মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:১৯ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম
আইজিপি’র ‘ক্রসফায়ার’ সম্পর্কিত বক্তব্যের অপব্যাখ্যা অপরাধীদের উৎসাহিত করবে ক্রসফায়ার নিয়ে আইজিপির বক্তব্য প্রত্যাহার ও অপসারণের দাবি টিআইবির পেছাল ইনডোর গেমস, আবার অনিশ্চিয়তায় এসএ গেমস স্বর্ণের দাম আরও বাড়ল ব্যালন ডি’অরের দৌড়ে যে কারণে কেইনকে এগিয়ে রাখছেন বিশ্লেষকরা আকামার মেয়াদ শেষ হলেও সৌদিতে প্রবেশের সুযোগ পাবেন প্রবাসীরা: আরিফুল হক এক দিনে ডেঙ্গুতে আরও ৫ জনের মৃত্যু, নতুন ভর্তি ২২১৮ বঙ্গোপসাগরে শাক্তিশালী রুপ নিচ্ছে ঘূর্ণিঝড় অর্ণব সাজেক আন্দোলনে প্রতিনিধিত্বের সংকট, বৈধতা যাচাইয়ে কমিটি সাজেক অবরোধ প্রত্যাহারে সমঝোতা হয়নি দাবি করে অব্যাহত রাখার ঘোষণা

বাড়ল বিদ্যুতের দাম, বাড়বে চাপ

Reporter Name
  • Update Time : বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬
  • ৫৫ Time View

ডেস্ক নিউজ : বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির চাপ কমাতে বাড়ানো হয়েছে দাম। পাইকারি ও খুচরা—উভয় পর্যায়েই দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)।

নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, খুচরা পর্যায়ে ইউনিটপ্রতি গড়ে ১ টাকা ৫২ পয়সা এবং পাইকারি পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১ টাকা ৩৯ পয়সা বাড়ানো হয়েছে। ফলে খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের গড় মূল্য ১৬.৬৮ শতাংশ এবং পাইকারি পর্যায়ে ১৯.৮৫ শতাংশ বেড়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যুতের সঞ্চালন (ট্রান্সমিশন) চার্জ ২৩.৯৬ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে।
গতকাল বুধবার রাজধানীর রমনায় কমিশন কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ এই ঘোষণা দেন।

কমিশনের আদেশ অনুযায়ী, চলতি জুন মাসের বিল থেকেই নতুন দাম কার্যকর হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যুতের দাম বাড়ার প্রভাব শুধু বিদ্যুৎ বিলেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; শিল্প উৎপাদন ব্যয়, সেচ কার্যক্রম, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়েও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। ফলে মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা ভোক্তাদের ওপর নতুন করে আর্থিক চাপ বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বিইআরসির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের গড় মূল্য প্রতি ইউনিট ৭ টাকা।

নতুন সিদ্ধান্তে তা ১ টাকা ৩৯ পয়সা বাড়িয়ে ৮ টাকা ৩৯ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের গড় মূল্য ৯ টাকা ১১ পয়সা থেকে বেড়ে দাঁড়াবে ১০ টাকা ৬৩ পয়সায়। এ ছাড়া বিদ্যুতের সঞ্চালন হুইলিং চার্জও বাড়ানো হয়েছে। বিদ্যমান ৩১.৩৫ পয়সা থেকে তা বাড়িয়ে ৩৮.৮৬ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে।

বিইআরসি জানায়, বিদ্যুৎ উৎপাদন, ক্রয় ও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যয় এবং সার্বিক আর্থিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নতুন মূল্যহার নির্ধারণ করা হয়েছে।

কমিশনের হিসাবে, পাইকারি মূল্য বাড়ানোর পরও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) ঘাটতি পূরণে সরকারকে বছরে প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে।

এর আগে গত ২০ ও ২১ এপ্রিল অনুষ্ঠিত বিইআরসির গণশুনানিতে দেশের ছয়টি বিদ্যুৎ বিতরণ কম্পানি খুচরা পর্যায়ে ইউনিটপ্রতি ৮৫ পয়সা থেকে ২ টাকা ৫ পয়সা পর্যন্ত দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়। বিপিডিবি ৮৫ পয়সা, আরইবি ১ টাকা ৭৭ পয়সা, ডিপিডিসি ১ টাকা ৫৪ পয়সা, ডেসকো ১ টাকা ৯৮ পয়সা, ওজোপাডিকো ১ টাকা ৩৯ পয়সা এবং নেসকো ২ টাকা ৫ পয়সা বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়।

বিদ্যুতের দাম বাড়ার তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, নতুন করে বিদ্যুতের দাম বাড়ার ফলে সবচেয়ে কম ব্যবহারকারী লাইফ লাইন গ্রাহকদের (০ থেকে ৫০ ইউনিট ব্যবহারকারী) প্রতি ইউনিটে ১৪.৯০ শতাংশ করে বাড়বে। নিম্ন আয়ের মানুষকে সুলভ মূল্যে বিদ্যুৎ সুবিধা দিতে ‘লাইফ লাইন গ্রাহক’ নাম দেওয়া হয়। বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ প্রথায় প্রথম ৫০ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহারকারীদের লাইফ লাইন গ্রাহক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। গত ১৬ বছরে লাইফ লাইন গ্রাহকদের বিদ্যুৎ বিল প্রায় দ্বিগুণ বাড়ানো হয়েছে। ২০১০ সালের ১ মার্চ লাইফ লাইন গ্রাহকরা প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহারের জন্য ২ টাকা ৫০ পয়সা দিতেন। তবে ২০২৬ সালের জুনে এসে প্রতি ইউনিট ৫ টাকা ৩২ পয়সা করা হয়েছে। বিদ্যুতের বাড়তি এই বিলের কারণে মাস শেষে তাদের ওপর আরো বাড়তি চাপ তৈরি হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে জীবনযাপনের ব্যয় নির্বাহে দুর্ভোগে আছে সাধারণ মানুষ। এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোয় তাদের জীবনসংগ্রাম আরো কঠিন হয়ে উঠবে।

বিদ্যুতের নতুন দাম অনুযায়ী, প্রথম ধাপে ০ থেকে ৭৫ ইউনিট ব্যবহারকারীর বিদ্যমান দাম ৫.২৬ টাকা থেকে ১৭.৪৯ শতাংশ বাড়িয়ে ৬.১৮ টাকা, দ্বিতীয় ধাপে ৭৬ থেকে ২০০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যমান দাম ৭.২০ টাকা থেকে ১৮ শতাংশ বাড়িয়ে ৮.৫০ টাকা, ২০১ থেকে ৩০০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যমান দাম ৭.৫৯ টাকা থেকে ১৯.৮৯ শতাংশ বাড়িয়ে ৯.১০ টাকা, ৩০১ থেকে ৪০০ ইউনিটের বিদ্যমান দাম ৮.০২ টাকা থেকে ১৯.৯৫ শতাংশ বাড়িয়ে ৯.৬২ টাকা, ৪০১ থেকে ৬০০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যমান দাম ১২.৬৭ টাকা থেকে ১৮.৪৬ শতাংশ বাড়িয়ে ১৫.০১ টাকা এবং সর্বশেষ ধাপ ৬০০ ইউনিটের ঊর্ধ্বে ব্যবহারকারীদের বিদ্যমান দাম ১৪.৬১ টাকা থেকে ১৮.৭৫ শতাংশ বাড়িয়ে ১৭.৩৫ টাকা করা হয়েছে।

একই সঙ্গে সেচ পাম্পে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১৫ শতাংশ বাড়িয়ে ৫.২৫ টাকা থেকে ৬.০৪ টাকা করা হয়েছে। ক্ষুদ্র শিল্পে (ফ্ল্যাট) প্রতি ইউনিটে ১৮.৩০ শতাংশ বাড়িয়ে ১০.৭৬ টাকা থেকে ১২.৭৩ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া বাণিজ্যিক ও অফিস, ইলেকট্রিক ভেহিকল ও ব্যাটারি চার্জিং, শিক্ষা, ধর্মীয়, হাসপাতাল এবং দাতব্য প্রতিষ্ঠানে ইউনিটপ্রতি বিদ্যুতের দামও বাড়ানো হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম গতকাল বলেন, ‘বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির সবচেয়ে বড় ধাক্কা লাগবে নিম্ন আয়ের ও কম বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী পরিবারগুলোর ওপর। বিশেষ করে ‘লাইফলাইন’ গ্রাহকদের জন্য যে ভর্তুকি দীর্ঘদিন ধরে দেওয়া হয়ে আসছে, সেটি কমিয়ে আনায় তাদের বিদ্যুৎ বিল তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি বাড়বে। লাইফলাইন ব্যবস্থা মূলত কম ব্যবহারকারীদের সুরক্ষা দেওয়ার জন্য চালু করা হয়েছিল। কিন্তু যেহেতু এটি সবার জন্য প্রযোজ্য, তাই এর সুবিধাও সবাই পেয়ে আসছিল। এখন ভর্তুকি কমানোর সবচেয়ে সহজ উপায় হিসেবে লাইফলাইন শ্রেণির গ্রাহকের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি শুধু বিদ্যুৎ বিলেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; এর প্রভাব পড়বে সামগ্রিক জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর। একটি পরিবারের জ্বালানি ব্যয়ের মধ্যে শুধু বিদ্যুৎ নয়, রান্নার জ্বালানি, পরিবহন ব্যয় এবং অন্যান্য শক্তিনির্ভর খরচও অন্তর্ভুক্ত। বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি এসব খাতেও পরোক্ষ প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় বিভিন্ন পণ্য ও সেবার মূল্য বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।’

অধ্যাপক ম. তামিম আরো বলেন, ‘বাংলাদেশের শিল্প ও উৎপাদন খাত ব্যাপকভাবে বিদ্যুিনর্ভর। খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, ভোজ্যতেল, প্লাস্টিক সামগ্রী, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াকরণসহ প্রায় সব ধরনের উৎপাদন কার্যক্রমে বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হয়। ফলে বিদ্যুতের দাম বাড়ার প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে না পড়লেও ধীরে ধীরে বাজারে বিভিন্ন পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে শিল্প-কারখানার উৎপাদন ব্যয় বাড়বে, শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমবে এবং কর্মসংস্থানেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।’

তিনি বলেন, ‘কৃষি খাতে এর প্রভাব ব্যাপকভাবে পড়বে। বর্তমানে দেশের অনেক অঞ্চলে সেচব্যবস্থা বিদ্যুিনর্ভর হয়ে উঠেছে। বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি সেচ ব্যয় বাড়াবে, যা শেষ পর্যন্ত কৃষি উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণ হতে পারে।’

ভর্তুকি কমানোর বিষয়ে অধ্যাপক তামিম বলেন, ‘শুধু বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে নয়, উৎপাদন ব্যয় কমিয়েও ভর্তুকি হ্রাস করা সম্ভব। বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থায় কোথায় অদক্ষতা রয়েছে, কিভাবে উৎপাদন খরচ কমানো যায় এবং বিদ্যুৎ খাতের পরিচালনায় কী ধরনের সংস্কার প্রয়োজন—এসব বিষয় আগে গুরুত্বসহকারে মূল্যায়ন করা উচিত।’

নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ধীরে ধীরে কমিয়ে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন। বিশেষ করে শিল্প-কারখানা, বাণিজ্যিক ভবন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি অফিস এবং বৃহৎ ছাদসমৃদ্ধ স্থাপনাগুলোতে রুফটপ সৌরবিদ্যুতের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। এতে গ্রিডের ওপর চাপ কমবে, জ্বালানি আমদানির ব্যয় হ্রাস পাবে এবং দীর্ঘ মেয়াদে বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয়ও কমানো সম্ভব হবে।’

কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ‘বিদ্যুৎ, গ্যাস ও অন্যান্য জ্বালানি অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। তাই বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি শিল্প, কৃষি, পরিবহন ও গৃহস্থালি খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়াবে, যার চূড়ান্ত প্রভাব ভোক্তাদের ওপর পড়বে। ফলে নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি আরো তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি, সিস্টেম লস ও ক্যাপাসিটি চার্জ কমানোর পরিবর্তে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক গ্রাহকদের ওপর অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা চাপানো হয়েছে, যা দুঃখজনক। দুই দফা জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষ, শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য নেতিবাচক বার্তা বহন করে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে তা বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।’

সৌজন্যে : কালের কণ্ঠ 

কিউএনবি/অনিমা/০৪.০৬.২০২৬/সকাল ১০.৪৩

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

October 2026
M T W T F S S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
27282930  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit