আন্তর্জাতিক ডেস্ক : চলমান উত্তেজনার মধ্যেই আলোচনার জন্য ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনীতির দরজা খোলা রয়েছে বলে জানিয়েছেন সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদ আল-শাইবানি। তিনি দেশটিকে ‘ঐতিহাসিক সুযোগ’ কাজে লাগানোর আহ্বান জানিয়েছেন। রবিবার (২৩ আগস্ট) বার্তাসংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন।
নিরাপত্তা চুক্তি বিষয়ক আলোচনার ফলে সিরিয়ার ভূখণ্ড থেকে ইসরায়েল সরে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন আল-শাইবানি। তিনি জানান, ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সংঘাত শুরুর সময় নিরাপত্তা চুক্তি বিষয়ক আলোচনা স্থগিত হয়ে গিয়েছিল। আলোচনা পুনরায় শুরুর জন্য এখনও কোনো তারিখ নির্ধারণ করা হয়নি।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, দামেস্কের প্রধান অগ্রাধিকার হলো ইসরায়েলি হামলা বন্ধ করা এবং এ লক্ষ্যে পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধির পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন মিত্র সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা-র সরকার এবং ইসরায়েলের মধ্যে একটি নিরাপত্তা চুক্তি সম্পাদনের জন্য যুক্তরাষ্ট্র এক বছরেরও বেশি সময় ধরে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কোনো চুক্তি সম্ভব হয়নি, কারণ ইসরায়েল নিজেদের নিরাপত্তার প্রতি হুমকির অজুহাতে সিরিয়ার ভূখণ্ডে সৈন্য পাঠিয়েছে এবং সরকারি স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে।
আল-শাইবানি বলেন, আমরা মনে করি যোগাযোগ থাকা উচিত, বিশেষ করে এমন একটি পক্ষের সঙ্গে যারা প্রতিনিয়ত সিরিয়ার নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু যদি এই যোগাযোগ কোনো ফল না বয়ে আনে, তবে আমাদের এর প্রয়োজন নেই। বর্তমানে আমরা ইসরায়েলকে বিশ্বাস করি না।
যদিও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে কোনো সাড়া দেয়নি। আল-শারা বলেছেন, সিরিয়া অন্য কোনো দেশের জন্য হুমকি নয়; বরং ১৪ বছরের গৃহযুদ্ধের পর দেশ পুনর্গঠনের দিকেই তারা মনোযোগ দিচ্ছে। ইসরায়েলি কর্মকর্তারা সিরিয়া থেকে সম্ভাব্য বিভিন্ন ঝুঁকির কথা বলেছেন এবং গত বছর কয়েকজন কর্মকর্তা নতুন সরকারের সমালোচনাও করেছিলেন। যদিও আল-শারা ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার চেষ্টা করছিলেন।
২০২৪ সালে প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের ক্ষমতাচ্যুতির পর নাগরিকদের হামলার হাত থেকে রক্ষার অজুহাতে ইসরায়েল দক্ষিণ-পশ্চিম সিরিয়ার কিছু ভূখণ্ড দখল করে নেয়। এমনকি সিরিয়ার বহু সামরিক ঘাঁটিতে বোমা হামলা চালায়।
আল-শাইবানি বলেন, ইসরায়েল গায়ের জোরে নিজেদের নিরাপত্তা বজায় রাখার চেষ্টা করেছে, কিন্তু কোথাও তারা সফল হয়নি। আমি বিশ্বাস করি, আলোচনা শিগগিরই আবার শুরু হবে। তিনি জানান, আলোচনার টেবিলে ফিরে আসার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
আলোচনা পুনরায় শুরু হওয়া নিয়ে কতটা আশাবাদী এমন প্রশ্নের জবাবে সিরিয়ার শীর্ষ এই কর্মকর্তা বলেন, ইসরায়েলের ওপর ভরসা করা খুব কঠিন। তবে প্রতিবেশীদের সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক গড়ে তোলার বিষয়ে সিরিয়ার অত্যন্ত জোরালো আশা রয়েছে। সিরিয়া সমঝোতা, শান্তি ও কূটনীতির পাশাপাশি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে।
গত সপ্তাহে ইসরায়েল যখন আবু আল-দুহুর বিমানঘাঁটিতে বোমা হামলা চালায়, তখন সিরিয়াকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা নতুন করে সামনে আসে। ইসরায়েলের দাবি ছিল, দামেস্ক সেখানে তুর্কি বাহিনীকে মোতায়েনের অনুমতি দিতে যাচ্ছিল। সিরিয়া ও তুরস্ক উভয় দেশই এই দাবি অস্বীকার করেছে।
আল-শাইবানি বলেন, সিরিয়া ইসরায়েলের নিরাপত্তা উদ্বেগের প্রতি শ্রদ্ধাশীল; তবে ইসরায়েলকেও দামেস্কের উদ্বেগের প্রতি সম্মান দেখাতে হবে। দেশের আকাশসীমা লঙ্ঘন এবং দক্ষিণাঞ্চলে অভিযান ও ধরপাকড় চালানোর পরিবর্তে তাদের উচিত এই বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া।
তিনি জানান, চলতি বছরের শুরুর দিকে নিরাপত্তা চুক্তির বিষয়ে উভয় পক্ষ প্রায় সব কিছুতেই লিখিতভাবে সম্মত হয়েছিল। এই চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ইসরায়েলকে সিরিয়ায় হামলা বন্ধ করতে হতো এবং আল-আসাদের পতনের পর দখলকৃত এলাকা থেকে তাদের সরে আসার বিষয়টিও এর সঙ্গে যুক্ত ছিল।
ওই চুক্তিতে ইসরায়েল সীমান্তের কাছে সিরিয়ার ভূখণ্ডে কয়েকটি নিরাপত্তা অঞ্চল তৈরির কথা ছিল। এর মধ্যে একটি ‘বাফার জোন’ বা নিরপেক্ষ অঞ্চল রাখার কথা ছিল যেখানে কেবল জাতিসংঘের উপস্থিতি থাকবে। অন্য অঞ্চলগুলোতে সিরীয় বাহিনী বিভিন্ন মাত্রায় শক্তি মোতায়েন করবে। তবে তিনি বলেন, ইসরায়েল চুক্তি বাস্তবায়নের বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। চুক্তিতে পৌঁছানোর মতো প্রকৃত সদিচ্ছা তাদের মধ্যে আমরা দেখিনি।
১৯৪৮ সাল থেকেই সিরিয়া ও ইসরায়েল কার্যত যুদ্ধাবস্থায় রয়েছে। ১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধে ইসরায়েল সিরিয়ার কাছ থেকে গোলান মালভূমি দখল করে নেয়। আল-শাইবানি বলেন, এখন অগ্রাধিকার হলো নিরাপত্তা চুক্তি হওয়ার আগেই ইসরায়েলি আগ্রাসন বন্ধ করা। এরপর হয়তো আমরা শান্তি ও গোলান সংক্রান্ত বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা শুরু করতে পারব।
ইসরায়েলি কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, তারা আল-শারা সরকারের কাছে গোলান মালভূমি ফিরিয়ে দিতে ইচ্ছুক নন।সিরিয়া বিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত টম বারাক গত সপ্তাহে বলেছেন, ইসরায়েল, তুরস্ক ও সিরিয়ার মধ্যে সংঘাত রোধে একটি ব্যবস্থা বা মেকানিজম তৈরির জন্য ওয়াশিংটন কাজ করছে।
আল-শাইবানি জানান, ওই ব্যবস্থা বা মেকানিজম নিয়ে এখনো কোনো চুক্তি হয়নি। তিনি বলেন, এই ব্যবস্থার লক্ষ্য হতে হবে হামলা বন্ধ করা এবং নিরাপত্তা চুক্তির পথ সুগম করা। তিনি আরও বলেন, আবু আল-দুহুর এলাকাটি তুরস্কের কোনো ঘাঁটি হবে না, সিরিয়া এমন বার্তা দেওয়ার পরেও ইসরায়েল সেখানে বোমা হামলা চালিয়েছিল।
তিনি উল্লেখ করেন, সামরিক প্রশিক্ষণ ও সহযোগিতার ক্ষেত্রে সিরিয়া তুরস্কের সহায়তা নিয়ে থাকে; জর্ডান, সৌদি আরব এবং অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রেও বিষয়টি একই রকম। সামরিক বাহিনী পুনর্গঠনে তুরস্কের সহায়তার জন্য দামেস্ক কৃতজ্ঞ এবং আমরা এই সহায়তা থেকে সরে আসব না বলেও জানান তিনি।
সূত্র: আলজাজিরা।
কিউএনবি/অনিমা/২৩ অগাস্ট ২০২৬,/সন্ধ্যা ৭:৩০