আন্তর্জাতিক ডেস্ক : উত্তর নেপালে ভয়াবহ পাহাড়ি ঢল ও আকস্মিক বন্যার এক সপ্তাহ পার হয়ে গেলেও বিভিন্ন হাইড্রোবিদ্যুৎ প্রকল্পের আন্ডারগ্রাউন্ড পাওয়ারহাউস এবং সুড়ঙ্গে আটকে থাকা শ্রমিক ও কর্মচারীদের কাছে পৌঁছাতে পারছেন না উদ্ধারকারীরা। ভোটেকোশি নদীসহ উত্তরের বিভিন্ন নদ-নদীতে নেমে আসা কাদা, পাথর ও মারাত্মক ধ্বংসাবশেষের কারণে বিশাল এই অবকাঠামোগুলোর প্রবেশপথ পুরোপুরি অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। সময়ের সাথে সাথে ভেতরে আটকে থাকাদের বেঁচে থাকার আশা যেমন ক্ষীণ হয়ে আসছে, তেমনি দীর্ঘ অপেক্ষায় থাকা স্বজনদের ক্ষোভ ও হতাশা চরম আকার ধারণ করেছে।
সরকারি হিসাব ও ইন্ডিপেন্ডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার্স অ্যাসোসিয়েশন, নেপাল (আইপিপিএএন)-এর তথ্যানুসারে, বন্যাকবলিত এলাকার বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে এখন পর্যন্ত ৯৪৭ জন মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। তবে ঠিক কতজন সুড়ঙ্গের ভেতরে আটকা পড়েছেন আর কতজন ঢলের তোড়ে ভেসে গেছেন, তা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
সবচেয়ে মর্মান্তিক ও আশঙ্কাজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে ৬০ মেগাওয়াটের ‘উপার ত্রিশুলি-৩এ’ এবং ২১৬ মেগাওয়াটের ‘উপার ত্রিশুলি-১’ প্রকল্প এলাকায়। উপার ত্রিশুলি-৩এ প্রকল্পের ভূগর্ভস্থ বিদ্যুৎকেন্দ্রে অভিজ্ঞ প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদসহ প্রায় ৪২ জন কর্মী আটকা পড়ে আছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। দীর্ঘ এক সপ্তাহ ধরে স্বজনদের কোনো খোঁজ না পেয়ে নিখোঁজ কর্মীদের পরিবার কাঠমান্ডু ও প্রকল্প কার্যালয়গুলোতে ভিড় জমাচ্ছেন। অনেকেই অভিযোগ করছেন, সরকার ও প্রকল্প কর্তৃপক্ষ শুরু থেকে উদ্ধার অভিযানে প্রয়োজনীয় ভারী যন্ত্রপাতি ও পানি নিষ্কাশনের আধুনিক পাম্প ব্যবহারে চরম ব্যর্থতা দেখিয়েছে। নিখোঁজ কর্মীদের স্বজনদের দাবি, ভূগর্ভস্থ পাওয়ারহাউস কাঠামোটি যেহেতু এখনো অক্ষত রয়েছে, তাই ভেতরে সুপেয় পানি খেয়ে বা বিকল্প উপায়ে শ্রমিকদের জীবিত থাকার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না। তবে উদ্ধারকাজে জরুরি কারিগরি টিম দেরিতে মোতায়েন করায় এই সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে।
২১৬ মেগাওয়াটের উপার ত্রিশুলি-১ প্রকল্প থেকে সর্বাধিক ৫৫৭ জন মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন, যদিও সেখান থেকে আড়াই শতাধিক মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। এছাড়া ৩৭ মেগাওয়াটের উপার ত্রিশুলি-৩বি প্রকল্পে ১৯১ জন, ১১১ মেগাওয়াটের রসুয়াগাধি প্রকল্পে ৯৩ জন এবং ২০ মেগাওয়াটের লাংটাং খোলা জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে অন্তত ৪১ জন আটকা পড়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ দল, নেপালি সেনাবাহিনী, সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী এবং পোখরা থেকে আনা বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুর দিয়ে অনুসন্ধানের কাজ চালানো হচ্ছে। ভারত, চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার কারিগরি দলগুলোও সুড়ঙ্গের ভেতরের কাদা এক্সকাভেটর দিয়ে সরিয়ে পথ তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে। অন্যদিকে, সেনাবাহিনীর একটি দল উপর থেকে গর্ত করে সুড়ঙ্গের ভেতরে প্রবেশের বিকল্প পথ খোঁজার চেষ্টা করছে।
আটকে পড়া শ্রমিকদের উদ্ধার অভিযানে নিরাপত্তা প্রোটোকল এবং বেসরকারি প্রকল্পগুলোর সাথে সরকারের সমন্বয়হীনতার চিত্র ফুটে উঠেছে। বেশ কয়েকটি জায়গায় স্বজন ও কোম্পানির কর্মকর্তাদের মধ্যে হাতাহাতি ও বাকবিতণ্ডার সৃষ্টি হয়েছে। কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকে স্বীকার করা হয়েছে যে, উদ্ধারকাজে শুরুতেই নিজস্ব কারিগরি বিশেষজ্ঞদের যুক্ত করা উচিত ছিল, যা করতে বেশ কয়েক দিন দেরি হয়ে গেছে। বর্তমানে সড়ক সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া এবং দুর্গম পার্বত্য ভৌগোলিক অবস্থার কারণে অনেক স্থানে প্রয়োজনীয় ভারী যন্ত্রপাতি পৌঁছানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
সূত্র: কাঠমান্ডু পোস্ট
কিউএনবি/অনিমা/০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬,/বিকাল ৫:২৮