আন্তর্জাতিক ডেস্ক : যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ও নতুন আলোচনা ঘিরে আবারও সামনে এসেছে বিদেশে আটকে থাকা তেহরানের ‘ফ্রোজেন অ্যাসেটস’ বা জব্দ সম্পদের ইস্যু। দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের অর্থনীতি চাপে থাকায় এই সম্পদ এখন রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক আলোচনার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।
১০ এপ্রিল পাকিস্তানে যুদ্ধবিরতি সংক্রান্ত আলোচনা শুরুর আগেই ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বলেন, বিদেশে আটকে থাকা ইরানি সম্পদ মুক্ত না হলে কোনো আলোচনা শুরু করা উচিত নয়। এরপর ইসলামাবাদে বৈঠক চলাকালে কিছু প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, যুক্তরাষ্ট্র কিছু অর্থ ছাড় দিতে রাজি হয়েছে। তবে মার্কিন প্রশাসন দ্রুতই তা অস্বীকার করে জানায়, ইরানের সম্পদ এখনও জব্দ অবস্থায় রয়েছে। আগামী ২২ এপ্রিল মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে নতুন আলোচনা শুরু হতে পারে—এমন সম্ভাবনায় বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে।
ইরানের জব্দকৃত সম্পদের পরিমাণ নিয়ে নির্দিষ্ট তথ্য না থাকলেও দেশটির সরকারি সূত্র ও বিশেষজ্ঞদের অনুমান, বিদেশে আটকে থাকা অর্থের পরিমাণ ১০ হাজার কোটি ডলারের বেশি। মিডল ইস্ট কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের গবেষক ফ্রেডেরিক শ্নাইডার বলেন, এই অর্থ ইরানের বার্ষিক তেল ও গ্যাস আয়ের প্রায় তিন গুণের সমান। তার মতে, দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞার মধ্যে থাকা দেশের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অর্থনৈতিক সম্পদ। তবে তিনি এটিও উল্লেখ করেন, অর্থ ছাড় পেলেও এর ব্যবহার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র শর্ত আরোপ করতে পারে।
ইরান বর্তমানে আলোচনায় অন্তত ৬০০ কোটি ডলার মুক্ত করার দাবি তুলেছে, যা আস্থা বৃদ্ধির একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, অর্থ ছাড় হলেও নানা শর্তের কারণে এর পূর্ণ সুবিধা ইরান পায়নি। ফ্রোজেন অ্যাসেটস বলতে বোঝায় এমন সম্পদ, যা কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা দেশের হলেও নিষেধাজ্ঞা, আদালতের আদেশ বা আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণের কারণে সাময়িকভাবে ব্যবহার বা স্থানান্তর করা যায় না। সমালোচকদের মতে, পশ্চিমা দেশগুলো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের ওপর চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবেও এই ব্যবস্থা ব্যবহার করে থাকে। ইরান ছাড়াও রাশিয়া, উত্তর কোরিয়া, লিবিয়া, ভেনেজুয়েলা ও কিউবার সম্পদও বিভিন্ন সময় এভাবে জব্দ করা হয়েছে।
ইরানের সম্পদ প্রথম জব্দ করা হয় ১৯৭৯ সালে, যখন মার্কিন দূতাবাস জিম্মি সংকটের পর তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার কঠোর পদক্ষেপ নেন। ১৯৮১ সালের আলজিয়ার্স চুক্তির মাধ্যমে কিছু অর্থ ছাড় দেওয়া হলেও এর বিনিময়ে ৫২ জন জিম্মিকে মুক্তি দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে উত্তেজনা বাড়তে থাকায় নিষেধাজ্ঞা আরও বিস্তৃত হয়।
অর্থনৈতিক সংকট, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ও রিয়ালের অবমূল্যায়নের মধ্যে এই বিপুল অর্থ ইরানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সম্পদ মুক্ত হলে দেশটির তেল আয়ের অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনা, মুদ্রা স্থিতিশীল রাখা এবং অবকাঠামো উন্নয়নে বড় ধরনের ভূমিকা রাখতে পারে। তবে একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন জটিলতাও তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কিউএনবি/আয়শা/১৬ এপ্রিল ২০২৬,/বিকাল ৩:২২