ডেস্ক নিউজ : অগাধ শ্যাওলা আর শ্যামল বনভূমির দেশে একেবারে গাঢ় কালো রঙের ছোট্ট একটি পাখি যেন এক রহস্যময় আবেশ তৈরি করেছে। আকারে খুদে, দেখতে লাজুক আর মাথা থেকে নখ পর্যন্ত কুচকুচে কালো পোশাকে মোড়ানো; নিউজিল্যান্ডের এই পরিচিত ‘কারুরে’ বা ‘ব্ল্যাক রবিন’ (কালো রবিন) এখন দেশটির নতুন তারকা। চাতুর্যময় উপস্থিতি ও গথিক সৌন্দর্যের কারণে নজর কাড়া বিরল প্রজাতির এই পাখিটি এবার জয় করে নিয়েছে নিউজিল্যান্ডের বহুল আলোচিত ‘বার্ড অব দ্য ইয়ার ২০২৬’ (বর্ষসেরা পাখি)-এর মুকুট।
মূল নিউজিল্যান্ড থেকে প্রায় ৮০০ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত দূরবর্তী চ্যাথাম দ্বীপপুঞ্জের একমাত্র বাসিন্দা এই কারুরে। অত্যন্ত সংকটাপন্ন প্রজাতির এই পাখিটি ২৫ হাজারেরও বেশি ভোট পেয়ে প্রতিযোগিতায় শীর্ষস্থান দখল করে নেয়। পেছনে ফেলে দেয় প্রতিযোগিতার পূর্ববর্তী বিজয়ী প্রজাতিগুলোকে; যার মধ্যে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে বিশাল আকারের উড্ডয়নহীন তোতা ‘কাকাপো’ এবং তৃতীয় স্থানে জায়গা করে নিয়েছে কিউইদের গর্ব নিউজিল্যান্ডের বাজপাখি ‘কারেআরেআ’।
প্রতিযোগিতার আয়োজক সংস্থা ‘ফরেস্ট অ্যান্ড বার্ড’-এর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে নিউজিল্যান্ডের সর্বকালের সর্বোচ্চ ভোট সংগৃহীত হয়েছে। দেশটির প্রতি ৫০ জন নাগরিকের মধ্যে অন্তত একজন অর্থাৎ ১০৫০০০-এরও বেশি মানুষ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। এই বিপুল অংশগ্রহণ বিগত বছরের ৭৫০০০ ভোটের রেকর্ডকে যেমন ভেঙে দিয়েছে, তেমনি দুই দশক আগের ৯০০ ভোটের প্রথম আসরের তুলনায় বিশাল সাফল্য এনে দিয়েছে। বিশেষ বিষয় হলো, মোট প্রদত্ত ভোটের প্রায় ৮৮ শতাংশ এসেছে নিউজিল্যান্ডের অভ্যন্তরীণ বাসিন্দাদের কাছ থেকে, যা প্রতিযোগিতার ইতিহাসে স্থানীয়দের সক্রিয় অংশগ্রহণের এক নতুন রেকর্ড।
তবে কারুরের এই গথিক সৌন্দর্য কিংবা বিজয়ের আনন্দময় সুরের অন্তরালে লুকিয়ে রয়েছে এক অবিশ্বাস্য ও বিস্ময়কর টিকে থাকার গল্প। গত শতকের আশির দশকে প্রজাতিটি নিঃশেষ হওয়ার চূড়ান্ত প্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল। ১৯৮০ সালে পুরো পৃথিবীতে কেবল পাঁচটি কারুরে বা কালো রবিন পাখি জীবিত ছিল, যার মধ্যে প্রজননে সক্ষম নারী পাখি ছিল মাত্র একটি, যার নাম রাখা হয়েছিল ‘ওল্ড ব্লু’। নিউজিল্যান্ডের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণবাদীরা তখন ‘ওল্ড ব্লু’ এবং একটি পুরুষ পাখি ‘ওল্ড ইয়েলো’-কে কেন্দ্র করে নিবিড় ও জরুরি কৃত্রিম প্রজনন কর্মসূচি শুরু করেন।
সংরক্ষণ কর্মীদের সেই অবিরাম প্রচেষ্টা ও অদম্য সাহসিকতার ওপর ভর করেই কারুরে আজ আবার নতুন দিগন্তে ডানা মেলছে। বর্তমানে শিকারিমুক্ত বা ক্ষতিকারক প্রাণীহীন দুটি সংরক্ষিত দ্বীপে প্রায় ৩৫০টি বয়স্ক কারুর পাখির নিরাপদ বসবাস নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। এই অভাবনীয় পুনরুত্থান নিউজিল্যান্ডের প্রকৃতি সংরক্ষণ প্রচেষ্টাকে বিশ্বজুড়ে এক অনন্য মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে। ফলাফলের পর কারুরের পক্ষে প্রচার চালানো ‘চ্যাথাম আইল্যান্ডস ল্যান্ডস্কেপ রিস্টোরেশন ট্রাস্ট’ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেশবাসীকে ধন্যবাদ জানিয়ে উল্লেখ করে যে, এই সাফল্য আনন্দের হলেও পাখিগুলোর জনসংখ্যা টেকসই রাখতে এখনো অনেক দীর্ঘ পথ অতিক্রম করা বাকি।
নিউজিল্যান্ড সরকারের সংরক্ষণ বিভাগের পর্যালোচনায় কারুর প্রজাতিটিকে এখনো জাতীয়ভাবে সংকটাপন্ন হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা রাখা হয়েছে। বর্তমানে যে দুটি দ্বীপে এরা বসবাস করছে, সেই চারণভূমি প্রায় পূর্ণ হয়ে এসেছে। পাখিবিজ্ঞানীদের মতে, এদের বংশবৃদ্ধি নিরবচ্ছিন্ন রাখতে এবং অস্তিত্বের ঝুঁকি পুরোপুরি কাটাতে অনতিবিলম্বে তৃতীয় একটি সুরক্ষিত দ্বীপে নতুন বসতি গড়ে তোলা অত্যন্ত প্রয়োজন।
মূলত সাধারণ মানুষের মধ্যে বিপন্ন বন্যপ্রাণীদের রক্ষা ও প্রজাতিগুলোর হুমকি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতেই প্রতি বছর এ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। তবে সময়ের সাথে সাথে এটি স্রেফ সচেতনতামূলক কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ না থেকে দারুণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা, রসালাপ ও নানা মুখরোচক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এমনকি অতীতে একে ঘিরে জালিয়াতি এবং অদ্ভুত নানা ঘটনার জন্ম হয়েছে। যেমন ২০২০ সালে একটি আইপি ঠিকানা থেকে সহস্রাধিক ভুয়া ইমেইল ব্যবহার করে ভোট কারচুপির চেষ্টা করা হয়েছিল, আবার ২০২১ সালে পাখিদের এই প্রতিযোগিতায় বিজয়ীর মুকুট ছিনিয়ে নিয়েছিল নিউজিল্যান্ডের উড়ন্ত স্তন্যপায়ী প্রাণী লংশোভা বাদুড়।
চলতি বছরেও সাধারণ নির্বাচনের আদলে প্রতিযোগীদের লাজুক পাখি, ভূচর পাখি, নিশাচর পাখি কিংবা উচ্চভূমির পাখি এমন নানা দলে বিভক্ত করে কৌতুকপূর্ণ ও আনন্দময় পরিবেশ তৈরি করা হয়। আয়োজক ফরেস্ট অ্যান্ড বার্ডের প্রতিনিধিরা জানান, হাস্যরস আর ইন্টারনেটের বিভিন্ন মজাদার মিম প্রতিযোগিতাকে আকর্ষণীয় করলেও এর পেছনে লুকিয়ে রয়েছে এক গভীর ও কঠোর বার্তা। নিউজিল্যান্ডের প্রায় ৮০ শতাংশ দেশীয় পাখি বর্তমানে কোনো না কোনোভাবে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে, যার মধ্যে এবারের শীর্ষ দশের তালিকায় থাকা আটটি পাখিই অন্তর্ভুক্ত। চশমে পরা পুচকে এই রবিন পাখির জয় হয়তো নিউজিল্যান্ডসহ গোটা পৃথিবীর বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের লড়াইয়ে এক নতুন আশার আলো জ্বালিয়ে দিয়ে গেল।
সূত্র: সিএনএন
কিউএনবি/অনিমা/২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬,/রাত ৯:৫৭