আন্তর্জাতিক ডেস্ক : মাত্র ১৫ বছর বয়সে বন্ধুদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ত্বকের রং গাঢ় করতে সানবেড ব্যবহার শুরু করেছিলেন যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টারের চেলসি ট্যানটাম। এক দশক ধরে নিয়মিত সানবেড ব্যবহারের পর ২৮ বছর বয়সে তার শরীরে ধরা পড়ে ত্বকের মারাত্মক ক্যান্সার মেলানোমা। শেষ পর্যন্ত মাত্র ৩০ বছর বয়সে প্রাণ হারান তিনি। মৃত্যুর আগের বছরগুলোতে নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে অন্যদের সতর্ক করার পাশাপাশি সানবেড ব্যবহারে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের দাবিতে প্রচার চালান চেলসি।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর মারা যান চেলসি। তার ক্যান্সার মেরুদণ্ড, পাঁজর, শ্রোণিচক্র, ফুসফুস ও যকৃতে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩০তম জন্মদিনের কয়েক সপ্তাহ আগে তিনি জানতে পারেন, ক্যান্সার পৌঁছে গেছে মস্তিষ্কেও। রোগের কারণে একপর্যায়ে তাকে হুইলচেয়ারেও চলাফেরা করতে হয়েছে।
চেলসির মৃত্যুর পর তার পরিবার ও বন্ধুদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তারা জানিয়েছেন, নিজের কঠিন অসুস্থতার মধ্যেও অন্যদের সচেতন করতে নিরলস চেষ্টা চালিয়ে গেছেন তিনি।
১৫ বছর বয়সেই সানবেড ব্যবহার শুরু
চেলসি জানিয়েছিলেন, মাত্র ১৫ বছর বয়সে তিনি সানবেড ব্যবহার শুরু করেন। তখন বন্ধুদের মধ্যে কার ত্বকের রং সবচেয়ে গাঢ় হবে, তা নিয়ে একধরনের প্রতিযোগিতা চলত। সেই প্রতিযোগিতায় অংশ নিতেন তিনিও।
চেলসির দাবি, বয়স ১৮ বছরের কম হওয়া সত্ত্বেও ট্যানিং সেলুনে সানবেড ব্যবহারের সময় কখনও তাকে পরিচয়পত্র দেখাতে বলা হয়নি। অর্থাৎ, অপ্রাপ্তবয়স্কদের সানবেড ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও সহজেই তিনি এসব সেলুনে প্রবেশ করতে পেরেছিলেন।
এরপর প্রায় এক দশক ধরে নিয়মিত সানবেড ব্যবহার করেন চেলসি। পরে তার শরীরে ধরা পড়ে মেলানোমা নামে ত্বকের গুরুতর ক্যান্সার।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রাথমিকভাবে তার শরীরে মেলানোমার তৃতীয় পর্যায়ের ৩সি স্তরের ক্যান্সার শনাক্ত হয়েছিল। তবে তত দিনে রোগটি শরীরের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়েছিল। মেরুদণ্ড, পাঁজর, শ্রোণিচক্র, উরুর হাড়, ফুসফুস, যকৃৎ, প্লীহা ও স্তনেও ক্যান্সারের বিস্তার ঘটে।
৩০তম জন্মদিনের কিছুদিন আগে মস্তিষ্কে ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়ার খবর পান তিনি। তখন তার রোগের অবস্থাকে চতুর্থ পর্যায়ের ৪ডি হিসেবে বর্ণনা করা হয়।
অসুস্থতার মধ্যেও সচেতনতা তৈরির লড়াই
নিজের পরিণতির মধ্য দিয়ে অন্য তরুণীরা যেন একই বিপদের মুখে না পড়েন, সেই লক্ষ্যেই সানবেড ব্যবহারে কঠোর নিয়ন্ত্রণের দাবিতে সোচ্চার হন চেলসি।
বিশেষ করে ১৮ বছরের কম বয়সীদের সানবেড ব্যবহার ঠেকাতে ট্যানিং সেলুনগুলোতে বাধ্যতামূলক পরিচয়পত্র যাচাইয়ের দাবি জানান তিনি। নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে অতিবেগুনি রশ্মির (ইউভি) সংস্পর্শে আসার সম্ভাব্য প্রাণঘাতী পরিণতি সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করার চেষ্টা করেন।
এছাড়া মেলানোমা ফোকাস নামের একটি দাতব্য সংস্থার জন্য ৪ হাজার পাউন্ডেরও বেশি অর্থ সংগ্রহ করেন চেলসি। রোগটিতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সহায়তা এবং এ বিষয়ে সচেতনতা ও প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ জোরদারে কাজ করে সংস্থাটি।
নিজে ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করলেও অন্যদের পাশে দাঁড়ানোর এই প্রচেষ্টার জন্য মৃত্যুর পর চেলসির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন তার স্বজন ও বন্ধুরা।
পরিবারের সদস্য লি ক্রেভেন বলেন, “একেবারে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তুমি লড়াই চালিয়ে গেছো। এত কিছুর মধ্য দিয়েও নিজের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এই রোগ সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করেছো। তোমার প্রতি অনেক ভালোবাসা, চেলসি।”
ঘনিষ্ঠ বন্ধু ক্লেয়ার লুইস চেলসিকে ‘শক্তিশালী, সুন্দর, হাসিখুশি, দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এবং সম্পূর্ণ অনন্য’ বলে বর্ণনা করেন।
তিনি বলেন, চেলসিকে এমন সব পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে দেখেছেন, যা কোনও মানুষেরই সহ্য করার কথা নয়। তারপরও নিজের জন্য লড়াই করার পাশাপাশি অন্যদের শিক্ষা দেওয়া, সহায়তা করা ও সচেতন করার শক্তি খুঁজে পেয়েছিলেন তিনি।
ক্লেয়ার আরও বলেন, “তুমি যে মর্যাদা, সৌন্দর্য ও শক্তি নিয়ে সবকিছু সামলেছ, তা অন্য কারও পক্ষে সম্ভব হতো কি না, জানি না। তোমার বন্ধুত্ব আমার জন্য ছিল এক অমূল্য উপহার। একসঙ্গে কাটানো প্রতিটি অভিযান, প্রতিটি কথোপকথন, প্রতিটি হাসি এবং প্রতিটি মুহূর্ত ছিল অসাধারণ।”
চেলসির সঙ্গে পরিচিত হওয়া, তাকে ভালোবাসা এবং জীবনের কিছুটা পথ একসঙ্গে চলতে পারার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে ক্লেয়ার বলেন, “৩০ বছর তোমার জন্য একেবারেই যথেষ্ট ছিল না, চেলসি।”
আগামী ২৩ অক্টোবর অ্যাশটনের অ্যালবিয়ন চার্চে চেলসির শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এরপর ডাকিনফিল্ড শ্মশানে তার মরদেহের শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হবে।
সানবেড ব্যবহারে কঠোর নিয়মের পরিকল্পনা যুক্তরাজ্যের
চেলসির মৃত্যুর ঘটনা এমন সময়ে সামনে এল, যখন ইংল্যান্ডে সানবেড ব্যবহারের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করার উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার।
গত মে মাসে যুক্তরাজ্য সরকার ট্যানিং সেলুনগুলোতে বাধ্যতামূলক পরিচয়পত্র যাচাই এবং সানবেড ব্যবহারের ওপর আরও কঠোর তদারকির পরিকল্পনা ঘোষণা করে। ১৮ বছরের কম বয়সীদের সানবেড ব্যবহারে আগে থেকেই নিষেধাজ্ঞা থাকলেও শিশুরা কীভাবে এসব সুবিধা পাচ্ছে, তা নিয়ে উদ্বেগের পর এ উদ্যোগ নেওয়া হয়।
প্রস্তাবগুলো নিয়ে সরকারের পরামর্শ গ্রহণের প্রক্রিয়া আগস্টে শেষ হয়। সেপ্টেম্বরে মন্ত্রীরা প্রাপ্ত মতামতগুলো পর্যালোচনা করছিলেন। নতুন নিয়ম ২০২৭ সালেই কার্যকর হতে পারে।
সানবেডে মেলানোমার ঝুঁকি বাড়ে
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন, সানবেড থেকে নির্গত অতিবেগুনি রশ্মি ত্বকের ক্ষতি করতে পারে এবং ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, যারা কখনও সানবেড ব্যবহার করেননি, তাদের তুলনায় ২০ বছর বয়সের আগে সানবেড ব্যবহারকারীদের মেলানোমায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ৪৭ শতাংশ বেশি।
স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রচারকেরা তরুণদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছেন, কেবল ত্বকের রং গাঢ় করার আকাঙ্ক্ষায় যেন তারা নিজেদের জীবনকে ঝুঁকির মুখে না ফেলেন। চেলসি ট্যানটামের নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে অন্যদের সতর্ক করার প্রচেষ্টা এ বার্তাকে আরও জরুরি করে তুলেছে।
সানবেড আসলে কী?
সানবেড হলো এমন একটি বিশেষ যন্ত্র, যার সাহায্যে অতিবেগুনি রশ্মি ব্যবহার করে ত্বকের রং কৃত্রিমভাবে গাঢ় বা বাদামি করা হয়। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ট্যানিং।
সানবেড কীভাবে কাজ করে?
অতিবেগুনি রশ্মি: সানবেডে বিশেষ ধরনের ইউভি বাতি থাকে, যা ত্বকে অতিবেগুনি রশ্মি ছড়ায়।
ত্বকের রং গাঢ় করা: এই রশ্মির প্রভাবে ত্বকে মেলানিন নামের রঞ্জক পদার্থের উৎপাদন বা কার্যকলাপ বাড়ে। ফলে ত্বকের রং গাঢ় দেখায়।
সৌন্দর্যচর্চায় ব্যবহার: অনেকে ত্বকে বাদামি আভা আনার জন্য ট্যানিং সেলুনে গিয়ে সানবেড ব্যবহার করেন।
সানবেড কেন বিপজ্জনক?
সানবেডের অতিবেগুনি রশ্মি ত্বকের কোষের ডিএনএ ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এর ফলে-
– মেলানোমাসহ বিভিন্ন ধরনের ত্বকের ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ে।
– ত্বক দ্রুত বুড়িয়ে যেতে পারে, বলিরেখা ও কালচে দাগ দেখা দিতে পারে।
– চোখের ক্ষতি হতে পারে, বিশেষ করে যথাযথ সুরক্ষা ছাড়া ব্যবহার করলে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সানবেডকে ক্যান্সার সৃষ্টিকারী হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে। অল্প বয়সে এটি ব্যবহার শুরু করলে ঝুঁকি আরও উদ্বেগজনক হতে পারে।
সহজ কথায়, সানবেড হলো কৃত্রিমভাবে রোদ পোহানোর একটি যন্ত্র, যা ত্বকের রং গাঢ় করে। কিন্তু রং গাঢ় করার এই প্রক্রিয়ায় ত্বকের ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই শুধু সৌন্দর্যের জন্য সানবেড ব্যবহার করা নিরাপদ নয়। সূত্র: ডেইলি মেইল
কিউএনবি/অনিমা/১৬ অক্টোবর ২০২৬,/সকাল ৭:৫০