শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২:১৫ অপরাহ্ন

একটি বল, কোটি মানুষের বিশ্বাস

Reporter Name
  • Update Time : সোমবার, ১৩ জুলাই, ২০২৬
  • ৫০ Time View

স্পোর্টস ডেস্ক : মসজিদে আজান হয়। গির্জার ঘণ্টা বাজে, মন্দিরে পূজার ঘণ্টাধ্বনি শোনা যায়। পৃথিবীর নানা প্রান্তে মানুষ নিজের বিশ্বাসের জায়গায় ছুটে যায়। আরেকটি জায়গায়ও লাখো মানুষ আবেগ নিয়ে জড়ো হয়। সেখানে কোনো ধর্মগ্রন্থ, উপাসনালয় নেই। আছে একটি সবুজ মাঠ, বল, দুটি গোলপোস্ট আর বুকভরা বিশ্বাস। ফুটবল হয়ে ওঠে বিশ্বাস, পরিচয় আর অনেকের কাছে প্রায় ধর্মের মতো।

বিশ্বের আর কোন খেলাই এমন ক্ষমতা রাখে না।একটি গোলের জন্য মানুষ প্রার্থনা করে। ম্যাচের আগে একই জার্সি পরে। কেউ সৌভাগ্যের তাবিজ সঙ্গে রাখে। কেউ বিশ্বাস করে, নির্দিষ্ট একটি নিয়ম না মানলে দল হেরে যাবে। যুক্তি অনেক আগেই হার মেনে বসে। জায়গা করে নেয় বিশ্বাস। বিজ্ঞান দিয়ে ব্যাখ্যা সব সময় দেওয়া যায় না, আবেগ দিয়ে যার অর্থ বোঝা যায়।

ব্রাজিলে ফুটবলকে বলা হয় মানুষের দ্বিতীয় ভাষা। রিও ডি জেনেইরোর বস্তি থেকে সাও পাওলোর ব্যস্ত রাস্তায় একটি বল মানুষের জীবন বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেখায়। পেলের দেশ, গারিঞ্চার দেশ, জিকোর দেশ, রোনালদোদের দেশ বিশ্বাস করে, ফুটবল তাদের জাতীয় পরিচয়ের অংশ। পাঁচটি বিশ্বকাপ ট্রফি জাতির আত্মবিশ্বাসের প্রতীক। মারাকানার কান্না তাদের ইতিহাসের অংশ।

আর্জেন্টিনায় ফুটবল দিয়েগো ম্যারাডোনা শুধু কিংবদন্তি নন, আবেগের নাম। লিওনেল মেসির হাতে ২০২২ সালে বিশ্বকাপ ওঠার পর লাখো মানুষের কান্না ছিল শুধু শিরোপা জয়ের আনন্দ নয়। ছিল তিন দশকের অপেক্ষার অবসান, একটি জাতির দীর্ঘশ্বাসের মুক্তি। সেই রাতে বুয়েনস এইরেসে মানুষ নিজেদের হারানো বিশ্বাস ফিরে পেয়েছিল।

মরক্কো দেখিয়েছে, ফুটবল একটি দেশের সীমানার মধ্যেও আটকে থাকে না। ২০২২ বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে উঠে পুরো আফ্রিকা ও আরব বিশ্বের স্বপ্ন হয়ে উঠেছিল। প্রতিটি জয় ছিল লাখো মানুষের আত্মমর্যাদার জয়। প্রতিটি গোলের পর উড়েছিল একটি অঞ্চলের আশা। ইংল্যান্ডে ফুটবল ইতিহাস, সংস্কৃতি আর দৈনন্দিন জীবনের অংশ। শত বছরের ক্লাব সংস্কৃতি, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে দলের প্রতি ভালোবাসা, প্রতিটি ম্যাচকে উৎসবে পরিণত করেছে। ‘ফুটবল ইজ কামিং হোম’ বাক্যের মধ্যেই লুকিয়ে আছে অর্ধশতাব্দীর অপেক্ষা, ব্যর্থতা, আশা আর অটুট বিশ্বাস।

বিশ্বকাপে বাংলাদেশ খেলে না। বিশ্বকাপ এলেই বদলে যায় দেশের চেহারা। ছাদে ছাদে উড়ে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি কিংবা অন্য দেশের পতাকা। গ্রামের মেঠোপথ থেকে রাজধানীর উড়ালসেতু পর্যন্ত ফুটবলের রঙে রঙিন হয়ে ওঠে চারপাশ। রাতভর জেগে খেলা দেখে মানুষ। পরদিন অফিসে, বিশ্ববিদ্যালয়ে, চায়ের দোকানে চলে ম্যাচ বিশ্লেষণ। জয়-পরাজয় নিয়ে তর্ক হয়, হাসি হয়, অভিমান হয়। বিদেশি দলের জয়ের জন্যও মানুষ আনন্দে কাঁদে, পরাজয়ে মন খারাপ করে। বিশ্বকাপের রাতে বাংলাদেশের অনেক পরিবারে একসঙ্গে বসে খেলা দেখা একটি পারিবারিক উৎসব। বাবা ছেলেকে বোঝান অফসাইডের নিয়ম। দাদা শোনান পেলে কিংবা ম্যারাডোনার গল্প। বন্ধুরা রাত জেগে একই পর্দার সামনে বসে থাকে। একটি গোলের পর পুরো পাড়া জেগে ওঠে। 

ফুটবল তখন দূরের কোনো দেশের খেলা থাকে না, হয়ে ওঠে নিজের জীবনেরও একটি অংশ। এটাই ফুটবলের বিস্ময়।কীভাবে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের মানুষের হৃদয়ে নিজের জন্য জায়গা তৈরি করে, তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ বাংলাদেশ। ফুটবলের এই শক্তি শুধু ৯০ মিনিটে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষকে একত্র করে। অচেনা মানুষকে আপন করে। ভাষা, ধর্ম, বর্ণ, রাজনীতি ,সামাজিক বিভাজনের ওপরে তৈরি করে সমর্থক।

স্টেডিয়ামে পাশের মানুষটি কোন ধর্মের, কোন দেশের, কোন পেশার তা জানার দরকার হয় না। গোলের পর দুজন মানুষ একে অন্যকে জড়িয়ে ধরেন। সেই আলিঙ্গনের কোনো ভাষা নেই। আছে শুধু অনুভূতি। বিশ্বকাপের ৩৯ দিনেপৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ একই গল্পের অংশ হয়ে যায়। একই সঙ্গে হাসি, কান্না, প্রার্থনার এমন অভিজ্ঞতা পৃথিবীতে খুব কম ঘটনাই তৈরি করতে পারে।

ফুটবল ধর্ম নয়। বিশ্বাসব্যবস্থার বিকল্পও নয়। মানুষের আবেগকে যেভাবে এক সুতোয় গেঁথে ফেলে। কোটি মানুষকে একই মুহূর্তে হাসায়, কাঁদায়, প্রার্থনা করায় এবং স্বপ্ন দেখায়। বিশ্বকাপের শেষ বাঁশি বাজবে।নিভে  যাবে আলো।গ্যালারি ফাঁকা হবে।ট্রফি চলে যাবে নতুন চ্যাম্পিয়নের হাতে। মানুষের বিশ্বাস শেষ হয় না। একটি শিশু আবার বল নিয়ে মাঠে নামবে।কেউ নতুন জার্সি কিনবে। কেউ পুরোনো ম্যাচের ভিডিও দেখবে। কেউ দেয়ালে টাঙিয়ে রাখবে প্রিয় খেলোয়াড়ের ছবি। আবার চার বছরের অপেক্ষা শুরু হবে।

 

 

কিউএনবি/আয়শা/১৩ জুলাই ২০২৬,/বিকাল ৪:০০

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

October 2026
M T W T F S S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
27282930  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit