মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬, ০৩:২০ অপরাহ্ন

ইসলাম সর্বকালের সর্বাধুনিক ও চিরন্তন জীবনব্যবস্থা

Reporter Name
  • Update Time : বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই, ২০২৬
  • ৬৮ Time View

ডেস্ক নিউজ : মানবসভ্যতায় মানুষের প্রয়োজনে যুগে যুগে নানা আইন, মতবাদ ও শাসনব্যবস্থা তৈরি হয়েছে। কিন্তু মানুষের তৈরি প্রতিটি ব্যবস্থার মধ্যেই সীমাবদ্ধতা, স্বার্থ, পক্ষপাত ও পরিবর্তনের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। কারণ মানুষ সীমিত জ্ঞানের অধিকারী।

পক্ষান্তরে মহান আল্লাহর বিধান কোরআন এমন এক জীবনব্যবস্থা, যা মানুষের নিকট স্রষ্টার পক্ষ থেকে নাজিল হয়েছে। তাই এতে রয়েছে পূর্ণতা, ভারসাম্য, ন্যায়বিচার ও সর্বযুগে প্রযোজ্য সমাধান। এ কারণেই কোরআনের/ইসলামের আইন কেবল প্রাচীন/মধ্যযুগীয় কোনো ধর্মীয় বিধান নয়; বরং এটি সর্বকালের সর্বাধুনিক, বাস্তবমুখী ও মানবকল্যাণমূলক আইনব্যবস্থা।

মহান আল্লাহ কোরআনকে মানবজাতির জন্য পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান হিসেবে ঘোষণা করেছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বিনকে পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের ওপর আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের জন্য দ্বিন হিসেবে পছন্দ করলাম ইসলামকে।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ৩)

এই আয়াত প্রমাণ করে ইসলামের বিধান অসম্পূর্ণ বা অচল নয়; বরং মানবজীবনের জন্য পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত নির্দেশনা। আধুনিক বিশ্বে মানুষ এখনো ন্যায়বিচার, মানবাধিকার, অর্থনৈতিক ভারসাম্য, পারিবারিক স্থিতি ও সামাজিক শান্তির জন্য সংগ্রাম করছে। অথচ কোরআন দেড় হাজার বছর আগেই এসব বিষয়ের মৌলিক নীতিমালা নির্ধারণ করে দিয়েছে।

কোরআনের আইনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এটি মানুষের প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আধুনিক সভ্যতা যখন পরিবারব্যবস্থার সংকট, নৈতিক অবক্ষয় ও মানসিক অশান্তিতে বিপর্যস্ত, তখন কোরআন পরিবার, সমাজ ও ব্যক্তিজীবনে ভারসাম্যের শিক্ষা দেয়।

আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ইনসাফ, সদাচার ও নিকটাত্মীয়দের দান করার আদেশ দেন এবং তিনি অশ্লীলতা, মন্দ কাজ ও সীমা লঙ্ঘন থেকে নিষেধ করেন। তিনি তোমাদেরকে উপদেশ দেন, যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ করো। (সুরা : নাহল, আয়াত : ৯০)

এই আয়াতে মহান আল্লাহ ইসলামী সভ্যতার মৌলিক সাংবিধানিক নীতিগুলো বলে দিয়েছেন। এতে ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও সামাজিক ভারসাম্যের এমন সর্বজনীন শিক্ষা রয়েছে, যা সর্বকালের জন্য প্রযোজ্য। বর্তমান যুগের আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মূল আকাঙ্ক্ষাও বলা যেতে পারে।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও কোরআনের বিধান অত্যন্ত আধুনিক ও মানবকল্যাণমুখী। সুদভিত্তিক অর্থনীতি আজ বৈশ্বিক বৈষম্য, ঋণের বোঝা ও আর্থিক অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। অথচ কোরআন সুদকে নিষিদ্ধ করে ন্যায্য বণ্টন ও মানবিক অর্থনীতির শিক্ষা দিয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ২৭৫)

বর্তমানে ইসলামী ব্যাংকিং ও সুদমুক্ত অর্থব্যবস্থা বিশ্বজুড়ে বিকল্প অর্থনৈতিক মডেল হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে। এটি কোরআনের আইনের আধুনিকতা ও কার্যকারিতার বাস্তব প্রমাণ। ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের তথ্যমতে, গত এক দশকে ইসলামী অর্থনীতি শিল্প দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে; প্রতিবছর এর প্রবৃদ্ধির হার ছিল ১০-১২ শতাংশ।

এ ছাড়া মানবাধিকারের ক্ষেত্রেও কোরআন সবচেয়ে যুগান্তকারী দিকনির্দেশনা দিয়েছে। জাতি, বর্ণ, ভাষা বা গোত্রের ভিত্তিতে শ্রেষ্ঠত্বকে ইসলাম প্রত্যাখ্যান করেছে। আল্লাহ বলেন, ‘হে মানুষ, আমি তোমাদের এক নারী ও এক পুরুষ থেকে সৃষ্টি করেছি আর তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি। যাতে তোমরা পরস্পর পরিচিত হতে পার। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সেই অধিক মর্যাদাসম্পন্ন, যে তোমাদের মধ্যে অধিক তাকওয়াসম্পন্ন। নিশ্চয়ই আল্লাহ তো সর্বজ্ঞ, সম্যক অবহিত।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১৩)

সাম্যের এই ঘোষণা আধুনিক মানবাধিকার সনদের বহু আগেই কোরআন দিয়েছে। বিদায় হজের ভাষণে মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘হে লোক সকল! শোনো, তোমাদের প্রতিপালক এক, তোমাদের পিতা এক। শোনো, আরবির ওপর অনারবির এবং অনারবির ওপর আরবির, কৃষ্ণকায়ের ওপর শ্বেতকায়ের এবং শ্বেতকায়ের ওপর কৃষ্ণকায়ের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা নেই। শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা আছে তো শুধু তাকওয়ার কারণেই।’ (মুসনাদে আহমাদ : ২৩৪৮৯, শুআবুল ঈমান, বাইহাকি : ৫১৩৭)

কোরআনের আইন শুধু আধ্যাত্মিক বিষয় নয়; বরং বাস্তবসম্মত জীবনব্যবস্থা । এতে ব্যক্তিগত ইবাদত থেকে শুরু করে রাষ্ট্রনীতি, বিচারব্যবস্থা, যুদ্ধনীতি, নারী অধিকার, উত্তরাধিকার, ব্যবসা-বাণিজ্য, পরিবেশ ও সামাজিক সম্পর্ক পর্যন্ত সব বিষয়ে নির্দেশনা রয়েছে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘আমি এ কিতাবে কোনো কিছুই অবহেলা করিনি।’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ৩৮)

তাফসিরবিদদের মতে, এই আয়াতে উল্লিখিত ‘কিতাব’-এর এক অর্থ লওহে মাহফুজ। আর আরেক অর্থ হলো কোরআন। যাতে সূক্ষ্মভাবে দ্বিনের প্রতিটি বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে।

অতএব, যারা তাদের জীবন পরিচালনায় সে পথের অনুসরণ করবে, তারাই সঠিক ও সরল পথে দিশা পাবে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই এ কোরআন এমন একটি পথ দেখায়, যা সবচেয়ে সরল এবং যে মুমিনরা নেক আমল করে তাদেরকে সুসংবাদ দেয় যে তাদের জন্য রয়েছে মহাপুরস্কার।’

(সুরা : বনি ইসরাঈল, আয়াত : ৯)

মানব রচিত আইনের ঘনঘন পরিবর্তন, সামাজিক অস্থিরতা ও নৈতিক সংকট প্রমাণ করে যে মানুষের তৈরি আইন চূড়ান্ত সমাধান দিতে সক্ষম নয়। কিন্তু কোরআনের মূলনীতি অপরিবর্তনীয় হলেও এর প্রয়োগে রয়েছে যুগোপযোগী বিস্তৃতি ও ইজতিহাদের সুযোগ। এ কারণেই ইসলাম চৌদ্দ শ বছর আগের ধর্ম হয়েও আজকের বিশ্বে প্রাসঙ্গিক এবং আগামীকালও থাকবে। আগামী হাজার বছর পরও যদি পৃথিবী থাকে, কোরআনের আইন তখনো সর্বাধুনিক থাকবে। এ জন্যই মহানবী (সা.) তাঁর সর্বযুগের উম্মতদের উদ্দেশ্যে বলে গেছেন, ‘আমি তোমাদের কাছে দুটি বস্তু ছেড়ে যাচ্ছি। তোমরা যতক্ষণ ওটাকে ধরে থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত পথভ্রষ্ট হবে না। ওটা হলো আল্লাহর কিতাব এবং তাঁর নবীর সুন্নত।’ (মুয়াত্তা মালিক, হাদিস : ১৬০২)

অতএব, কোরআনের আইন কোনো সেকেলে/অচল ব্যবস্থা নয়; বরং এটি এমন এক চিরন্তন ও সর্বাধুনিক জীবনবিধান, যা মানুষের দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জীবনের কল্যাণ নিশ্চিত করে। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও সভ্যতা যতই উন্নত হোক, মানুষের প্রকৃতি, ন্যায়বিচারের প্রয়োজন ও নৈতিকতার ভিত্তি কখনো বদলায় না। আর কোরআনের আইন সেই চিরন্তন মানবিক সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত। তাই কোরআনের বিধানই প্রকৃত অর্থে সর্বকালের সর্বাধুনিক, সর্বজনীন ও কল্যাণময় আইন। মহান আল্লাহ সবাইকে পবিত্র কোরআন-হাদিস আঁকড়ে ধরার তাওফিক দান করুন। আমিন।

কিউএনবি/অনিমা/০২ জুলাই ২০২৬,/বিকাল ৫:১৯

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

August 2026
M T W T F S S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit