বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই ২০২৬, ০৭:৪৫ অপরাহ্ন
শিরোনাম
১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারে দাম কমল ৩৫৭ টাকা সাগরে লঘুচাপ, সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর সতর্কতা সংকেত সামাজিক মাধ্যমে অপপ্রচার কঠোরভাবে দমন করা হবে : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এইচএসসির প্রথম দিনে অনুপস্থিত ২৪৭৮৪ শিক্ষার্থী, বহিষ্কার ৭ হজের জন্য প্রাক-নিবন্ধন শুরু : যেসব তথ্য দিতে বলেছে ধর্ম মন্ত্রণালয় ইসলাম সর্বকালের সর্বাধুনিক ও চিরন্তন জীবনব্যবস্থা কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রেরণার উৎস : প্রধানমন্ত্রী মেক্সিকোর বিপক্ষে হারলেও ‘চিন্তা নেই’ ইংল্যান্ড কোচ টুখেলের, তৈরি আছে ‘অজুহাত’ মেসিকে চিঠি লিখে বিশ্বকাপে যাওয়ার সুযোগ পেল ছোট্ট মানু সমুদ্রবন্দরে তিন নম্বর সংকেত, গভীর সাগরে যেতে মানা

ভারত সফরে গিয়ে মস্তিষ্কে ৩৮ পরজীবী নিয়ে ফিরলেন নারী, অতঃপর…

Reporter Name
  • Update Time : বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই, ২০২৬
  • ২০ Time View

আন্তর্জাতিক ডেস্ক  : নাম তার লাওরি ডেনম্যান। যুক্তরাজ্যের নাগরিক। ২০০৭ সালে গিয়েছিলেন ভারত সফরে। সেখান থেকে ফিরে প্রথমে শরীরে কোনও অস্বাভাবিকতা টের পাননি তিনি। কিন্তু কয়েক বছর পর একদিন টয়লেটে গিয়ে প্রায় এক মিটার দীর্ঘ একটি ফিতাকৃমি (টেপওয়ার্ম) দেখতে পান লাওরি। সেই ভয়ংকর অভিজ্ঞতার পর শুরু হয় তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়। পরে চিকিৎসকেরা জানতে পারেন, তার মস্তিষ্কে বাসা বেঁধেছে ৩৮টি পরজীবী, যা থেকে সৃষ্টি হয়েছে বিরল রোগ নিউরোসিস্টিসারকোসিস।

৪২ বছর বয়সী লাওরি ডেনম্যান যুক্তরাজ্যের ওয়েলসের কারমার্থেন এলাকার বাসিন্দা। দীর্ঘ চিকিৎসা ও মানসিক সংগ্রামের পর তিনি এখন অনেকটাই সুস্থ। নিজের এই অভিজ্ঞতার মাধ্যমে বিরল এ রোগ সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতে চান তিনি।

ভারত সফরে সংক্রমণের আশঙ্কা
লাওরি ২০০৭ সালে তিন মাসের জন্য ভারত ভ্রমণে যান। তার সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. ব্রেন্ডন হিলির ধারণা, ওই সফরেই তিনি সংক্রমিত হন।

ভ্রমণের সময় খাদ্যে বিষক্রিয়া এড়াতে তিনি মাংস খাওয়া বন্ধ রেখেছিলেন। তবে চিকিৎসকের মতে, অজান্তেই তিনি এমন কোনও খাবার খেয়েছিলেন যাতে শূকরের ফিতাকৃমির অতি ক্ষুদ্র ডিম ছিল।

তিন বছর পর প্রথম লক্ষণ
সংক্রমণের প্রায় তিন বছর পর, ২০১০ সালে, একটি রেস্তোরাঁর টয়লেটে গিয়ে তিনি প্রায় এক মিটার লম্বা একটি ফিতাকৃমি (টেপওয়ার্ম) দেখতে পান।

লাওরি বলেন, “দেখতে এটি ছিল অত্যন্ত ভয়ংকর। স্বচ্ছ সেলোটেপের মতো, যার গায়ে ছোট ছোট খাঁজ ছিল।”

তিনি বিষয়টি গুরুত্ব না দিয়ে কৃমিটিকে ফ্লাশ করে দেন। পরে চিকিৎসকের কাছে গেলে মল পরীক্ষায় কোনও সমস্যা ধরা পড়ে না। তখন তিনি সুস্থ থাকায় স্বাভাবিক জীবনযাপন চালিয়ে যান।

মাথাব্যথা, খিঁচুনি এবং ভয়াবহ সত্য
এর এক বছরের মধ্যে লাওরির তীব্র মাথাব্যথা শুরু হয়। এরপর ২০১১ সালে প্রথমবারের মতো খিঁচুনিতে আক্রান্ত হন তিনি। লাওরি বলেন, “আমি ঠিকমতো কথা বলতে পারছিলাম না। এরপর যখন জ্ঞান ফিরল, দেখি আমি অ্যাম্বুলেন্সে। বুঝতেই পারছিলাম না কী ঘটেছে।”

হাসপাতালে সিটি স্ক্যান ও এমআরআই করার পর চিকিৎসকেরা তাকে ডেকে জানান, তার মস্তিষ্কে ৩৮টি পরজীবী রয়েছে।

লাওরি বলেন, “ডাক্তার যখন বললেন আমার মস্তিষ্কে ৩৮টি পরজীবী পাওয়া গেছে, তখন আমি আর আমার মা হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম।”

প্রথমে চিকিৎসকেরা ধারণা করেছিলেন, এটি টক্সোপ্লাজমোসিস হতে পারে। পরে তার মা আগের বছরের ফিতাকৃমির (টেপওয়ার্ম) ঘটনার কথা চিকিৎসকদের জানালে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর নিশ্চিত হওয়া যায়, তিনি নিউরোসিস্টিসারকোসিসে আক্রান্ত।

কী এই নিউরোসিস্টিসারকোসিস?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্যানুযায়ী, শূকরের ফিতাকৃমির ডিম শরীরে প্রবেশ করলে এই রোগ হতে পারে। সাধারণত অপর্যাপ্তভাবে রান্না করা শূকরের মাংস, দূষিত খাবার বা পানি এবং অপরিচ্ছন্নতার মাধ্যমে এই সংক্রমণ ঘটে।

এই রোগ যুক্তরাজ্যে অত্যন্ত বিরল। সাধারণত যেসব অঞ্চলে রোগটি বেশি দেখা যায়, সেখান থেকে আসা মানুষের মধ্যেই এ ধরনের সংক্রমণ ধরা পড়ে।

দীর্ঘ চিকিৎসা ও নতুন বিপর্যয়
লাওরিকে দুই সপ্তাহ হাসপাতালে রেখে পরজীবীনাশক ওষুধ এবং স্টেরয়েড দেওয়া হয়। প্রথমদিকে চিকিৎসায় ভালো ফলও পাওয়া যায়।

পরবর্তী কয়েক বছর তিনি স্বাভাবিক জীবনযাপন করেন। নিউজিল্যান্ড ভ্রমণ করেন, ব্রিস্টলে বসবাস শুরু করেন, সার্কাস প্রশিক্ষণ নেন এবং হাফ ম্যারাথনেও অংশ নেন। কিন্তু এরপর একদিন হঠাৎ কর্মস্থলে তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়েন।

পরবর্তী স্ক্যানে দেখা যায়, মস্তিষ্কে পরজীবীগুলোর চারপাশে ব্যাপক ফোলাভাব সৃষ্টি হয়েছে।

এরপর তিনি বিভ্রান্তিতে ভুগতে থাকেন, শরীর অবশ হয়ে আসতে থাকে এবং হাত-পায়ে ঝিনঝিনি অনুভব করেন।

মানসিক স্বাস্থ্যেও ভয়াবহ প্রভাব
অবস্থা খারাপ হওয়ায় চাকরি ছেড়ে বাবার বাড়িতে ফিরে যেতে বাধ্য হন লাওরি। দীর্ঘদিন স্টেরয়েড সেবনের ফলে তার শারীরিক গঠনও বদলে যায়। একপর্যায়ে তিনি গভীর হতাশা, উদ্বেগ, আতঙ্ক এবং সাইকোসিসে আক্রান্ত হন।

তিনি ছয় সপ্তাহ একটি নিউরোসাইকিয়াট্রিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।

তার ভাষায়, “আমার মধ্যে প্রবল সন্দেহপ্রবণতা, আতঙ্ক আর মানসিক বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল। আমি পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিলাম।’

বন্ধুর চোখে ভয়াবহ পরিবর্তন
লাওরির দীর্ঘদিনের বন্ধু নিকোলা ব্রাউন বলেন, এক মাস পর তাকে দেখতে গিয়ে তিনি যেন সম্পূর্ণ অন্য একজন মানুষকে দেখেছিলেন।

তিনি বলেন, “ঘরে ঢুকে দেখি সে ছোট শিশুর মতো আচরণ করছে। কখনও মেঝেতে হামাগুড়ি দিচ্ছে, কখনও পর্দার আড়ালে লুকাচ্ছে, আবার বাবার কোলে বসে আছে।”

পরে লাওরি তাকে বার্তা পাঠিয়ে লিখেছিলেন, “আজ রাতে আমাকে টেলিভিশনের খবরে দেখবে। পুলিশ আমাকে খুঁজছে।”

ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফেরা
হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পরও সুস্থ হতে দীর্ঘ সময় লেগেছে তার।
পরে তিনি কারমার্থেনে চারুকলার একটি কোর্স সম্পন্ন করেন। ২০১৮ সালে আবার কার্ডিফে ফিরে ইন্টেরিয়র ডিজাইনে উচ্চশিক্ষা নেন এবং ২০২২ সালে কর্মজীবনে ফিরে আসেন।

চিকিৎসকের ভাষায় ‘বিরলতম রোগী’
লাওরির চিকিৎসক ডা. ব্রেন্ডন হিলি বলেন, তার পুরো কর্মজীবনে এমন রোগী তিনি আর দেখেননি।

তার মতে, “আমার কর্মজীবনে এ ধরনের ঘটনা এটাই প্রথম। যুক্তরাজ্যের অধিকাংশ সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞও হয়তো পুরো ক্যারিয়ারে এমন রোগী কখনও দেখবেন না।”

তিনি জানান, লাওরির শরীরে থাকা সব পরজীবী চিকিৎসার মাধ্যমে ধ্বংস করা হয়েছে। বর্তমানে সেগুলো মস্তিষ্কে ক্যালসিফাইড বা নিষ্ক্রিয় অবস্থায় রয়েছে।

এখন সচেতনতা ছড়িয়ে দিতে চান লাওরি
২০১৭ সালের পর থেকে লাওরির আর কোনও খিঁচুনি হয়নি। তবে তাকে সারাজীবন মৃগীরোগের ওষুধ খেতে হবে।

বর্তমানে কার্ডিফে বসবাসকারী লাওরি বলেন, “আমি চাই আমার এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা থেকে অন্তত মানুষ শিক্ষা নিক। এই রোগ সম্পর্কে সচেতনতা ছড়িয়ে দিতে চাই, যাতে অন্য কেউ এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি না হন।”

তিনি বলেন, “জীবনে কখন কী ঘটবে কেউ জানে না। আবার সুস্থভাবে বেঁচে থাকতে পারছি- এ জন্য আমি খুব খুশি। তবে আমি এটাকে কখনও হালকাভাবে নিই না।” সূত্র: বিবিসি

কিউএনবি/অনিমা/০২ জুলাই ২০২৬,/দুপুর ২:৫৬

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

July 2026
M T W T F S S
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit