আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত বন্ধে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর চাপ বাড়িয়েছে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদ (হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস)।
বুধবার অনুষ্ঠিত ভোটে আইনপ্রণেতারা যুদ্ধ সীমিত করার পক্ষে মত দিয়েছেন, যা চলমান সংঘাতের চার মাস পূর্তির প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, ভোটটি রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হলেও বাস্তবে যুদ্ধ থামানোর ক্ষেত্রে এর তাৎক্ষণিক কার্যকারিতা সীমিত। কারণ প্রেসিডেন্টের ভেটো ক্ষমতা এবং কংগ্রেসের উভয় কক্ষে রিপাবলিকানদের প্রভাব এখনও ট্রাম্পের পক্ষে রয়েছে।
কী ঘটেছে?
বুধবার প্রতিনিধি পরিষদে ‘ওয়ার পাওয়ারস অ্যাক্ট’ বা যুদ্ধক্ষমতা আইন প্রয়োগের পক্ষে ভোট অনুষ্ঠিত হয়। এই আইনের আওতায় কংগ্রেস প্রেসিডেন্টকে বিদেশে পরিচালিত সামরিক অভিযান বন্ধ করতে বাধ্য করতে পারে, যদি তিনি কংগ্রেসের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন ছাড়া যুদ্ধ পরিচালনা করেন।
ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ডেমোক্র্যাটরা দাবি করে আসছিলেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী যুদ্ধ ঘোষণার ক্ষমতা কংগ্রেসের, প্রেসিডেন্টের নয়। সেই যুক্তির ভিত্তিতেই তারা বারবার যুদ্ধ বন্ধের উদ্যোগ নিয়েছিলেন।
অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করে আসছে, ইরানে পরিচালিত সামরিক অভিযান কংগ্রেসের আলাদা অনুমোদনের প্রয়োজন পড়ে না।
১৯৭৩ সালে প্রণীত ওয়ার পাওয়ারস অ্যাক্ট অনুযায়ী, বিদেশে সামরিক সংঘাতে জড়ানোর আগে প্রেসিডেন্টকে কংগ্রেসের অনুমোদন নিতে হয়। কেবল যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আসন্ন ও তাৎক্ষণিক হামলার ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট একক সিদ্ধান্তে সেনা মোতায়েন করতে পারেন। সেক্ষেত্রেও ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কংগ্রেসকে অবহিত করতে হয়।
যদি কংগ্রেস পরবর্তীতে যুদ্ধ অনুমোদন না দেয়, তাহলে ৬০ দিনের মধ্যে সেনা প্রত্যাহার করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
সমালোচকদের মতে, ইরানের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র কোনও তাৎক্ষণিক হামলার মুখে ছিল না; বরং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলই প্রথম হামলা চালিয়েছিল। তাছাড়া যুদ্ধ শুরু হওয়ার ৬০ দিনের সময়সীমা পার হওয়ার পরও ট্রাম্প প্রশাসন সেনা প্রত্যাহার করেনি।
ভোটের ফলাফল
বুধবারের ভোটে ২১৫ জন আইনপ্রণেতা ট্রাম্পের যুদ্ধক্ষমতা সীমিত করার পক্ষে ভোট দেন, বিপক্ষে ভোট পড়ে ২০৮টি।
ডেমোক্র্যাটদের জন্য এ সাফল্য আসে কয়েকজন রিপাবলিকান সদস্যের অবস্থান পরিবর্তনের কারণে। চারজন রিপাবলিকান সদস্য দলীয় অবস্থানের বাইরে গিয়ে প্রস্তাবটির পক্ষে ভোট দেন, যা ট্রাম্পের নীতির প্রতি অসন্তোষের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
দুই সপ্তাহ আগে অনুষ্ঠিত ভোটেও মিশিগানের টম ব্যারেট, ওহাইওর ওয়ারেন ডেভিডসন এবং কেন্টাকির থমাস ম্যাসি ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে ভোট দিয়েছিলেন। এবার তাদের সঙ্গে যোগ দেন পেনসিলভানিয়ার ব্রায়ান ফিটজপ্যাট্রিক।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব, বৈশ্বিক বাণিজ্যে অস্থিরতা এবং ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা হ্রাস রিপাবলিকানদের একটি অংশকে অস্বস্তিতে ফেলেছে।
ট্রাম্পের ক্ষমতা কি সীমিত হলো?
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, আপাতত এর উত্তর ‘না’। প্রতিনিধি পরিষদের পর একই প্রস্তাব সিনেটেও পাস হতে হবে। কিন্তু সিনেটে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে এবং তারা এখন পর্যন্ত যুদ্ধ বন্ধের উদ্যোগগুলো আটকে দিতে সক্ষম হয়েছে।
দুই সপ্তাহ আগে সিনেটে যুদ্ধ বন্ধের প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে অনুষ্ঠিত ভোটে ৫০ জন পক্ষে এবং ৪৭ জন বিপক্ষে ভোট দেন। চারজন রিপাবলিকান ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে ভোট দিলেও প্রয়োজনীয় সমর্থন পাওয়া যায়নি।
ধরে নেওয়া যাক সিনেটেও প্রস্তাবটি পাস হলো, তারপরও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সেটিতে ভেটো দিতে পারবেন। সেই ভেটো অকার্যকর করতে কংগ্রেসের উভয় কক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন হবে, যা বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় অত্যন্ত কঠিন।
যুক্তরাষ্ট্র কি এখনও যুদ্ধে আছে?
বিতর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- যুক্তরাষ্ট্র আদৌ এখন ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে আছে কি না।
৮ এপ্রিল থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে, যদিও সেটি অত্যন্ত নাজুক। ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, যুদ্ধবিরতির ফলে আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ শেষ হয়েছে এবং তাই ওয়ার পাওয়ারস অ্যাক্টের অনেক বিধান বর্তমানে প্রযোজ্য নয়।
গত ১ মে ট্রাম্প ঘোষণা দেন যে, যুদ্ধবিরতি কার্যত শত্রুতার অবসান ঘটিয়েছে। তবে সমালোচকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র এখনও ইরানের বন্দর অবরোধ অব্যাহত রেখেছে এবং ইরানি জাহাজে হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে তেহরানও হরমুজ প্রণালীতে বিভিন্ন ধরনের বাধা বজায় রেখেছে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সম্প্রতি কংগ্রেসে শুনানির সময় দাবি করেন, “ইরান যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে।”
কিন্তু সিনেটের পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির সদস্য জিন শাহিন এই বক্তব্যের সমালোচনা করে বলেন, যুদ্ধ চলাকালে প্রশাসন কংগ্রেসকে পর্যাপ্ত তথ্য দেয়নি এবং জবাবদিহিতা এড়িয়ে গেছে।
তার অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরানে হামলা চালাচ্ছিল এবং ইরান মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটি ও দূতাবাসে হামলা করছিল, তখন প্রশাসন কংগ্রেসকে জানিয়েছিল যে, তারা ‘সক্রিয় শত্রুতায়’ জড়িত নয়।
আবারও কি যুদ্ধ শুরু হতে পারে?
এ প্রশ্নের উত্তরও স্পষ্ট নয়, তবে ট্রাম্প প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা মনে করেন প্রেসিডেন্টের হাতে সেই সুযোগ এখনও রয়েছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ মে মাসে সিনেটের একটি শুনানিতে বলেন, যুদ্ধক্ষমতা আইনের আওতায় প্রেসিডেন্টকে যে ৬০ দিনের সামরিক ক্ষমতা দেওয়া হয়, যুদ্ধবিরতির পর তা নতুনভাবে গণনা শুরু হয়েছে বলে প্রশাসন মনে করে।
তার ভাষায়, “প্রেসিডেন্ট যদি আবার সামরিক অভিযান শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে প্রয়োজনীয় সব ধরনের আইনগত ক্ষমতা আমাদের হাতে রয়েছে।”
বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিনিধি পরিষদের ভোট ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সতর্কবার্তা হলেও এটি ইরানের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক অভিযান সম্পূর্ণভাবে ঠেকাতে পারবে না। তবে যুদ্ধবিরোধী জনমত এবং কংগ্রেসের ক্রমবর্ধমান চাপ ভবিষ্যতে হোয়াইট হাউসের সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। সূত্র: আল-জাজিরা
কিউএনবি/অনিমা/০৪.০৬.২০২৬/সন্ধ্যা ৬.৫২