সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:০৮ অপরাহ্ন

যেভাবে ভারতে পালান নানক

Reporter Name
  • Update Time : সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২৪ Time View

ডেস্ক নিউজ : দুই বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গে পলাতক জীবন কাটাচ্ছেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা ও সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক। ২০২৪ সালের ১৬ আগস্ট তামাবিল সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে শিলং হয়ে কলকাতায় যান তিনি। এরপর থেকে তপসিয়া এলাকার একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে স্ত্রীকে নিয়ে থাকছেন নানক। দেশে থাকা ব্যবসা ও সম্পদ থেকে অবৈধ হুন্ডির মাধ্যমে নিয়মিত টাকা যাচ্ছে তার কাছে।

আওয়ামী শাসনামলের ১৭ বছরে অর্থবিত্তে ফুলেফেঁপে ওঠেন বরিশাল নগরীর বটতলা এলাকার বাসিন্দা জাহাঙ্গীর কবির নানক। যদিও তিনি এমপি হয়েছিলেন ঢাকার মোহাম্মদপুর থেকে। ২০০৮’র জাতীয় নির্বাচনে দাখিল করা হলফনামায় নিজের ও স্ত্রীর মিলিয়ে মাত্র ৬৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকার সম্পদ থাকার তথ্য দেন নানক। ১৬ বছরের ব্যবধানে ২০২৪’র নির্বাচনে হলফনামায় তিনি দুজনের সম্পদের পরিমাণ দেখান ১৯ কোটি টাকা। দুই হলফনামার এই হিসাবে ৩০ গুণ সম্পদ বাড়ার কথা বলা হলেও বাস্তবে এর চেয়ে বহুগুণ বেশি সম্পদ রয়েছে নানক পরিবারের। সেসব সম্পদের মূল্য শত কোটি টাকার বেশি। 

বরিশাল নগরীর নথুল্লাবাদ এলাকায় নানক দম্পতির মালিকানায় থাকা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ‘গ্লোবাল ভিলেজ’র কথা উল্লেখ করা হয়নি দাখিল করা ওই হলফনামায়। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়-ব্যায়ের কোনো হিসাবও দেওয়া হয়নি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে। বরিশালের প্রবেশদ্বার দোয়ারিকা সেতু এলাকায় থাকা ৮ একর জমির কথাও কোথাও বলেননি নানক। বরিশাল নগরীতে ২টি বাড়ি ও মাছের খামারসহ ২ একর ২২ শতাংশ ভূ-সম্পত্তির কথা হলফনামায় থাকলেও এসব সম্পত্তির অধিকাংশে যে ছোট-বড় ভবন রয়েছে তার যেমন উল্লেখ নেই, তেমনি এসব ভবন থেকে আসা ভাড়ার কথাও হলফনামা তথা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে বলেননি এই আওয়ামী লীগ নেতা। এর বাইরে ঢাকার কলাবাগান এলাকায় বহুতল ভবনসহ কক্সবাজার ও কুয়াকাটায় নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ রয়েছে নানকের। 

২৪’র নির্বাচনে দেওয়া হলফনামায় বরিশালে ২টি বাড়ি ছাড়াও রাজধানীর উত্তরায় একটি ৬ তলা ও মোহাম্মদপুরে একটি ৮ তলা বাড়ি থাকার তথ্য দেন নানক। নানকের এসব সম্পদে একটি নখের আঁচড়ও পড়েনি চব্বিশের ৫ আগস্টের পর। বিশেষ করে বরিশাল নগরীর বটতলা এলাকায় থাকা বাড়িতে একটি ঢিলও ছোড়েনি কেউ। ফলে এসব ভবন যেমন রয়েছে বহাল তবিয়তে, তেমনি ভাড়া বাবদ নিয়মিত আদায় হচ্ছে লাখ লাখ টাকা। একইভাবে মসৃণ গতিতে চলা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও প্রতি মাসে আয় হচ্ছে বিপুল অর্থ। এর পাশাপাশি বরিশাল নগরীর রুপাতলী, মতাসার, সার্কুলার রোড ও করিম কুটিরসহ বিভিন্ন এলাকায় নানকের জমিতে থাকা ছোট-বড় বাসা-বাড়ি থেকেও ভাড়া বাবদ উঠছে মোটা অংকের টাকা। সবমিলিয়ে এই টাকার পরিমাণ প্রতি মাসে কোটিরও বেশি। আর এই পুরো টাকাই হুন্ডি হয়ে চলে যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গে পালিয়ে থাকা নানকের কাছে।

কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকার ডিজিটাল মাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কিভাবে বাংলাদেশ থেকে পশ্চিমবঙ্গে যান তা সবিস্তারে বলেছিলেন নানক। সেই বক্তব্য অনুযায়ী ২৪’র ১৬ আগস্ট পর্যন্ত দেশেই ছিলেন তিনি। ১৬ আগস্ট তামাবিল সীমান্ত হয়ে প্রবেশ করেন ভারতের শিলংয়ে। এরপর মালদা হয়ে চলে যান কলকাতায়। তার পালিয়ে যাওয়ার পুরো প্ল্যানটি করেন মেয়ে রাখির স্বামী ডা. নাজমুল। 

সাক্ষাৎকারে যা তিনি বলেননি তা হলো, কলকাতার অভিজাত তপসিয়া এলাকায় আগে থেকেই ভাড়া করা ছিল বিলাসবহুল ফ্ল্যাট। কলকাতায় গিয়ে স্ত্রীকে নিয়ে সেখানেই ওঠেন তিনি। বর্তমানে এই দম্পতিকে মাঝে মধ্যেই দেখা যায় কলকাতার নামিদামি শপিংমলগুলোতে। দেশের মতো বিদেশে পালিয়ে থাকা অবস্থাতেও দামি গাড়িতে চড়া আর বিলাসিতার সবকিছুই ভোগ করছেন তারা।

যার জোগান যায় বাংলাদেশ থেকে। প্রতি মাসে মোটা অংকের টাকা বরিশাল আর ঢাকা থেকে নানকের কাছে যায় অবৈধ হুন্ডির মাধ্যমে। সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ পদ থেকে অবসরে যাওয়ার পর নানকের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি করা এক ব্যক্তি নিয়ন্ত্রণ করেন এর সবকিছু। ৫ আগস্টের পর অবশ্য আন্দোলনের মুখে বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি ছাড়তে হয় তাকে। তারপরও যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন ক্ষমতার সময়ে নানকের কাছ থেকে নানা সুবিধা নেওয়া ষাটোর্ধ্ব এই ব্যক্তি।

বরিশাল নগরীর সদর রোড ও কাঠপট্টি এলাকার দুই হুন্ডি ব্যবসায়ীর মাধ্যমে সরাসরি ভারতে টাকা যায় নানকের কাছে। এদের একজন হোটেল ব্যবসায়ী। অন্যজন স্বর্ণের ব্যবসার আড়ালে চালান অবৈধ হুন্ডির ব্যবসা। এখানে থাকা বিশাল ভবনসহ অন্যান্য ছোট-বড় বাড়িগুলোর ভাড়া তুলে সরাসরি দিয়ে দেওয়া হয় ওই দুই হুন্ডি ব্যবসায়ীর কাছে। তারাই তা পশ্চিমবঙ্গে রুপি আকারে নানকের কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করেন। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়ের একটি বড় অংশও দাপ্তরিক ফাঁক গলে চলে যায় ভারতে।

ঢাকায় থাকা ৩টি বাড়িসহ অন্যান্য ব্যবসা-বাণিজ্যের আয়ও একইভাবে যায় সেখানে। এক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয় বেনাপোল সীমান্তে থাকা একটি মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানের মালিককে। ওই মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবসায়ীর যশোরে থাকা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানো হয় ঢাকা থেকে। এরপর তিনি তার পশ্চিমবঙ্গের এজেন্টের মাধ্যমে রুপি পৌঁছানোর ব্যবস্থা করেন নানকের কাছে। ঢাকার আয় পশ্চিমবঙ্গে পাঠানোর বিষয়টি দেখভাল করেন নানকের এক ছোট ভাই।

পরিচয় না প্রকাশের শর্তে কিছুদিন আগে পশ্চিমবঙ্গ থেকে দেশে ফেরা আওয়ামী লীগের এক কর্মী যুগান্তরকে বলেন, ‘হুন্ডির মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া টাকা আনতে বাড়ির বাইরে যেতে হয় না নানককে। নির্ধারিত এজেন্টরা তপসিয়া এলাকার ওই ফ্ল্যাটে গিয়ে পৌঁছে দিয়ে আসেন তা। ৫ আগস্টের পর টানা প্রায় ২ বছর এভাবেই দেখেছি। ওই টাকা দিয়ে রাজকীয় হালে পশ্চিমবঙ্গে দিন কাটাচ্ছেন তিনি।’ এসব বিষয় নিয়ে কথা বলার জন্য জাহাঙ্গীর কবির নানকের পরিচিত সবগুলো ফোন ও মোবাইল নম্বরে ফোন দেওয়া হলে তার সবগুলোই বন্ধ পাওয়া যায়। হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো উত্তর দেননি তিনি।

 

 

কিউএনবি/আয়শা/১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,/দুপুর ১:০৫

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

September 2026
M T W T F S S
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit