মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৫৫ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম
আইজিপি’র ‘ক্রসফায়ার’ সম্পর্কিত বক্তব্যের অপব্যাখ্যা অপরাধীদের উৎসাহিত করবে ক্রসফায়ার নিয়ে আইজিপির বক্তব্য প্রত্যাহার ও অপসারণের দাবি টিআইবির পেছাল ইনডোর গেমস, আবার অনিশ্চিয়তায় এসএ গেমস স্বর্ণের দাম আরও বাড়ল ব্যালন ডি’অরের দৌড়ে যে কারণে কেইনকে এগিয়ে রাখছেন বিশ্লেষকরা আকামার মেয়াদ শেষ হলেও সৌদিতে প্রবেশের সুযোগ পাবেন প্রবাসীরা: আরিফুল হক এক দিনে ডেঙ্গুতে আরও ৫ জনের মৃত্যু, নতুন ভর্তি ২২১৮ বঙ্গোপসাগরে শাক্তিশালী রুপ নিচ্ছে ঘূর্ণিঝড় অর্ণব সাজেক আন্দোলনে প্রতিনিধিত্বের সংকট, বৈধতা যাচাইয়ে কমিটি সাজেক অবরোধ প্রত্যাহারে সমঝোতা হয়নি দাবি করে অব্যাহত রাখার ঘোষণা

রোহিঙ্গাদের ফেরার পথ বন্ধ, ন্যায়বিচার কি অর্থহীন হয়ে যাবে?

Reporter Name
  • Update Time : শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬
  • ৪৫ Time View

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ২৫ আগস্ট রোহিঙ্গাদের জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক একটি দিন। ২০১৭ সালের এই দিনে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে যে গণহত্যামূলক অভিযান শুরু করেছিল, তার বার্ষিকী পালিত হয় এদিন। ওই অভিযানে শিশুদের আগুনে নিক্ষেপ, নারী ও কিশোরীদের ধর্ষণ ও নির্যাতন এবং পালিয়ে যাওয়ার সময় পুরো পরিবারকে হত্যার মতো নৃশংসতার ঘটনা ঘটে। অনেকে নিজেদের ঘরে আটকা পড়ে জীবন্ত পুড়ে মারা যান। প্রাণ বাঁচাতে ৭ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হন।

রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতিগোষ্ঠী। তারা ইন্দো-আর্য ভাষাপরিবারের একটি নিজস্ব ভাষায় কথা বলেন। দীর্ঘদিন ধরে মিয়ানমারে বৈষম্য, নিপীড়ন ও সহিংসতার শিকার হয়ে আসছেন তারা। বর্তমানে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশের বিভিন্ন শিবিরে আটকা পড়ে আছেন। একই সময়ে রাখাইন রাজ্যে নতুন করে নিপীড়নের কারণে আরও অনেক রোহিঙ্গা ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন। কেউ কেউ নিরাপদ আশ্রয়ের আশায় সমুদ্রপথে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পালানোর চেষ্টা করছেন।

এই সংকটের মধ্যেও আন্তর্জাতিক বিচারপ্রক্রিয়ায় কিছুটা আশার আলো দেখা যাচ্ছে। আর্জেন্টিনায় চলমান বিচারপ্রক্রিয়া এবং আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার মামলাকে কেন্দ্র করে অগ্রগতি হয়েছে। তবে রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা ও অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখনো যথেষ্ট কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি।

গণহত্যা কি থেমেছে?

গত দুই বছরে রাখাইনে ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন এসেছে। জাতিগত রাখাইন সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মি (এএ) এখন রাজ্যটির বেশির ভাগ এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। এর মধ্যে উত্তরাঞ্চলের রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকাও রয়েছে। কিন্তু এতে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন বন্ধ হয়নি।

আরাকান আর্মি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার সঙ্গে সঙ্গে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর ব্যাপক হত্যাকাণ্ড ও পরিকল্পিত হামলার অভিযোগের প্রমাণও সামনে এসেছে। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে জোরপূর্বক নিয়োগ, বিনা পারিশ্রমিকে শ্রম দিতে বাধ্য করা, আটক এবং চলাচলের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের অভিযোগ রয়েছে। যৌন সহিংসতাও অব্যাহত রয়েছে।

রাখাইনে থাকা রোহিঙ্গাদের অভিযোগ, আরাকান আর্মির হাতে তারা যে সহিংসতা ও নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন, তা ২০১৭ সালে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর চালানো জাতিগত নিধনের মতোই ভয়াবহ। রোহিঙ্গাদের বক্তব্য অনুযায়ী, তাদের গ্রাম থেকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে এবং ফিরে যাওয়ার সুযোগও বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। তাদের জমি দখল করে সেখানে নতুন রাখাইন বসতি গড়ে তোলা হচ্ছে। কখনো কখনো সেই বসতি নির্মাণে রোহিঙ্গাদেরই জোর করে শ্রম দিতে বাধ্য করা হচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে তাদের নিজ ভূমিতে ফেরার সম্ভাবনাও ক্রমেই নষ্ট হচ্ছে।

কোথাও নিরাপদ আশ্রয় নেই

২০২৩ সালের শেষ দিক থেকে দেড় লাখের বেশি রোহিঙ্গা নতুন করে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছেন। অথচ একই সময়ে শরণার্থীদের জন্য আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা কমে যাচ্ছে। কক্সবাজারে শিক্ষাকেন্দ্র বন্ধ হয়েছে এবং জরুরি সেবাও কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

গণহত্যা থেকে পালিয়ে আসা অনেক শিশু এখন শিক্ষা ও ভবিষ্যতের আশা থেকে বঞ্চিত। আবার শরণার্থীশিবিরেই জন্ম নেওয়া অনেক শিশু মিয়ানমারের বাইরে কোনো জীবন দেখেনি। এভাবে একটি পুরো প্রজন্মের রোহিঙ্গা শিশুকে অনিশ্চয়তার মধ্যে রেখে দেওয়া হচ্ছে। ফলে রোহিঙ্গাদের সামনে দুটি কঠিন পথ—একদিকে নিজ দেশে অব্যাহত নিপীড়ন, অন্যদিকে বাংলাদেশে ক্রমেই কঠিন হয়ে ওঠা শরণার্থীজীবন।

নিরাপদে পালিয়ে যাওয়ার পথও নেই। অনেক ক্ষেত্রে যারা রোহিঙ্গাদের দেশ ছাড়তে বাধ্য করছে, তারাই পালানোর সময় তাদের পাচারের সঙ্গে জড়িত এবং এ থেকে অর্থ উপার্জন করছে। জুলাইয়ে রাখাইন থেকে যাত্রা করা দুটি নৌকা ডুবে যায়। নৌকা দুটিতে ৫০০-এর বেশি রোহিঙ্গা, যাদের মধ্যে শিশু ও তরুণরাও ছিল, ছিলেন। সন্তানদের নিয়ে কেউ এমন বিপজ্জনক সমুদ্রযাত্রায় বের হতেন না, যদি না নিজ দেশে থাকা তাদের কাছে আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠত।

৯ বছরের দায়মুক্তি

রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যার জন্য দায়ী মিয়ানমারের সামরিক নেতারা প্রায় নয় বছর ধরে কার্যত কোনো বড় শাস্তির মুখোমুখি হননি। গণহত্যার পরিকল্পনাকারীরা এখনো মুক্ত। একই সেনাবাহিনী পরে মিয়ানমারের অন্যান্য জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধেও নৃশংসতা চালিয়েছে।

জবাবদিহি শুধু অতীতের অপরাধের বিচার নয়। এর উদ্দেশ্য বর্তমানের সহিংসতা বন্ধ করা এবং ভবিষ্যতে নতুন নৃশংসতা ঠেকানো।

রোহিঙ্গা সংগঠন ও বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিরা বছরের পর বছর ধরে অপরাধের তথ্য সংগ্রহ, সাক্ষ্য প্রদান এবং বিচারের জন্য লড়াই করে আসছেন। নিজ দেশে ন্যায়বিচার না পাওয়ায় তাদের আন্তর্জাতিক আদালতের দ্বারস্থ হতে হয়েছে।

আর্জেন্টিনায় সর্বজনীন এখতিয়ার আইনের আওতায় দায়ের করা একটি মামলায় মিয়ানমারের ২২ সামরিক কর্মকর্তা এবং তিন বেসামরিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। তাদের মধ্যে মিয়ানমারের সামরিক সরকারের প্রধান মিন অং হ্লাইং ও জেনারেল সো উইনও রয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণের দাবিও তোলা হয়েছে।

এদিকে গাম্বিয়ার করা গণহত্যা মামলায় আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের রায় আগামী কয়েক মাসের মধ্যে আসতে পারে।

বিচার শুধু আদালতে নয়

আন্তর্জাতিক আদালতে রোহিঙ্গাদের বিচার পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হলেও একই সময়ে তাদের নিজ ভূমি থেকে আরও দূরে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। রোহিঙ্গারা যদি নিজ দেশে নিহত, উচ্ছেদ ও ভূমিহীন হতে থাকেন, তাহলে আদালতের আইনি অগ্রগতি তাদের কাছে কতটা অর্থবহ হবে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত আর্জেন্টিনার জারি করা গ্রেফতারি পরোয়ানা কার্যকর করা এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিরা সংশ্লিষ্ট দেশের ভূখণ্ডে প্রবেশ করলে তাদের গ্রেফতার নিশ্চিত করা। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে সমন্বিত নিষেধাজ্ঞা, অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ এবং তাদের সহিংসতা চালানোর অর্থের উৎস বন্ধের উদ্যোগও প্রয়োজন।

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদকেও রাখাইনে চলমান পরিস্থিতি নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ও রাখাইনে থাকা রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক সহায়তা বাড়ানো, সীমান্তপথে ত্রাণ সরবরাহের সুযোগ তৈরি করা এবং মানবিক সহায়তায় বাধা বন্ধে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও আরাকান আর্মির ওপর চাপ প্রয়োগ করা জরুরি।

কারণ রোহিঙ্গাদের জন্য ন্যায়বিচার শুধু আদালতের রায় নয়। ন্যায়বিচারের অর্থ হলো নিজেদের গ্রাম ও জমিতে নিরাপদে ফিরে যাওয়ার অধিকার, নাগরিকত্ব ও সমঅধিকার ফিরে পাওয়া এবং মিয়ানমারে স্বাধীনভাবে সমান মর্যাদায় বসবাসের নিশ্চয়তা।

মিয়ানমারে যদি কোনো রোহিঙ্গাই আর অবশিষ্ট না থাকে, তাহলে বহু বছর পর পাওয়া বিচারও তাদের জন্য অর্থহীন হয়ে যাবে।

সূত্র: আলজাজিরা

 

 

কিউএনবি/আয়শা/২৮ অগাস্ট ২০২৬,/দুপুর ২:৫৫

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

October 2026
M T W T F S S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
27282930  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit