শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬, ০৮:০৪ অপরাহ্ন
শিরোনাম

ইরানের বিরুদ্ধে অস্ত্রের বদলে অর্থনৈতিক চাপ—কী হিসাব কষছে যুক্তরাষ্ট্র?

Reporter Name
  • Update Time : শনিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২৬
  • ১৯ Time View

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ইরানের ওপর সামরিক চাপের পাশাপাশি এবার অর্থনৈতিক যুদ্ধ জোরদার করছে যুক্তরাষ্ট্র। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে তেহরানকে বাধ্য করতে নিষেধাজ্ঞা, নৌ অবরোধ ও আর্থিক চাপ বাড়ানোর পথে হাঁটছে ওয়াশিংটন। তবে এর পেছনে শুধু ইরানের অর্থনীতি দুর্বল করার কৌশলই নয়, দীর্ঘদিনের সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুত কমে আসার বিষয়টিও ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন কিছু প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক।

যুক্তরাষ্ট্রের নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্টিমসন সেন্টারের ন্যাশনাল সিকিউরিটি রিফর্ম প্রোগ্রামের পরিচালক ড্যান গ্রেজিয়ার আলজাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে ইরানের ওপর যে অতিরিক্ত অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করা হচ্ছে, তা মোকাবিলা করার সক্ষমতা তেহরানের রয়েছে।

গ্রেজিয়ারের মতে, ১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের পর থেকেই ইরান যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার মধ্যে রয়েছে। কয়েক দশক ধরে নানা ধরনের কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলা করার অভিজ্ঞতা দেশটির রয়েছে। ফলে নতুন করে অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করলেই ইরান দ্রুত নতি স্বীকার করবে—এমনটা ধরে নেওয়ার কারণ নেই। তিনি বলেন, আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, প্রায় ছয় মাসের সামরিক অভিযান যে লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি, মার্কিন প্রশাসন এখন অর্থনৈতিক যুদ্ধের মাধ্যমে সেটি অর্জন করা সম্ভব হবে বলে মনে করছে।

গ্রেজিয়ার, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের মেরিন কোরের সাবেক কর্মকর্তা, মনে করেন—ওয়াশিংটনের সামরিক কৌশল থেকে অর্থনৈতিক চাপের দিকে ঝুঁকে পড়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে দীর্ঘপাল্লার অস্ত্রের মজুত নিয়ে তৈরি হওয়া চাপ। তার ভাষ্য, মার্কিন প্রশাসন অস্ত্রের মজুত নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিলেও হাতে থাকা তথ্য-প্রমাণে দেখা যাচ্ছে, দীর্ঘপাল্লার যুদ্ধ পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় ক্ষেপণাস্ত্র ও নির্ভুল নির্দেশিত গোলাবারুদের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। অথচ ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযান অনেকটাই দূরপাল্লার বিমান, ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্যান্য স্ট্যান্ড-অফ অস্ত্রনির্ভর।

এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে অস্ত্রের মজুত আরও কমিয়ে সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়া সহজ নয়। কারণ, মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে ইউরোপ ও এশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রতিশ্রুতি রয়েছে। ফলে একটি নির্দিষ্ট যুদ্ধক্ষেত্রে পুরো অস্ত্রভান্ডার ব্যবহার করে ফেলার ঝুঁকি নিতে চাইবে না পেন্টাগন।

সাম্প্রতিক সময়েও মার্কিন অস্ত্র মজুত নিয়ে এমন আলোচনা সামনে এসেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অবশ্য ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতির বিষয়টি নাকচ করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত অস্ত্রের মজুত পুনর্গঠন করছে। তিনি একই সঙ্গে দাবি করেছেন, আগের প্রশাসনের সময় ইউক্রেনকে বিপুল অস্ত্র সরবরাহের কারণে মার্কিন মজুত কমেছিল।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র এখন অর্থনৈতিক চাপকে সামরিক অভিযানের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে—এমন ইঙ্গিতও স্পষ্ট। ১৩ আগস্ট মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, ইরানের ওপর নৌ অবরোধ দীর্ঘ সময় ধরে বজায় রাখার সক্ষমতা ওয়াশিংটনের রয়েছে। একই সঙ্গে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট আরও অর্থনৈতিক চাপ ও নতুন নিষেধাজ্ঞার ইঙ্গিত দিয়েছেন। 

হরমুজই কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে হরমুজ প্রণালি। পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের মধ্যে সংযোগকারী এই জলপথ দিয়ে স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস বাণিজ্যের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবাহিত হয়। 

ফলে এর দীর্ঘস্থায়ী বন্ধ বা অচলাবস্থা শুধু ইরান নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও বড় ধরনের ধাক্কা তৈরি করতে পারে। 

ইরান এই ভৌগোলিক সুবিধাকে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কৌশলগত চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। হরমুজে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে ইরানের তেল রপ্তানি যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তেমনি বিশ্ববাজারে তেলের দাম ও সরবরাহ ব্যবস্থায় অস্থিরতা তৈরি হয়। 

ফলে তেহরানকে প্রণালি খুলতে বাধ্য করার মার্কিন প্রচেষ্টা একই সঙ্গে একটি অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের তেল রপ্তানি ঠেকাতে নৌ অবরোধ জোরদার করেছে। 

আলজাজিরার এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, হরমুজের অচলাবস্থার কারণে ইরানের তেল রপ্তানি, জ্বালানি সরবরাহ ও অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি ব্যাপক চাপে পড়েছে। দেশটিতে জ্বালানি ঘাটতি, বিদ্যুৎ সংকট এবং মূল্যস্ফীতির চাপও বেড়েছে।

তবে এই চাপ ইরানকে দ্রুত আত্মসমর্পণে বাধ্য করবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। কয়েক দশকের নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলার অভিজ্ঞতা, চীনের সঙ্গে বাণিজ্য এবং বিকল্প আর্থিক ও তেল বিক্রির নেটওয়ার্কের কারণে তেহরান দীর্ঘস্থায়ী চাপ সহ্য করার চেষ্টা করতে পারে।

সামরিক থেকে অর্থনৈতিক যুদ্ধে কেন ওয়াশিংটন

বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে মূলত দুটি ঝুঁকি। একদিকে, সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখলে ক্ষেপণাস্ত্র ও নির্ভুল গোলাবারুদের মজুতের ওপর আরও চাপ পড়বে এবং যুদ্ধের ব্যয় বাড়বে। 

অন্যদিকে, হরমুজে সরাসরি বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালিয়ে জলপথ পুরোপুরি খুলে দেওয়ার চেষ্টা করলে ইরানের পাল্টা হামলা এবং আঞ্চলিক সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

হরমুজের ভৌগোলিক অবস্থানও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। প্রণালিটি সরু এবং ইরানের উপকূল ও দ্বীপগুলো থেকে বিভিন্ন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, মাইন ও ছোট নৌযানের মাধ্যমে জাহাজ চলাচলে হুমকি তৈরি করা সম্ভব। 

ফলে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে একবার প্রণালি খুলে দিলেই দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে। 

এ কারণেই ওয়াশিংটনের কৌশলে অর্থনৈতিক চাপের গুরুত্ব বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। নিষেধাজ্ঞা ও নৌ অবরোধের মাধ্যমে ইরানের তেল আয় কমিয়ে দেওয়া গেলে সামরিক সংঘাতে না গিয়েও তেহরানের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়ানো সম্ভব—এটাই সম্ভবত মার্কিন কৌশলের অন্যতম লক্ষ্য।

তবে এর ফল কতটা কার্যকর হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। ইরানের ওপর কয়েক দশকের নিষেধাজ্ঞা দেশটির অর্থনীতিকে দুর্বল করেছে ঠিকই, কিন্তু সরকারকে নীতিগতভাবে আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে পারেনি। ফলে এবারও অর্থনৈতিক চাপ কতটা দ্রুত কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক ফল এনে দেবে, তা অনিশ্চিত।

সব মিলিয়ে, ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া, ইরানের তেল আয় কমানো এবং তেহরানকে আলোচনার টেবিলে ফেরানো এর প্রকাশ্য লক্ষ্য। 

এর পাশাপাশি দীর্ঘস্থায়ী সামরিক অভিযানে মার্কিন অস্ত্রভান্ডারের ওপর তৈরি হওয়া চাপও কৌশল পরিবর্তনের একটি কারণ হতে পারে—যদিও এটিকে এখনই যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক কৌশলের একমাত্র বা নিশ্চিত কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

 

 

কিউএনবি/আয়শা/১৫ অগাস্ট ২০২৬,/সন্ধ্যা ৬:২২

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

August 2026
M T W T F S S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit