আন্তর্জাতিক ডেস্ক : যুক্তরাষ্ট্রের কাছে যুদ্ধকালীন আর্থিক সহায়তা চায় সংযুক্ত আরব আমিরাত। এরই মধ্যে বিষয়টি মার্কিন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে দেশটি।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ যদি উপসাগরীয় এই দেশটিকে আরও গভীর সংকটে ফেলে, তবে আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে শুরু হওয়া এই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার ব্যবস্থা, যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে জরুরি তারল্য সহায়তা, তেলের মূল্য স্থিতিশীল রাখার কৌশল, অথবা সংঘাতের কারণে সৃষ্ট দীর্ঘস্থায়ী বিপর্যয় থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের অর্থনীতিকে রক্ষা করার জন্য সরাসরি আর্থিক নিশ্চয়তা।
এই অঞ্চলের জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার প্রতি সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ অর্থনীতিগুলোর মধ্যে অন্যতম সংযুক্ত আরব আমিরাত। ইতোমধ্যেই ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ইরানের ধারাবাহিক বিমান হামলার সরাসরি প্রভাবের সম্মুখীন হয়েছে দেশটি। সাম্প্রতিক হামলা এবং প্রতিহত করা হুমকিগুলো গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোর ক্ষতি করেছে বা তাতে বিঘ্ন ঘটিয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে অ্যাডনকের হাবশান গ্যাস স্থাপনায় অগ্নিকাণ্ড এবং উপসাগরজুড়ে একাধিক ড্রোন হামলা।
আলোচনার সাথে পরিচিত সূত্রগুলো জানিয়েছে, আবুধাবি ওয়াশিংটনের কাছ থেকে সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি, যেমন-হরমুজ প্রণালীর দীর্ঘস্থায়ী বন্ধ বা মারাত্মক অচলাবস্থা, বিশ্বব্যাপী তেলের দামে আকস্মিক উল্লম্ফন, অথবা গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি থেকে সুরক্ষার আশ্বাস চাইছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের অর্থনীতি, যা মূলত জ্বালানি রফতানি, বিদেশি বিনিয়োগ এবং পর্যটনের উপর নির্ভরশীল, এই সংঘাত আরও বাড়লে বা দীর্ঘায়িত হলে উল্লেখযোগ্য চাপের মুখে পড়তে পারে। যদিও দেশটির শক্তিশালী আর্থিক রিজার্ভ রয়েছে, কর্মকর্তারা বিনিয়োগকারীদের আস্থা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত একটি সুস্পষ্ট সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে আগ্রহী।
এই আলোচনার খবর এমন এক সময়ে এসেছে যখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ‘আরও কিছুটা সময় পেলে’ হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দিতে পারে, এবং একই সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোকে তাদের নিজস্ব সামুদ্রিক নিরাপত্তার জন্য আরও বেশি দায়িত্ব নিতে আহ্বান জানিয়েছেন। একই সময়ে, যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীদের নিয়ে গোপন আলোচনায় একটি সম্ভাব্য ৪৫ দিনের যুদ্ধবিরতির বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
উল্লেখ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে গভীর সামরিক, অর্থনৈতিক এবং জ্বালানি সম্পর্কসহ একটি দীর্ঘস্থায়ী কৌশলগত অংশীদারিত্ব রয়েছে। ওয়াশিংটন সংযুক্ত আরব আমিরাতে একটি বড় সামরিক উপস্থিতি বজায় রেখেছে এবং বর্তমান সংকটজুড়ে উভয় দেশ ঘনিষ্ঠভাবে সমন্বয় করেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংযুক্ত আরব আমিরাতের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এই আলোচনাকে আতঙ্কের লক্ষণ না বলে “বিচক্ষণ আপৎকালীন পরিকল্পনা” হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ওই কর্মকর্তা বলেন, “আমরা আমাদের অর্থনীতি এবং জনগণকে রক্ষা করার জন্য সব ধরনের পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি।”
এই পদক্ষেপটি উপসাগরীয় দেশগুলোর রাজধানীগুলোতে বিস্তৃত উদ্বেগেরও প্রতিফলন ঘটায়। সৌদি আরব সম্প্রতি ইরাকের ভূখণ্ড থেকে চালানো ড্রোন হামলার জন্য দেশটির রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছে।
অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি প্রধান কাজা কাল্লাস সতর্ক করেছেন, ইরানকে হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণ বা সীমাবদ্ধ করার অনুমতি দিলে তা বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য একটি বিপজ্জনক ‘পিচ্ছিল পথ’ তৈরি করবে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে আলোচিত সম্ভাব্য মার্কিন আর্থিক সহায়তার সঠিক আকার বা ধরন, কিংবা কোনও আনুষ্ঠানিক চুক্তি আসন্ন কি না, তা নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি। তবে, এতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, উভয় সরকারের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে এই আলোচনা পরিচালিত হচ্ছে।
ইরান সংঘাত অষ্টম সপ্তাহে পদার্পণ করায়, ওয়াশিংটনের প্রতি সংযুক্ত আরব আমিরাতের উদ্যোগ এই সংকটের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক দিকটিকে তুলে ধরেছে। পর্দার আড়ালে যুদ্ধবিরতি আলোচনা অব্যাহত থাকলেও, কূটনীতি যদি দ্রুত সমাধানে ব্যর্থ হয়, সেই আশঙ্কায় উপসাগরীয় দেশগুলো একই সাথে তাদের আর্থিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করছে।
প্রতিবেদনটি নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকার কোনও আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি। রবিবার এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে হোয়াইট হাউসও আলোচনাটি নিশ্চিত বা অস্বীকার করতে রাজি হয়নি। সূত্র: ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, মিডল ইস্ট অনলাইন
কিউএনবি/অনিমা/২০ এপ্রিল ২০২৬,/বিকাল ৫:৩৪