; তবে এ বিষয়ে নিশ্চিত প্রমাণ প্রকাশ করা হয়নি।

এই ধারাবাহিক হামলা হরমুজ প্রণালিতে ইরানের অবরোধের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে। ফলে সামরিক শক্তিতে পিছিয়ে থেকেও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে ইরান কীভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও তার আঞ্চলিক মিত্রদের ওপর অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করছে, তা নতুন করে সামনে এসেছে। সূত্র: রয়টার্স

কিউএনবি/অনিমা/১৬ অক্টোবর ২০২৬,/সকাল ৮:২৭

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

October 2026
M T W T F S S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
27282930  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit