রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬, ০৬:৫১ অপরাহ্ন

এআই’র কারণে পরমাণু যুদ্ধের ঝুঁকিতে দক্ষিণ এশিয়া?

Reporter Name
  • Update Time : শনিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০২৬
  • ২৮ Time View

আন্তর্জাতিক ডেস্ক :  দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ভয়াবহ মাত্রা যোগ করেছে। ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে চলমান সামরিক আধুনিকায়নের প্রতিযোগিতা এখন আর কেবল প্রচলিত অস্ত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই বরং তা দ্রুতগতিতে এআই-চালিত সমরকৌশলের দিকে ধাবিত হচ্ছে। 

সাম্প্রতিক বিভিন্ন সামরিক বিশ্লেষণ থেকে জানা যাচ্ছে, যুদ্ধের ময়দানে এআইর ক্রমবর্ধমান ব্যবহার দুই দেশের মধ্যবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময়কে এতটাই কমিয়ে দিচ্ছে যে, একটি ছোট ভুলও মুহূর্তের মধ্যে পারমাণবিক যুদ্ধের সূত্রপাত ঘটাতে পারে। বিশেষ করে ২০২৫ সালের পেহেলগাম হামলার পরবর্তী সংকট দেখিয়েছে, আধুনিক প্রযুক্তি কীভাবে যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি পাল্টে দিচ্ছে।

ভারত-পাকিস্তানের মতো চিরবৈরী দুটি প্রতিবেশী দেশের জন্য এআই কেবল প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ নয় বরং বড় ধরনের ঝুঁকি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। যুদ্ধের ময়দানে এখন আর কেবল মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করা হচ্ছে না বরং স্যাটেলাইট ইমেজ, ড্রোন ফিড এবং সিগন্যাল ইন্টেলিজেন্স থেকে আসা বিপুল তথ্য বিশ্লেষণ করছে এআই সিস্টেম। এই ব্যবস্থাটি তথ্যের পাহাড় ডিঙিয়ে অতি দ্রুত লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ এবং হামলার সুপারিশ প্রদান করছে। এর ফলে নীতিনির্ধারকদের হাতে চিন্তা করার বা পরিস্থিতি শান্ত করার মতো পর্যাপ্ত সময় আর অবশিষ্ট থাকছে না। আর এতেই দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত স্থিতিশীলতা সংকটের মুখে।

ভারতের সাম্প্রতিক ‘অপারেশন সিন্দুর’ চলাকালীন যে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে, তার সঠিকতা বা নির্ভুলতা ছিল প্রায় ৯৪ শতাংশ। দীর্ঘ ২০ বছরের সংগৃহীত তথ্য এবং রিয়েল-টাইম ড্রোন ডাটার ওপর ভিত্তি করে তৈরি এই সিস্টেমটি অত্যন্ত নিখুঁত হলেও এর বিপত্তি অন্য জায়গায়। এই প্রযুক্তির কারণে শনাক্তকরণ এবং পদক্ষেপ নেওয়ার মধ্যবর্তী সময় এতটাই কমে গেছে যে, রাজনৈতিকভাবে সংকট সমাধানের কোনো সুযোগই পাওয়া যাচ্ছে না। এই ধরণের অ্যালগরিদমের ওপর অতিরিক্ত আস্থা সেনাপতিদের মনে এই ধারণা তৈরি করছে যে দ্রুততর সিদ্ধান্তই সঠিক সিদ্ধান্ত। অথচ আসলে এটা বড় ধরনের ভ্রমও হতে পারে।

পাকিস্তানও এই প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে নেই এবং তারা নিজস্ব এআই সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ব্যাপক বিনিয়োগ করছে। পাকিস্তান বিমান বাহিনী ইতিমধ্যে ‘সেন্টার ফর আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড কম্পিউটিং’ প্রতিষ্ঠা করেছে। ২০২৬ সালের ‘গোল্ড ঈগল’ মহড়ার মাধ্যমে তারা তথ্য-চালিত যুদ্ধরীতির বাস্তব প্রয়োগ প্রদর্শন করেছে। পাকিস্তানের এই প্রযুক্তিগত অগ্রগতি মূলত চীনের সাথে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার ফসল, অন্যদিকে ভারত যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তাদের কৌশলগত অংশীদারিত্বের মাধ্যমে আধুনিক হচ্ছে। ফলে এই অঞ্চলে এআই-এর কারণে যে ভারসাম্য তৈরি হচ্ছে, তা কোনোভাবেই শান্তি নিশ্চিত করছে না বরং উত্তেজনার পারদ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

এই নতুন সমরকৌশলের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো এর ভুলের মাত্রা। ৯৪ শতাংশ নির্ভুলতার অর্থ হলো অন্তত ৬ শতাংশ ক্ষেত্রে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। ভারত ও পাকিস্তানের মতো ঘনবসতিপূর্ণ এবং দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য অবকাঠামো সমৃদ্ধ অঞ্চলে এই সামান্য ভুলও বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। কোনো একটি বেসামরিক স্থাপনাকে ভুলবশত সামরিক লক্ষ্যবস্তু মনে করে আঘাত করলে তার প্রতিক্রিয়ায় যে পাল্টা আঘাত আসবে, তা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা কারো হাতে থাকবে না। বিশেষ করে উত্তেজনার মুহূর্তে যখন মানুষের ওপর মানসিক চাপ থাকে, তখন তারা যন্ত্রের দেওয়া তথ্যকে ধ্রুব সত্য বলে ধরে নেয়। একে সামরিক পরিভাষায় ‘অটোমেশন বায়াস’ বলা হয়।

দক্ষিণ এশিয়ায় পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম মিসাইল এবং রাডার ব্যবস্থাগুলো অনেক সময় প্রচলিত যুদ্ধের জন্যও ব্যবহৃত হয়। এআই যদি ভুলবশত কোনো সংকেতকে পারমাণবিক আক্রমণের প্রস্তুতি হিসেবে ব্যাখ্যা করে, তবে তার ফল হবে ভয়াবহ। পারমাণবিক ছায়ার নিচে বাস করা এই দুই দেশের মধ্যে অবিশ্বাস এতটাই গভীর যে, একে অপরের প্রতিটি পদক্ষেপকে তারা চরম হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে। এমন পরিস্থিতিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভুল ব্যাখ্যা বা ‘ব্ল্যাক বক্স’ ডাটা প্রসেসিং যুদ্ধের ময়দানে এমন এক ফিডব্যাক লুপ তৈরি করতে পারে, যেখানে মানুষের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যাবে এবং যান্ত্রিক সিদ্ধান্তই জয়ী হবে।

মিলিটারি থিঙ্কিং ‘ওওডিএ লুপ’ (অবজার্ভ, ওরিয়েন্ট, ডিসাইড, অ্যাক্ট বা পর্যবেক্ষণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ) প্রক্রিয়াটি এআই’র কারণে এখন অতি-সংকুচিত। যখন মহাকাশ, আকাশপথ এবং সাইবার জগৎ একই নেটওয়ার্কে যুক্ত থাকে, তখন একটি ভুল সংকেত পুরো ব্যবস্থার মধ্যে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে যুদ্ধের ময়দানে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হয় যেখানে নেতারা আর বসে কথা বলার সুযোগ পান না বরং পরিস্থিতির চাপে অনিচ্ছাসত্ত্বেও বড় ধরনের সংঘাতে জড়িয়ে পড়েন। প্রযুক্তি এখানে স্বচ্ছতা আনার বদলে এক ধরনের কৌশলগত অস্পষ্টতা তৈরি করছে যা উভয় পক্ষকেই বিচলিত করে তোলে।

এশিয়া টাইমসের বিশ্লেষণ

কিউএনবি/অনিমা/১৮ এপ্রিল ২০২৬,/সকাল ৭:০৩

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

June 2026
M T W T F S S
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit