বিনোদন ডেস্ক : বিখ্যাত হাসির নাটক ‘সারাবাই ভার্সেস সারাবাই’-এর ‘রোশেশ’ চরিত্রটি নিয়ে যিনি কোটি কোটি দর্শকের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন, সেই ভারতীয় অভিনেতা রাজেশ কুমার ২০১৭ সালে অভিনয়জীবন থেকে সাময়িক বিরতি নেন। কৃষিকাজকে কাছ থেকে অনুধাবন করার লক্ষ্য নিয়ে তিনি ফিরে গিয়েছিলেন নিজের জন্মভূমি বিহারের গয়ায়। কিন্তু কৃষি নিয়ে গবেষণামূলক এই যাত্রা শেষ পর্যন্ত একটি চরম অর্থকষ্টের পথ হয়ে দাঁড়ায়। দীর্ঘ পাঁচ বছরের এই অভিজ্ঞতায় তিনি প্রায় দুই কোটি রুপি দেনার সাগরে নিমজ্জিত হন।
অভিনয়েরজগৎ থেকে রাজেশের কৃষিকাজে যুক্ত হওয়ার পেছনে বড় ভূমিকা ছিল খ্যাতনামা আধ্যাত্মিক গুরু সদগুরুর। প্রথম দিকে সদগুরুর ভাবধারার প্রতি পুরোপুরি আকৃষ্ট না হলেও, ধীরে ধীরে তিনি তার অনুগামী হয়ে ওঠেন এবং ‘ইশা ফাউন্ডেশন’-এর নানা ইভেন্ট আয়োজনের দায়িত্ব নেন। সদগুরুর ‘র্যালি ফর রিভার্স’ কর্মসূচিতে সক্রিয় ভূমিকা রেখে তিনি একাধিক অনুষ্ঠানের উপস্থাপনাও করেন। সেই সময় সদগুরুর একটি বার্তা তার মনে গভীর রেখাপাত করে, যা তাকে শেষ পর্যন্ত কৃষিকাজে নামতে উদ্বুদ্ধ করেছিল।
স্মৃতিচারণ করে রাজেশ বলেন, র্যালির সময় সদগুরু বারবার বলছিলেন— তোমাদের রাজ্য থেকে আমাকে ১০০ জন যুবক দাও, আমি কৃষির চেহারা বদলে দেব। তবে তিন বছর আমাকে প্রশ্ন করবে না— আমার কী হবে? গ্রামে ফেরার পর আমি মনে মনে সেই বাক্যের একটি উত্তর খুঁজে পাই। আমি ভাবলাম, যেদিন আপনি নিজের কথা ভাবা বন্ধ করবেন, সেদিন থেকে অপরের কথা ভাবতে শুরু করবেন। আর যেদিন আপনি অপরের কথা ভাববেন, সেদিন অন্যরাও আপনার কথা ভাবতে শুরু করবে।
কৃষকদের বিভিন্ন সমস্যা খুব কাছ থেকে অনুধাবন করতে পেরে তিনি ভেবেছিলেন, বাইরে থেকে শুধু উপদেশ না দিয়ে নিজে মাঠে নেমে সংকটগুলো বোঝা দরকার। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমাদের যে শিক্ষা ও তথ্য রয়েছে, তা নিয়ে অপর প্রান্ত থেকে কৃষকদের কীটনাশক ব্যবহারে নিষেধ করার চেয়ে নিজে গিয়ে সমস্যাটা দেখা বেশি দরকার মনে হয়েছিল। তাই আমি অন্য প্রান্তে গেলাম এবং নিজে একজন কৃষক হয়ে উঠলাম। আমি উদ্যানপালন বা হর্টিকালচারের চেষ্টা করি এবং তাতে ভীষণভাবে ব্যর্থ হই। তবে সদগুরুর কৃপায় আমি এটাকে ব্যর্থতা বলব না। এখন এটা আমাকে আর কষ্ট দেয় না, কারণ, আমি এটিকে সফলতা বা ব্যর্থতার তকমা দিতে চাই না। সেখানে এমন অনেক কিছু শেখার ছিল, যা অন্যথায় আমি কখনোই শিখতে পারতাম না।
রাজেশ কুমারের জন্য কৃষিকাজের অভিজ্ঞতা মোটেও সহজ বা মসৃণ ছিল না। কৃষিজমি, মাটি ও চাষবাসের আদ্যোপান্ত বুঝতে তার লেগে যায় প্রায় পাঁচ বছর। এই পুরো সময়ে একের পর এক বিপর্যয় তার পিছু ছাড়েনি। প্রথমে তিনি বাগান তৈরির কাজ শুরু করলেও প্রায় ৩৫ বছর পর সেই অঞ্চলে আসা বন্যায় তার রোপণ করা সবকিছু ভেসে যায়। সেই দুঃসহ অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ঘটনাটি এমনই ছিল যে আমি কাজ শুরু করলাম, গাছ লাগালাম, আর দীর্ঘ ৩৫ বছর পর সেখানে ভয়াবহ বন্যা এসে সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে গেল।
তবে এই বিশাল ধাক্কাতেও দমে যাননি রাজেশ। তিনি আবারও নতুন উদ্যমে প্রায় ১৫ হাজার গাছ রোপণ করেন। কিন্তু সেবার বাধা হয়ে দাঁড়ায় বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া কোভিড-১৯ মহামারি। অতিমারির ধাক্কা সামলে উঠে তিনি তৃতীয়বারের মতো গাছ লাগানোর প্রয়াস চালান, কিন্তু এবার মূল সংকট হয়ে দাঁড়ায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর শুকিয়ে যাওয়া। তিনি বলেন, সর্বশেষ চেষ্টা করার সময় আমার কাছে যে টাকা ছিল, তা দিয়ে ৫০০ ফুট পর্যন্ত বোরওয়েল খনন করতে পেরেছিলাম, কিন্তু একফোঁটা পানিও পাওয়া যায়নি। সব দুর্যোগ যেন একসঙ্গে ঘটে চলছিল।
এমন একসময়ে এই বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল যখন রাজেশের আয়ের কোনো স্থায়ী উৎস ছিল না। এমনকি তীব্র আর্থিক সংকটের সময় তাকে নিজের ছেলের স্কুলের বাইরে শাকসবজিও বিক্রি করতে হয়েছে। এত প্রতিকূলতার পরও তিনি নিজেকে মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে দেননি। এই কঠিন পরিস্থিতিতে হতাশা না আসার কারণ হিসেবে তিনি আধ্যাত্মিক শক্তিকেই কৃতিত্ব দেন। রাজেশ বলেন, আধ্যাত্মিকতার কারণে আমি কখনোই বিষণ্নতা, উদ্বেগ, হতাশা বা ক্ষোভের শিকার হইনি। কোনো কিছুই আমাকে বিচলিত করতে পারেনি। কোনো কাজ সফল হচ্ছিল না আর আমি তা নিজের চোখে দেখছিলাম, কিন্তু আমার প্রচেষ্টা ও প্রক্রিয়া থামেনি। আধ্যাত্মিকতা ঠিক এটাই।
কৃষিকাজে বিনিয়োগের ফলে সৃষ্ট আর্থিক ক্ষতির মাত্রা ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। এর আগে ‘মেরি সাহেলি’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান যে, এই খাতে বিনিয়োগ করতে গিয়ে তিনি প্রায় ২ কোটি রুপির ঋণে জড়িয়ে পড়েছিলেন। তিনি বলেন, আয়ের কোনো রাস্তা ছিল না, অন্যদিকে খরচের কারণে জমা সব সঞ্চয় নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল। আমি ২ কোটি রুপির দেনায় ডুবে যাই। দেউলিয়া অনেক বড় একটি শব্দ, তবে দীর্ঘ সময় ধরে সেই অনুভূতি আমার মধ্যে ছিল। জীবনধারণের মতো টাকাও আমি তৈরি করতে পারছিলাম না। সত্যি বলতে ওটা একটি ভয়াবহ পর্যায় ছিল।
তবে বর্তমানে রাজেশের আর্থিক অবস্থার বেশ উন্নতি হয়েছে। সম্প্রতি ‘বলিউড বাবল’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অভিনেতা প্রকাশ করেছেন যে, তার সেই বিপুল পরিমাণ ঋণ কমে এখন প্রায় ২০ লাখ রুপিতে নেমে এসেছে। তিনি অত্যন্ত স্বস্তির সঙ্গে বলেন, আমি এখন সেই আর্থিক চক্রান্ত থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছি। এখন আমার মাত্র ১০ থেকে ১৫ শতাংশ ঋণ বাকি রয়েছে।
২০০০-এর দশকের অন্যতম জনপ্রিয় সিটকম ‘সারাবাই ভার্সেস সারাবাই’-তে ‘রোশেশ সারাবাই’ চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে রাজেশ কুমার ব্যাপক পরিচিত লাভ করেছিলেন। কৃষিকাজের চরম পরীক্ষার পর তিনি আবার ধীরে ধীরে রুপালি পর্দায় ফিরছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ‘সাইয়ারা’, ‘হাই জাওয়ানি তো ইশক হোনা হ্যায়’, ‘ওহ মাই ডগ’ এবং ‘নিশানচি’-র মতো একাধিক আলোচিত সিনেমা ও ডিজিটাল প্রকল্পে তার অভিনয় প্রশংসা কুড়িয়েছে।
সূত্র: এনডিটিভি
কিউএনবি/অনিমা/২৩ অগাস্ট ২০২৬,/সন্ধ্যা ৭:৩৬