সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৪৭ পূর্বাহ্ন

পাহাড়ের সমস্যার সমাধানে ‘হলিস্টিক অ্যাপ্রোচ’ পদ্ধতিতে এগোতে চায় সরকার; মীর হেলাল

আলমগীর মানিক,রাঙামাটি প্রতিনিধি।
  • Update Time : বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৫১ Time View

আলমগীর মানিক, রাঙামাটি : পার্বত্য চট্টগ্রামে সশস্ত্র তৎপরতা ও সহিংসতা বন্ধে শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান নয়, শিক্ষা, সামাজিক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, পর্যটন ও অবকাঠামোগত উন্নয়নকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর হেলাল উদ্দিন।

তিনি বলেছেন,‘অপারেশন চালিয়ে কিংবা সেনাবাহিনী-পুলিশ পাঠিয়ে কোনো সমস্যার টেকসই সমাধান হবে না। যেখানে অন্ধকার আছে, সেখানে শিক্ষার আলো, সামাজিক উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে আলো দিতে হবে। যত আলো বাড়বে, অন্ধকার তত কমে আসবে।’বুধবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে রাঙামাটি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি এসব কথা বলেন। জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, মাদক ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা এবং জনকল্যাণমূলক উন্নয়ন কার্যক্রম তদারকি ও সমন্বয়ের লক্ষ্যে এ মতবিনিময়ের আয়োজন করা হয়।

এর আগে রাত সাড়ে ৮টা থেকে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, পার্বত্য রাঙামাটি জেলা পরিষদের সদস্যবৃন্দ, জেলা প্রশাসন, গোয়েন্দা সংস্থা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেন প্রতিমন্ত্রী। মতবিনিময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধানে সরকার ‘হলিস্টিক অ্যাপ্রোচ’ বা সামগ্রিক পদ্ধতিতে এগোতে চায় বলে জানান মীর হেলাল। তাঁর মতে, শুধু আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করে পাহাড়ের সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়; এর পাশাপাশি শিক্ষা, সামাজিক উন্নয়ন, পর্যটন, কর্মসংস্থান ও মানুষের জীবনমান উন্নয়নের বিষয়গুলোকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

তিনি বলেন,‘কোনো পরিবর্তনই ওয়ান নাইটে হবে না। আমরা পর্যায়ক্রমে ব্যবস্থা নিচ্ছি। অস্ত্র ও সহিংসতা ধীরে ধীরে কমে আসবে। এটি একটি প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ার মধ্যে আইনি ব্যবস্থা যেমন থাকবে, তেমনি শিক্ষা, সামাজিক উন্নয়ন, পর্যটন ও কর্মসংস্থানের বিষয়ও থাকবে।’সশস্ত্র তৎপরতা প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হলে এবং স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ তৈরি হলে বিচ্ছিন্নতাবাদী বা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা কমবে।

তিনি বলেন,‘আমি গোলাবারুদ নিয়ে আর্মি পাঠিয়ে দিলাম, র‍্যাব পাঠিয়ে দিলাম, পুলিশ পাঠিয়ে দিলাম; এটা কোনো টেকসই সমাধান নয়। আমরা যেখানে অন্ধকার, সেখানে আলো দিতে চাই। কৃষক যেন তাঁর ফসলের সর্বোচ্চ মূল্য পান, মানুষ যেন স্বাবলম্বী হয়; সেই ব্যবস্থা করতে হবে।’

তাঁর মতে, পাহাড়ে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার জন্য দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নির্ধারণ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়ন পরিকল্পনায় পরিবেশ ও প্রকৃতি সংরক্ষণকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, পাহাড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পরিবেশ ধ্বংস করে কোনো উন্নয়ন সরকার অনুমোদন করবে না।

তিনি বলেন,‘আমাদের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অক্ষুণ্ন রেখে প্রকৃতির সঙ্গে সমন্বয় করে উন্নয়ন করতে হবে। অবকাঠামো উন্নয়ন হোক, পর্যটন বিকাশ হোক কিংবা অন্য কোনো স্থাপনা; সবকিছুই পরিবেশ অক্ষত রেখে করতে হবে।’পাহাড়ের সম্ভাবনাময় পর্যটন খাতকে স্থানীয় জনগণের কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতার সঙ্গে যুক্ত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

রাঙামাটির শিক্ষার মানোন্নয়ন নিয়েও বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে বলে জানান মীর হেলাল। বিশেষ করে দুর্গম এলাকার শিক্ষার্থীদের জন্য ই-লার্নিং ব্যবস্থা সম্প্রসারণ, ছাত্রীদের আবাসন ও যাতায়াত সুবিধা নিশ্চিত করার বিষয়টি আলোচনায় আসে।

তিনি বলেন, রাঙামাটিতে সাম্প্রতিক এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল আশানুরূপ হয়নি। দুর্গম এলাকার শিক্ষার্থীরা যাতে আধুনিক শিক্ষা সুবিধা থেকে বঞ্চিত না হয়, সে জন্য প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইন্টারনেট সংযোগের মাধ্যমে ই-লার্নিং ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে।

পাহাড়ের দুর্গম এলাকায় শিক্ষার সুযোগ বাড়ানোকে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক পরিবর্তনের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। পাহাড়ের মানুষের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়াতে কৃষি ও স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী। কৃষক যাতে তাঁর উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পান এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠী নিজেদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে পারেন, সে ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান তিনি।

তাঁর মতে, মানুষের সামনে বৈধ আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ যত বাড়বে, অপরাধ ও সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সুযোগ তত কমবে। বৈঠকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে মীর হেলাল বলেন, দুর্নীতির কোনো প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন,‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমরা সবাই জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছি। যেখানে দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া যাবে, সেখানে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

তবে অনুমানভিত্তিক মামলা বা অভিযোগের মাধ্যমে কাউকে হয়রানি করা হবে না বলেও জানান তিনি। অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্তকারী সংস্থা তদন্ত করবে এবং যথাযথ বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। বৈঠকে রাঙামাটির স্থানীয় বিভিন্ন সমস্যাও চিহ্নিত করা হয়েছে বলে জানান মীর হেলাল। এর মধ্যে ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্স, ট্রাফিক পুলিশ ও ওয়াটার ফায়ার সার্ভিসের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি বিশেষভাবে উঠে আসে।

জেলার ভৌগোলিক বাস্তবতা ও মানুষের প্রয়োজন বিবেচনায় এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি। এ ছাড়া সরকারের বিভিন্ন সামাজিক কর্মসূচি, ফ্যামিলি কার্ডের পাইলটিং, কৃষকদের সহায়তা, ইমাম-মুয়াজ্জিন ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের তালিকা প্রণয়ন এবং অসচ্ছল ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়।

মীর হেলাল বলেন, অতীতে জনগণের সঙ্গে প্রশাসনের যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, বর্তমান সরকার তা দূর করতে চায়। পাহাড়ের উন্নয়ন ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় জেলা পরিষদ, জেলা প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিকসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

পাহাড়ে দীর্ঘদিন ধরে বন্দোবস্ত প্রদান বন্ধ রাখার পাশাপাশি বাজার ফান্ডভূক্ত এলাকায় ঋণ প্রদান বন্ধ রাখার বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী হেলালের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, এটা জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার; জনগণের চাহিদার ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট সকলের সাথে আলোচনা করে তাদের মতামত নিয়ে শীঘ্রই এই ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিবো।  

তিনি বলেন, ‘আমরা সমন্বিতভাবে কাজ করে ইনশাআল্লাহ এই অঞ্চলকে উন্নত, সমৃদ্ধ ও সম্প্রীতির জনপদ হিসেবে গড়ে তুলতে চাই।’প্রতিমন্ত্রী জানান, রাঙামাটির সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে চার ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। স্থানীয় সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়েও বৈঠকে সিদ্ধান্ত ও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

বৈঠকে রাঙামাটির সংসদ সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান, রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান দ্বীপন তালুকদার দীপুসহ জেলা প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা ও বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন

কিউএনবি/আয়শা/০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,/রাত ৮:২২

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

October 2026
M T W T F S S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
27282930  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit