বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬, ০৬:৫৫ পূর্বাহ্ন

ইসলামের দৃষ্টিতে দায়িত্ববোধের গুরুত্ব

Reporter Name
  • Update Time : বুধবার, ১৭ জুন, ২০২৬
  • ১৫ Time View

ডেস্ক নিউজ : একজন সৎ মানুষের জীবনের অন্যতম মূল্যবান সম্পদ হলো দায়িত্ববোধ। সভ্যতার অগ্রগতি, রাষ্ট্র/প্রতিষ্ঠানের সাফল্য এবং পারস্পরিক আস্থার মূলেও এর ব্যাপক প্রভাব রয়েছে।

ইসলাম প্রত্যেক মানুষকেই দায়িত্বশীল আচরণের উৎসাহ দেয়। একজন মুমিনের জন্য তার ঈমানের মৌলিক দায়িত্ব পালন করা যেমন জরুরি, তেমনি তার পারিবারিক দায়িত্ব, পেশাদারি দায়িত্ব ও (নাগরিক/নেতা বা কর্মকর্তা হিসেবে) রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করাও জরুরি। কিন্তু দুঃখজনকভাবে সমাজে এমন একটি প্রবণতা ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে যে কেউ কেউ সুযোগ পেলেই দায়িত্বে অবহেলা করে, কর্তব্য পালনে শৈথিল্য দেখায়; আবার বিভিন্ন কৌশল, অজুহাত বা চাতুর্যের মাধ্যমে নিজেদের প্রাপ্য কিংবা অপ্রাপ্য সুবিধাও ভোগ করে নেয়। বাহ্যিকভাবে তারা সফল মনে হলেও ইসলামের দৃষ্টিতে এটি নৈতিক অবক্ষয় এবং আমানতের খিয়ানতের অন্তর্ভুক্ত।

ইসলাম দায়িত্বকে শুধু প্রশাসনিক বা সামাজিক বিষয় হিসেবে দেখে না; বরং এটিকে একটি আমানত হিসেবে বিবেচনা করে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন আমানতসমূহ তাদের হকদারের কাছে যথাযথভাবে পৌঁছে দিতে।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৫৮)

প্রতিটি দায়িত্বই একেকটি আমানত। সেই আমানতের যথাযথ হক আদায় না করে শুধু সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করা ইসলামী নৈতিকতার পরিপন্থী।

পবিত্র কোরআনে মুমিনদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে বলা হয়েছে, ‘আর যারা তাদের আমানত ও অঙ্গীকারের ব্যাপারে যত্নশীল।’ (সুরা : মুমিনুন, আয়াত : ৮)
বর্তমান সমাজে এমন অনেক মানুষকে দেখা যায়, যারা দায়িত্ব পালনে উদাসীন; কিন্তু মূল্যায়ন, সুযোগ-সুবিধা, পদোন্নতি কিংবা সম্মান অর্জনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সক্রিয়। ইসলামের দৃষ্টিতে এই মানসিকতা ন্যায়বিচার ও তাকওয়ার পরিপন্থী।

এ ব্যাপারে সতর্ক করতে গিয়ে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘যারা তাদের কৃতকর্মের প্রতি খুশি হয় এবং যা তারা করেনি তা নিয়ে প্রশংসিত হতে পছন্দ করে, তুমি তাদেরকে শাস্তি থেকে মুক্ত মনে কোরো না। আর তাদের জন্যই রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৮৮)

আলোচ্য আয়াতে এমন লোকদের জন্য কঠোর শাস্তির কথা ঘোষিত হয়েছে, যারা শুধু তাদের বাস্তব কৃতিত্ব নিয়েই খুশি নয়, বরং তারা চায় যে তাদের খাতায় এমন কৃতিত্বও লেখা হোক বা প্রকাশ করা হোক, যা তারা করেনি। এই রোগ যেরূপ রাসুল (সা.)-এর যুগে ছিল এবং যার কারণে আয়াত নাজিল হয়, অনুরূপ বর্তমানেও পদাভিলাষী ও যশান্বেষী  প্রকৃতির মানুষের মধ্যে এবং প্রোপাগান্ডা ও আরো বিভিন্ন চালাকি ও চাতুর্যের মাধ্যমে নেতৃত্ব লাভকারী বা বসের কাছ থেকে বিশেষ সুবিধা গ্রহণকারীদের মধ্যেও ব্যাপক হারে এ রোগ পাওয়া যায়।

তবে যারা প্রকৃতপক্ষে দায়িত্বশীল ব্যক্তি, যাদের মধ্যে দায়িত্ববোধ আছে, তারাই কৃতিত্বের আসল হকদার। মহান আল্লাহ যাদের কর্তৃত্ব দিয়েছেন, তাদের উচিত প্রকৃত দায়িত্ববোধসম্পন্ন ব্যক্তির কাছে তাদের হক বুঝিয়ে দেওয়া। কারণ কিয়ামতের দিন যার যার পরিধি অনুযায়ী প্রত্যেক দায়িত্বশীলকেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জবাব দিতে হবে। রাসুল (সা.) বলেছেন,  ‘তোমরা সবাই দায়িত্বশীল এবং সবাইকে তোমাদের ওপর দায়িত্ব সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে।’ (বুখারি, হাদিস : ৮৯৩)

এই হাদিস স্পষ্ট করে যে দায়িত্ব পালন কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়; বরং আল্লাহর কাছে জবাবদিহির বিষয়। পরিবার থেকে শুরু করে রাষ্ট্র বা বিশ্ব, সব পর্যায়ের দায়িত্বশীলরা তাদের দায়িত্বের পরিধি অনুযায়ী নিজ নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। ফলে নিজে যেমন দায়িত্ববোধ এড়িয়ে চলার সুযোগ নেই, তেমনি কোনো দায়িত্বহীন ব্যক্তিকেও অন্যায়ভাবে সুবিধা দেওয়ার সুযোগ নেই।

তবে এটাও মাথায় রাখতে হবে যে সব ভুল, বিলম্ব বা দুর্বলতাকে দায়িত্বে অবহেলা বলা যায় না। মানুষ সীমাবদ্ধ, তার সামর্থ্য ও পরিস্থিতিরও সীমা আছে। কখনো অসুস্থতা, অপ্রত্যাশিত সংকট, দক্ষতার ঘাটতি বা বাস্তব প্রতিবন্ধকতার কারণে অনিচ্ছাকৃতভাবে দায়িত্বে ত্রুটি হতে পারে। ইসলাম ইচ্ছাকৃত গাফিলতি ও অনিচ্ছাকৃত অক্ষমতার মধ্যে পার্থক্য রেখেছে। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘আল্লাহ কোনো ব্যক্তিকে তার সাধ্যের বাইরে দায়িত্ব প্রদান করেন না।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ২৮৬)

কিন্তু যখন কেউ সচেতনভাবে চালাকি করে দায়িত্ব এড়িয়ে যায়, অথচ সুবিধা গ্রহণে কৌশলী হয়ে ওঠে, তখন তা নৈতিক সংকটে রূপ নেয়। এমন ব্যক্তি হয়তো সাময়িকভাবে লাভবান হয়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে আস্থা হারায়। সমাজে মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো বিশ্বাসযোগ্যতা। একবার সেই বিশ্বাস নষ্ট হলে বাহ্যিক সাফল্যও অর্থহীন হয়ে পড়ে।

কারো পক্ষেই শতভাগ নিখুঁত হওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু আন্তরিকতা, জবাবদিহি, আত্মসমালোচনা এবং দায়িত্ব পালনের চেষ্টা একজন মানুষকে আল্লাহর কাছে সম্মানিত করে। পক্ষান্তরে দায়িত্বে গাফিলতি করে চাতুর্যের মাধ্যমে সুবিধাভোগ করা সাময়িক লাভ দিলেও তা ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ের জন্য ক্ষতিকর। মহান আল্লাহ সবাইকে তাকওয়া ও ন্যায়পরায়ণতা দান করুন। আমিন।

কিউএনবি/অনিমা/১৭ জুন ২০২৬,/রাত ৪:৫৯

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

June 2026
M T W T F S S
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit