তথ্যপ্রযুক্তি ডেস্ক : মহাকাশে হাজার হাজার কৃত্রিম উপগ্রহের অবিরাম ছুটে চলার ফলে রাতের আকাশ পর্যবেক্ষণে বিশ্বজুড়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এখন চরম চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছেন। ইউরোপিয়ান সাউদার্ন অবজারভেটরির (ইএসও) সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, কক্ষপথে নতুন করে লাখ লাখ উপগ্রহ স্থাপনের প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে মহাবিশ্ব পর্যবেক্ষণে ভয়ংকর বিপর্যয় নেমে আসবে। চিলির উত্তরাঞ্চলে বিশ্বের অন্যতম পরাক্রমশালী টেলিস্কোপ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ইএসও তাদের গবেষণায় সতর্ক করে জানিয়েছে যে, ভবিষ্যতে বিশ্বব্যাপী স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবার বিস্তৃতি মহাকাশ গবেষণার স্বাভাবিক গতিকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করবে।
বর্তমানে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের বাইরের কক্ষপথে প্রায় ১৫ হাজার সক্রিয় ও অকেজো উপগ্রহ ঘুরপাক খাচ্ছে। তবে বিভিন্ন বাণিজ্যিক ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যেই আরও ১৭ লাখেরও বেশি উপগ্রহ উৎক্ষেপণের বিশাল পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করেছে। এগুলোর মধ্যে অনেক উপগ্রহ অত্যন্ত উজ্জ্বল আলো প্রতিফলিত করে, যা রাতের আকাশে টেলিস্কোপের লেন্সে প্রতিফলিত হয়ে আলোর তীব্র ঝলক বা দাগের সৃষ্টি করে। ইউরোপীয় জার্নাল ‘অ্যাস্ট্রোনমি অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোফিজিক্স’-এ প্রকাশিত এই গবেষণার মূল রচয়িতা এবং ইএসও-র প্রখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী অলিভিয়ে হেনট জানান, প্রতিটি উপগ্রহ যখন টেলিস্কোপের দৃষ্টিসীমার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করে, তখন তা ছবির ওপর একটি উজ্জ্বল আলোকময় রেখা রেখে যায়। সাধারণ চোখে একটিমাত্র রেখা সামান্য সমস্যা মনে হতে পারে কিন্তু যখন এই রেখার সংখ্যা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে, তখন টেলিস্কোপের মাধ্যমে সংগৃহীত তথ্যের একটি বড় অংশ পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যাবে।
ইএসও’র বিজ্ঞানীরা চিলির আতাকামা মরুভূমিতে অবস্থিত পারানাল অবজারভেটরিতে সিমুলেশনের মাধ্যমে একটি মডেল তৈরি করে গবেষণাটি পরিচালনা করেন। সেখানে প্রায় ১০ লাখ উপগ্রহের সম্ভাব্য প্রভাব পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে দেখা যায়, সূর্য ডোবার ঠিক পরপরই ইএসও’র ‘ভেরি লার্জ টেলিস্কোপ’-এর ওপর হাজার হাজার আলোকময় বস্তু একসঙ্গে দৃশ্যমান হয়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই ক্ষতির পরিমাপ নির্ভর করবে মূলত কৃত্রিম উপগ্রহগুলোর মোট সংখ্যা এবং সেগুলোর উজ্জ্বলতার ওপর। অলিভিয়ে হেনটের মতে, কক্ষপথে উপগ্রহের সংখ্যা যদি এক লাখের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে সেই প্রভাব হয়তো গবেষকদের পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব হবে। কিন্তু যদি এই সংখ্যা তিন লাখে পৌঁছে যায়, তবে বিশ্বের অনেক শক্তিশালী টেলিস্কোপ তাদের গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্যের সিংহভাগ গ্রহণে ব্যর্থ হবে।
২০১৯ সাল থেকে স্পেসএক্সের ‘স্টারলিংক’ কিংবা অ্যামাজনের ‘লিও’র মতো বৈশ্বিক স্যাটেলাইট মহাকাশভিত্তিক ইন্টারনেট সেবার বদৌলতে উপগ্রহ শিল্পের অভূতপূর্ব বিস্তার ঘটেছে। গবেষকরা স্বীকার করেছেন, এই ধরনের আধুনিক ইন্টারনেট পরিষেবা বিশ্বব্যাপী যে সুবিধা তৈরি করছে তাকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। তবে প্রযুক্তিগত এই অগ্রগতি এবং মহাকাশ বিজ্ঞানের অনুসন্ধানের মধ্যে একটি বৈজ্ঞানিক ভারসাম্য বজায় রাখাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
সূত্র: রয়টার্স
কিউএনবি/অনিমা/২০ অগাস্ট ২০২৬,/বিকাল ৫:০৮