আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এখন পঞ্চম বছরে পদার্পণ করেছে। কিন্তু থামার বদলে গত জুন থেকে যুদ্ধের তীব্রতা আরো বেড়েছে। এর দায় অবশ্য ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির। যুদ্ধ বন্ধে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে বাধ্য করতে জুন মাসে জেলেনস্কি রাশিয়ার অনেক ভেতরে বৃষ্টির মত ড্রোন হামলা চালানো শুরু করে। রাশিয়াকে দুর্বল করতে ইউক্রেন বড় তেল শোধনাগার, তেলের ট্যাঙ্কার, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সামরিক, অর্থনৈতিক অবকাঠামোতে সুনির্দিষ্ট হামলা চালায়। হামলায় ভালোই চাপে পড়ে রাশিয়া। বিশেষ করে রাশিয়ার মত তেল উৎপাদনকারী দেশেও জ্বালানি তেলের তীব্র সঙ্কট ছিল নজিরবিহীন। কিন্তু ভয়ে কাবু হওয়ার লোক নন পুতিন। ড্রোন হামলায় ক্ষতি হলেও যুদ্ধ বন্ধের বদলে আরো তীব্রভাবে পাল্টা আক্রমণ শুরু করে রাশিয়া। তাতে দুই পক্ষেই ক্ষয়ক্ষতি বেড়েছে, বিশেষ করে বেসামরিক নাগরিকদের মৃত্যু বাড়ছে।
ইউক্রেনের আক্রমণের পাল্টা হিসেবে রাশিয়াও ড্রোন হামলার পাশাপাশি ব্যাপকভাবে মিসাইল হামলা চালাচ্ছে। ইউক্রেনে রাশিয়ার ব্যাপক বিমান হামলাগুলো অত্যন্ত জটিল। ইউক্রেনীয় বিমান বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ৩০ জুন রাতে কিয়েভ ও লভিভ অঞ্চলকে লক্ষ্য করে চালানো এক হামলায় রাশিয়া বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে ৪টি জাহাজ-বিধ্বংসী মিসাইল, ৯টি ব্যালিস্টিক মিসাইল, ৬১টি ক্রুজ মিসাইল এবং প্রায় ৩০০টি ড্রোন ব্যবহার করে।
এরমধ্যে রাশিয়ার ব্যালিস্টিক মিসাইলগুলোই ইউক্রেনের নেতৃত্বের জন্য সবচেয়ে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রাণঘাতী ব্যালিস্টিক মিসাইল ঠেকানোর সক্ষমতা কমে আসছে ইউক্রেনের। রাশিয়াও এটা জানে। ইউক্রেনের প্রতিরক্ষার এই দুর্বলতা ধরেই আক্রমণের ছক সাজাচ্ছেন পুতিন। ব্যালিস্টিক মিসাইল ঠেকাতে চাই আমেরিকার তৈরি প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর। কিন্তু এই প্যাট্রিয়টের সরবরাহে মারাত্মক ঘাটতি দেখা দিয়েছে। ইরান যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের প্যাট্রিয়টের স্টক অর্ধেকে নেমে এসেছে। নিজেদের যুদ্ধ ফেলে ইউক্রেনকে আগের মত প্যাট্রিয়ট সরবরাহ করা আমেরিকার পক্ষেও সম্ভব নয়। গত জুনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জেলেনস্কিকে প্যাট্রিয়ট তৈরির লাইসেন্স দেয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু সে অবস্থান থেকে পিছিয়ে এসেছেন ট্রাম্প। রাশিয়ার ড্রোন মোকাবেলায় ইউক্রেন কিছুটা দক্ষতা অর্জন করলেও ব্যালিস্টিকের সামনে ইউক্রেন সত্যিই অসহায়।
ব্যালিস্টিক ঠেকাতে প্যাট্রিয়টের জন্য ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির হাহাকার তাই তীব্র হচ্ছে। বুধবার এক বিবৃতিতে জেলেনস্কি আরও ইন্টারসেপ্টর সরবরাহের জন্য সহযোগীদের প্রতি আকুল আবেদন জানিয়ে বলেছেন, ’ব্যালিস্টিক মিসাইল ঠেকাতে ইন্টারসেপ্টরগুলো আজ যারা নিহত হয়েছেন তাদের জীবন বাঁচাতে পারতো। আমাদের সহযোগীদের এটি বোঝা অত্যন্ত জরুরি যে, এগুলো সরবরাহে বিলম্ব করা অথবা অ্যান্টি-ব্যালিস্টিক সিস্টেম দিতে অনীহা প্রকাশ করার সরাসরি ফল হলো এই ধরনের ভয়াবহ হতাহত এবং ধ্বংসযজ্ঞ প্রত্যক্ষ করা। যেসব সহযোগী দেশ এখনও ইন্টারসেপ্টর সরবরাহে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে প্রস্তুত নয়, তারা নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে সাহায্য করতে পারে। রাশিয়ার ব্যালিস্টিক মিসাইল উৎপাদনের একটি বড় অংশ এখনও কোনো নিষেধাজ্ঞার আওতায় নেই।’
রাশিয়ার বর্তমান হামলার ধরন তিনটি- ব্যালিস্টিক মিসাইল, ক্রুজ মিসাইল এবং ড্রোন। এসব হামলার অধিকাংশই রাশিয়ার ভেতর থেকে বা ইউক্রেনের রুশ-অধিকৃত অঞ্চল থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়। যুদ্ধক্ষেত্রের সম্মুখ সারির কাছাকাছি এলাকাগুলোতে, রুশ বাহিনী ইউক্রেনের বেসামরিক এলাকাগুলোকে আতঙ্ক ছড়াতে তুলনামূলক ছোট ড্রোন ব্যবহার করছে। এই ড্রোনগুলো তুলনামূলকভাবে সস্তা এবং প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। রাশিয়া ইরানি নকশার শাহেদ ড্রোনের একটি সংস্করণ ‘গেরান-২’ ব্যাপক হারে তৈরি করছে। তবে তুলনামূলকভাবে ধীরগতির ড্রোনের বিরুদ্ধে ইউক্রেনের একটি বহুমাত্রিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে। ইউক্রেন ইতিমধ্যেই রাশিয়ান ড্রোন মোকাবেলায় তার দক্ষতা ও উদ্ভাবনী ক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে।
ক্রুজ মিসাইলগুলো সাধারণত একটি ড্রোনের চেয়ে অনেক বড় যুদ্ধাস্ত্র বহন করে। জেট ইঞ্জিন দ্বারা চালিত এই মিসাইলগুলো রাডার ফাঁকি দেওয়ার জন্য সাধারণত মাটির খুব কাছ দিয়ে উড়তে পারে। ‘মিসাইল ডিফেন্স অ্যাডভোকেসি অ্যালায়েন্স’-এর তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়ার যুদ্ধজাহাজ এবং সাবমেরিন থেকে উৎক্ষেপিত ক্রুজ মিসাইল ‘কালিব্র’ সমুদ্রপৃষ্ঠের মাত্র ২০ মিটার বা ভূপৃষ্ঠের ৫০ মিটার ওপর দিয়ে উড়ে যেতে পারে।
তবে পুতিনের হাতে তুরুপের তাস হলো ব্যালিস্টিক মিসাইল। এই মিসাইলের গতি এবং গতিপথ সম্পূর্ণ আলাদা। রকেট ইঞ্জিন দ্বারা চালিত এই মিসাইলটি তার লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার আগে একটি উঁচু ধনুকের মতো বৃত্তাকার পথ অনুসরণ করে। এর পাল্লা বা দূরত্বের ভিন্নতা থাকলেওেএর গতি দূরন্ত। রাশিয়ার স্বল্পপাল্লার ‘ইস্কান্দার’ ব্যালিস্টিক মিসাইল শব্দের চেয়ে ছয় থেকে সাত গুণ গতিতে উড়তে পারে এবং এটি ৭০০ কিলোগ্রাম পর্যন্ত বিস্ফোরক বহন করতে পারে। একটি দূরপাল্লার আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রাশিয়া থেকে সুমেরু বৃত্ত পার হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে ৩০ মিনিটেরও কম সময়ে। কিয়েভে সাম্প্রতিক হামলাগুলোর সময় দেখা গেছে, বিমান হামলার সাইরেন বাজার সাথে সাথেই বিস্ফোরণ ঘটেছে। রাশিয়া এবার ইউক্রেনের বিরুদ্ধে কয়েকবার ‘ওরে্পনিক’ নামে একটি মধ্যম পাল্লার হাইপারসনিক মিসাইলও ব্যবহার করেছে। তবে রুশ সামরিক বাহিনীর প্রধান ভরসা হিসেবে কাজ করছে ইস্কান্দারের মতো স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক মিসাইলগুলো। ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের মতে, রুশ বাহিনী ইউক্রেনের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার জন্য তাদের ‘এস-৪০০’ বিমান-প্রতিরক্ষা মিসাইলকেও ব্যালিস্টিক মিসাইল হিসেবে পুনর্ব্যবহার করেছে।
এছাড়া রাশিয়ার অস্ত্রাগারে উত্তর কোরিয়ার ব্যালিস্টিক মিসাইল যুক্ত হওয়ার খবর ইউক্রেনের দুশ্চিন্তাকে আরো বাড়িয়েছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের দূত ভ্লাদিস্লাভ ভ্লাসিউক জানিয়েছেন, ইউক্রেন উত্তর কোরিয়ার একটি কেএন-২৩ মিসাইল শনাক্ত করেছে, যা রাশিয়ার ইস্কান্দার মিসাইলের সমকক্ষ। মিসাইলটি সম্প্রতি ডিনিপ্রোপেত্রোভস্ক অঞ্চলের গ্রামীণ এলাকা রাদুনো-র একটি বাড়ি ধ্বংস করে দিয়েছে, যার ফলে তিন শিশুসহ ছয়জন নিহত হয়েছে এবং হামলার পর আরও ৫ শিশু এখনও নিখোঁজ রয়েছে।
কেএন-২৩ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘এটি কার্যত রাশিয়ান ইস্কান্দারের একটি হুবহু প্রতিরূপ। এমনকি এগুলোতে পশ্চিমা প্রযুক্তিতে তৈরি যন্ত্রাংশসহ একই ধরনের উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে। উত্তর কোরিয়ার সামরিক সহায়তার ওপর রাশিয়ার নির্ভরশীলতার এটি একটি অন্যতম উদাহরণ। রাশিয়ার মিসাইলগুলোর মতোই উত্তর কোরিয়ার মিসাইলগুলোও ইউক্রেনের বেসামরিক নাগরিকদের হত্যা করছে।’
ইউক্রেনে সাম্প্রতিক এক গবেষণা সফর শেষে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এর একটি পোস্টে সামরিক বিশ্লেষক দারা মাসিকোট বলেন, ’ব্যালিস্টিক মিসাইল প্রতিরোধ করা এখনও একটি কঠিন সমস্যা। প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টরের সমস্যাগুলো সবার জানা। ইউক্রেনও জানে কী করতে হবে।
তিনি বলেন, ’আমার মতে এখন ইউক্রেনের জন্য ‘প্ল্যান বি’ এবং ‘প্ল্যান সি’ নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। কীভাবে রাশিয়ার মিসাইল ছোঁড়ার সক্ষমতা কমানো যায়, তা নিয়ে ভাবতে হবে।’
তবে ইউক্রেনের ভাবনার জন্য তো রাশিয়া বসে থাকবে না। ইউক্রেন যখন প্ল্যান বি বা সি নিয়ে ভাববে, ততক্ষণে রাশিয়ার ব্যালিস্টিক মিসাইল তাদের দেশের যেখানে সেখানে হামলা চালিয়ে ছাড়খাড় করে দেবে।
কিউএনবি/অনিমা/০৮ অগাস্ট ২০২৬,/সকাল ১১:৪৩