বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৪৮ অপরাহ্ন
শিরোনাম
১৮ অক্টোবর পর্যন্ত রিয়াদগামী সব ফ্লাইট স্থগিত নামাজ পড়ে ফেরা হলো না চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র মেহরাজের নোয়াখালীতে চার হাজার ইয়াবাসহ রোহিঙ্গা যুবক গ্রেপ্তার এডওয়ার্ড ফিটনেস ক্লাব পাবনার ১৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরুর ঘোষণা দিলো বাংলাদেশ সরকার শরীয়তপুরে নার্সদের অপচেষ্টায় মাতৃগর্ভে নাবজাতকের মৃত্যু নওগাঁর নিয়ামতপুর ঘুঘুডাঙ্গা তালতলী বণিক সমিতির পক্ষ থেকে সাংসদ মোস্তাফিজুরকে সংবর্ধনা  খাগড়াছড়িতে দুর্গাপূজা উপলক্ষে  ৬৮ পূজামণ্ডপে অনুদানের চেক বিতরণ। চৌগাছায় বিএনপির সম্মেলন ও মানব বন্ধন সারডিলার নিয়োগে ২০ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগ ভিত্তিহীন নোয়াখালীতে অসহায় নারীদের স্বাবলম্বী করতে সেলাই মেশিন বিতরণ

হাদিসে বর্ণিত বিভ্রান্ত গোষ্ঠী খারেজি কারা

Reporter Name
  • Update Time : বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬
  • ১৯ Time View

ডেস্ক নিউজ : ‘আল্লাহ ছাড়া কারও বিধান নেই।’ কথাটি কুরআনেরই। কিন্তু ১৪০০ বছর আগে এই সত্য বাক্যকেই অস্ত্র বানিয়ে একদল মানুষ মুসলমানের রক্তপাতের বৈধতা খুঁজেছিল।

ইসলামের ইতিহাসে তারাই খারেজি, যাদের সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) আগেই সতর্ক করে গিয়েছিলেন। আজও চরমপন্থী সংগঠনগুলোর প্রসঙ্গে এই নাম বারবার ফিরে আসে। তাই তাদের প্রকৃত পরিচয় জানা জরুরি, আর জরুরি এই নামের অপব্যবহার ঠেকানোও।

সিফফিন থেকে নাহরাওয়ান: জন্মের ইতিহাস

খারেজিদের উত্থান ৩৭ হিজরিতে (৬৫৭ খ্রিষ্টাব্দ) সিফফিনের যুদ্ধের পর। খলিফা আলী (রা.) ও সিরিয়ার গভর্নর মুআবিয়ার (রা.) মধ্যে যুদ্ধ থামাতে সালিশ মেনে নেওয়া হলে আলী (রা.)-এর বাহিনীর একটি অংশ ক্ষুব্ধ হয়ে বেরিয়ে যায়।

তাদের যুক্তি ছিল, বিরোধ মীমাংসায় মানুষকে বিচারক মানা আল্লাহর বিধানের পরিপন্থী। এই বেরিয়ে যাওয়া থেকেই তাদের নাম হয় ‘খারেজি’, অর্থাৎ যারা বেরিয়ে গেছে। তারা প্রথমে কুফার কাছে হারুরায় জড়ো হয়, তাই তাদের ‘হারুরিয়্যা’ নামেও ডাকা হয়।

আলী (রা.) তাদের স্লোগান শুনে বলেছিলেন, কথাটি সত্য, কিন্তু এর উদ্দেশ্য বাতিল। অর্থাৎ কুরআনের বাক্য ঠিক, কিন্তু তা দিয়ে তারা যে সিদ্ধান্তে পৌঁছাচ্ছে, তা ভুল।

আলী (রা.) প্রথমেই তলোয়ার ধরেননি। বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি ইবনে আব্বাসকে (রা.) তাদের কাছে পাঠান। ইবনে আব্বাস (রা.) যুক্তি ও কুরআনের আলোকে তাদের সঙ্গে বিতর্ক করলে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ফিরে আসে বলে বর্ণিত আছে। যারা থেকে গেল, তারা নিরীহ মুসলমানদের হত্যা করতে শুরু করে।

এমনকি সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে খাব্বাবকে (রা.) হত্যা করে এবং তাঁর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীর পেট চিরে ফেলে বলে ইতিহাসগ্রন্থে এসেছে। ৩৮ হিজরিতে নাহরাওয়ানের যুদ্ধে তারা পরাজিত হয়। কিন্তু প্রতিশোধের আগুন নেভেনি।

৪০ হিজরির রমজানে তাদেরই একজন আবদুর রহমান ইবনে মুলজিম কুফার মসজিদে ফজরের নামাজে আলীকে (রা.) বিষাক্ত তলোয়ারে আঘাত করেন, যাতে তিনি শহীদ হন। যে ব্যক্তি নিজেকে সবচেয়ে বড় ইবাদতগুজার ভাবত, সে-ই হত্যা করল ইসলামের চতুর্থ খলিফাকে।

হাদিসে সতর্কবাণী

এই গোষ্ঠীর উত্থানের ভবিষ্যদ্বাণী রাসুলুল্লাহ (সা.) আগেই করে গিয়েছিলেন। আবু সাঈদ খুদরি (রা.) বর্ণনা করেন, গনিমতের মাল বণ্টনের সময় এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহকে (সা.) বলল, ‘ইনসাফ করুন।’

রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, এই ব্যক্তির বংশ থেকে এমন একদল লোক বের হবে, যাদের নামাজের তুলনায় তোমরা নিজেদের নামাজকে তুচ্ছ মনে করবে, তাদের রোজার তুলনায় নিজেদের রোজাকে তুচ্ছ মনে করবে। তারা কুরআন পড়বে, কিন্তু তা তাদের কণ্ঠনালির নিচে নামবে না। তীর যেমন শিকারের দেহ ভেদ করে বেরিয়ে যায়, তারা তেমনি দ্বীন থেকে বেরিয়ে যাবে।

অন্য হাদিসে তাদের আরও কয়েকটি পরিচয় এসেছে। আলী (রা.)-এর বর্ণনায়, তারা হবে ‘বয়সে তরুণ ও বুদ্ধিতে অপরিণত’। তারা সৃষ্টির সর্বোত্তম কথা বলবে, অথচ তাদের কাজ হবে বিপরীত। আবু যর (রা.)-এর বর্ণনায় তাদের সৃষ্টির নিকৃষ্টতম বলা হয়েছে।

আবু সাঈদ (রা.)-এর হাদিসে এসেছে, তারা মুসলমানদের হত্যা করবে আর মূর্তিপূজকদের ছেড়ে দেবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আমি তাদের পেলে আদ জাতির মতো হত্যা করতাম। এই সতর্কবাণী কোনো একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়, বরং একটি বিশেষ মানসিকতার বিরুদ্ধে।

মূল বৈশিষ্ট্য

ইসলামি ঐতিহ্যের আলোকে খারেজি মানসিকতার কয়েকটি বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট।

প্রথমত, তাকফির। কবিরা গুনাহ করলেই তারা মুসলমানকে কাফির ঘোষণা করত এবং নিজেদের ছাড়া সবাইকে ইসলামের গণ্ডির বাইরে ভাবত।

দ্বিতীয়ত, রক্তপাতের বৈধতা। যাকে কাফির বলা হয়, তার জান-মাল তাদের কাছে হালাল হয়ে যেত। ফলে তারা নিরীহ মুসলমানদের হত্যা করেছে, অথচ অমুসলিমদের প্রতি সহনশীল ছিল।

তৃতীয়ত, কুরআনের আয়াতের ভুল প্রয়োগ। সাহাবি ইবনে উমর (রা.) তাদের সম্পর্কে বলতেন, তারা কাফিরদের সম্পর্কে নাজিল হওয়া আয়াত মুমিনদের ওপর প্রয়োগ করে। অর্থাৎ তারা কুরআন পড়ত, কিন্তু আয়াতের প্রেক্ষাপট ও মর্ম বুঝত না।

চতুর্থত, বাহ্যিক ইবাদতের অহংকার। অতিরিক্ত নামাজ, রোজা ও তিলাওয়াত ছিল তাদের পরিচয়, অথচ হৃদয়ে ছিল কঠোরতা ও অন্যকে তুচ্ছ করার মনোভাব।

পঞ্চমত, আলেম ও সাহাবিদের ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান। নিজেদের বোঝাকেই চূড়ান্ত ভাবা এবং শাসকের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করা ছিল তাদের স্থায়ী প্রবণতা।

ইমামদের বিশ্লেষণ

ইবনে হাজার আসকালানি ‘ফাতহুল বারি’তে খারেজিদের আকিদা ও হাদিসগুলোর বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেছেন এবং দেখিয়েছেন, তাদের মূল বিচ্যুতি ছিল কবিরা গুনাহকারীকে কাফির বলা।

ইমাম নববি ‘শরহু সহিহ মুসলিম’-এ তাদের বিষয়ে হাদিসগুলোর ব্যাখ্যা দিয়েছেন। ইবনে তাইমিয়া ‘মাজমুউল ফাতাওয়া’য় লিখেছেন, তাদের মূল সমস্যা ইবাদতের ঘাটতি নয়, বরং মুসলমানকে কাফির বলা ও তার রক্ত বৈধ করা এবং কুরআনের নিজস্ব ব্যাখ্যা দিয়ে সাহাবিদের বোঝাকে অগ্রাহ্য করা।

আল-আশআরি তাঁর ‘মাকালাতুল ইসলামিয়্যিন’ এবং আল-শাহরাস্তানি ‘আল-মিলাল ওয়ান নিহাল’ গ্রন্থে তাদের শাখা-প্রশাখার বিবরণ দিয়েছেন।

শাখা-প্রশাখা

পরবর্তীকালে খারেজিরা বিভক্ত হয়ে পড়ে। আজারিকারা ছিল সবচেয়ে চরমপন্থী; তারা বিরোধীদের নারী ও শিশুদেরও হত্যা বৈধ মনে করত। নাজদাত ও সুফরিয়ারা তুলনামূলক কম কঠোর ছিল। ইবাদিরা ছিল সবচেয়ে মধ্যপন্থী।

তারা মুসলমানদের কাফির না বলে ‘কুফরে নিয়ামত’ বলে এবং আজ ওমান ও উত্তর আফ্রিকার কিছু অঞ্চলে তাদের উত্তরসূরিরা আছেন। তারা নিজেদের খারেজি পরিচয় অস্বীকার করেন এবং প্রাচীন খারেজিদের চরমপন্থা থেকে নিজেদের আলাদা করেন।

সংযমের শিক্ষা

এখানে একটি বিষয়ে সতর্কতা জরুরি। ‘খারেজি’ শব্দটি রাজনৈতিক গালি হিসেবে ব্যবহার করা সহজ, কিন্তু ইসলামি ঐতিহ্য এখানে সংযমের শিক্ষা দেয়। আলী (রা.) নিজে নাহরাওয়ানের পর তাদের সম্পর্কে বলেছিলেন, তারা শিরক থেকে পালায়নি, তারা আমাদের ভাই, আমাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে। অর্থাৎ তিনি তাদের অপরাধকে বিদ্রোহ হিসেবে দেখেছেন, কাফির বলেননি।

মুসলমানকে তাকফির করার বিরুদ্ধে হাদিসের হুঁশিয়ারি তো আছেই। তাই বিরোধী মত, তীব্র সমালোচনা বা রাজনৈতিক ভিন্নমত পোষণ করলেই কাউকে খারেজি বলা যায় না। এমন করলে খারেজিদের মতোই আরেক ধরনের তাকফিরে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে।

আধুনিক প্রেক্ষাপট

আইএস, আল-কায়েদা ও এ ধরনের কিছু সংগঠনের তাকফির এবং নির্বিচার হত্যার সঙ্গে খারেজিদের মিল দেখিয়ে বহু আলেম ও প্রতিষ্ঠান তাদের সমালোচনা করেছেন। আল-আজহারসহ বিভিন্ন ইসলামি প্রতিষ্ঠান এই মানসিকতাকে প্রত্যাখ্যান করেছে।

২০০৪ সালের আম্মান বার্তায় জর্ডানের নেতৃত্বে শতাধিক আলেম একমত হয়েছেন, কোনো মুসলমানকে তাকফির করা অবৈধ। তবে কোনো নির্দিষ্ট সংগঠনকে এই তকমা দিতে হলে তাদের কর্ম ও মতাদর্শ ধরে আলাদাভাবে যাচাই করা দরকার, আবেগ বা রাজনৈতিক স্বার্থে নয়।

শিক্ষা

খারেজিদের ইতিহাসের শিক্ষা একটাই: ধর্মীয় পরিভাষা, ইবাদতের বাহ্যিক রূপ আর তিলাওয়াতের সুর কাউকে সত্যপন্থী প্রমাণ করে না। ইসলামের মানদণ্ড হলো নিরপরাধ মানুষের জীবনের প্রতি শ্রদ্ধা, ন্যায়বিচার, বিনয় এবং সাহাবি ও আলেমদের ব্যাখ্যার প্রতি আনুগত্য। যে মানসিকতা ধর্মের নামে রক্ত ঝরায়, সে যে যুগেই আসুক, তার পরিণতি একই—দ্বীনের ভেতর থেকে দ্বীনকে আঘাত করা।

তথ্যসূত্র: আল-কুরআন—সূরা আল-আনআম ৬:৫৭, সূরা ইউসুফ ১২:৪০; সহিহ বুখারি, ৩৩৪৪, ৩৬১০, ৩৬১১, ৬৯৩০; সহিহ মুসলিম, ১০৬৪, ১০৬৬, ১০৬৭; সুনানুল কুবরা—নাসাঈ ও বাইহাকি; আল-মুস্তাদরাক—হাকিম; ফাতহুল বারি; শরহু সহিহ মুসলিম; মাজমুউল ফাতাওয়া; মাকালাতুল ইসলামিয়্যিন; আল-মিলাল ওয়ান নিহাল; তারিখুত তাবারি; আম্মান বার্তা (২০০৪)।

লেখক:  কলামিস্ট ও শিক্ষার্থী, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, কায়রো, মিশর।

 

 

কিউএনবি/আয়শা/১৫ অক্টোবর ২০২৬,/সন্ধ্যা ৬:৫০

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

October 2026
M T W T F S S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
27282930  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit