আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ গত সাত সপ্তাহ ধরে বিশ্বকে খাদের কিনারায় দাঁড় করিয়ে রেখেছে। গত ১০ দিন ধরে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চললেও পরিস্থিতি এখনো থমথমে। তবে ৯ কোটি মানুষের দেশ ইরানের ওপর ভয়াবহ হামলা, অবকাঠামো ধ্বংস এবং দুই সহস্রাধিক মানুষের প্রাণহানির পরও পশ্চিমা বিশ্বের রাজপথে গাজা বা ইউক্রেন যুদ্ধের মতো গণবিক্ষোভ দেখা যাচ্ছে না।
জনমত জরিপে যুদ্ধটি চরম ‘অজনপ্রিয়’ হওয়া সত্ত্বেও এই নিস্পৃহতা কেন? বিশ্লেষকরা এর পেছনে বেশ কিছু মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক কারণ চিহ্নিত করেছেন। ‘আর্মেড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটা’-এর তথ্য অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধের প্রথম মাসে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩ হাজার ২০০টি বিক্ষোভ হয়েছে। এর বিপরীতে ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধের প্রথম মাসে ৩ হাজার ৭০০টি এবং গাজা যুদ্ধের প্রথম মাসে ৬ হাজার ১০০টি বিক্ষোভ হয়েছিল।
মেরিল্যান্ড ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক শিবলি তেলহামি জানান, মাত্র ২১ শতাংশ মার্কিনির সমর্থনে শুরু হওয়া এ যুদ্ধের বিরুদ্ধে এখন প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ অবস্থান নিলেও তারা রাজপথে নামছেন না। অধ্যাপক জেরেমি ভ্যারন এই সংঘাতকে ‘ভিডিও গেম ওয়ার’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্থল সেনা পাঠানোর চেয়ে ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্রের ওপর বেশি নির্ভর করছেন। পেন্টাগন কেবল ‘স্মার্ট বোমা’র মাধ্যমে লক্ষ্যবস্তু ধ্বংসের ফুটেজ দেখাচ্ছে। ফলে যুদ্ধের যে মানবিক বিপর্যয় এবং রক্তপাত মানুষের বিবেককে নাড়া দেয়, তা অনেকটা অদৃশ্য থেকে যাচ্ছে।
গাজা উপত্যকায় ইসরাইলি অভিযানের বিরুদ্ধে টানা কয়েক মাস প্রতিবাদ করার পরও সাধারণ মানুষ গণহত্যা ঠেকাতে পারেনি। ইতিহাসবিদ সালার মোহানদেসি মনে করেন, সেই ব্যর্থতা থেকে অনেক অ্যাক্টিভিস্টের মনে ক্লান্তি ও গভীর হতাশা বাসা বেঁধেছে। তারা মনে করছেন, প্রতিবাদ করে সরকারের নীতি পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ এখন অনেক বেশি ভীতিকর। ট্রাম্প প্রশাসন প্রতিবাদী শিক্ষার্থীদের ভিসা বাতিল করছে এবং ইমিগ্রেশন বিভাগ অনেককে তুলে নিয়ে যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ফান্ড হারানোর ভয়ে ‘ড্রাকোনিয়ান’ বা কঠোর নিয়ম জারি করে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করেছে। অক্সফোর্ড ও কেমব্রিজের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধেও ‘সিস্টেমিক রিপ্রেশন’ বা পদ্ধতিগত দমনের অভিযোগ উঠেছে।
ফিলিস্তিনকে ‘উপনিবেশিত জাতি’ হিসেবে পশ্চিমা বিশ্ব সহজেই গ্রহণ করেছে। কিন্তু ইরানের ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন। ইরানের অভ্যন্তরীণ মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে এর অবস্থান অনেকের মনে দ্বিধা তৈরি করে। এছাড়া প্রবাসী ইরানিদের একটি বড় অংশ যুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় প্রতিবাদী আন্দোলনগুলো নেতৃত্বহীন হয়ে পড়ছে।
প্রতিবাদ কম হলেও যুদ্ধের ধাক্কা বিশ্ববাসী ঠিকই টের পাচ্ছে। ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার ফলে তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে, শেয়ার বাজারে ধস নেমেছে এবং সারের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। গত সোমবার থেকে যুক্তরাষ্ট্র ওই জলপথে নৌ-অবরোধ শুরু করায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দুটি কারণে পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে পারে:
মার্কিন সেনা মৃত্যু: যদি স্থল অভিযান শুরু হয় এবং কয়েকশ মার্কিন সৈন্যের প্রাণহানি ঘটে, তবে মার্কিন জনতা ট্রাম্পের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামতে বাধ্য হবে।
অর্থনৈতিক যন্ত্রণা: জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের দাম যদি সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যায়, তবে বিমূর্ত আদর্শের চেয়ে নিজেদের অস্তিত্বের প্রয়োজনে প্রতিবাদ জোরালো হবে।
আপাতত যুদ্ধবিরতির কারণে কিছুটা উত্তেজনা কমলেও লেবাননে ইসরাইলি আগ্রাসন যেকোনো সময় এই সংঘাতকে পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ দিতে পারে বলে ধারণা করছে বিশ্লেষকরা।
কিউএনবি/আয়শা/১৭ এপ্রিল ২০২৬,/বিকাল ৪:৪০