আন্তর্জাতিক ডেস্ক : শত বছরের পুরনো এক ঐতিহাসিক ও আত্মিক বন্ধন যেন নতুন করে প্রাণ পেয়েছে কাশ্মীরের উপত্যকায়। ইরানের ওপর চলমান যুদ্ধের ভয়াবহতায় সেখানকার সাধারণ মানুষের আর্তনাদে সাড়া দিয়ে নিজেদের শেষ সম্বলটুকু উজাড় করে দিচ্ছেন কাশ্মীরিরা। গত ২১ মার্চ দক্ষিণ এশিয়ায় যখন পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপিত হচ্ছিল, তখন শ্রীনগরের মাসরাত মুখতারের মতো হাজারো নারী তাদের শখের স্বর্ণালঙ্কার দান করে দিয়েছেন ইরানের যুদ্ধবিধ্বস্ত বেসামরিক মানুষের সহায়তায়। নিজের জন্মদিনে বাবার দেওয়া সোনার দুল জোড়া হাসিমুখে ত্রাণ তহবিলে তুলে দিয়ে মাসরাত প্রমাণ করেছেন যে মানবতার কোনো সীমানা নেই।
চিরাচরিত আনন্দ আর উৎসবের আমেজকে পাশে সরিয়ে রেখে জম্মু ও কাশ্মীরের মানুষ এখন ব্যস্ত ত্রাণ সংগ্রহের কাজে। শ্রীনগরের বাডগাম থেকে শুরু করে উত্তর কাশ্মীরের জেলাগুলোতে চলছে নগদ অর্থ, গৃহস্থালি সামগ্রী এবং ব্যক্তিগত সম্পদ সংগ্রহের এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। এই মানবিক ডাকে সাড়া দিতে গিয়ে ছোট ছোট শিশুরা তাদের বছরের পর বছর জমিয়ে রাখা মাটির ব্যাংক ভেঙে দিচ্ছে। সাধারণ দোকানদার থেকে শুরু করে বড় ব্যবসায়ীরা তাদের আয়ের একটি বড় অংশ তুলে দিচ্ছেন স্বেচ্ছাসেবকদের হাতে, যা এই অঞ্চলের মানুষের গভীর সহমর্মিতার এক বিরল দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কাশ্মীরের সঙ্গে ইরানের এই যোগসূত্র কেবল বর্তমানের যুদ্ধকালীন সংকটের ফল নয় বরং এর শিকড় লুকিয়ে আছে প্রায় ৬০০ বছরের পুরনো ইতিহাসে। চতুর্দশ শতাব্দীতে পারস্যের বিখ্যাত সুফি সাধক মীর সাইয়িদ আলি হামাদানি যখন ইসলাম প্রচারের জন্য ইরান থেকে কাশ্মীরে এসেছিলেন, তখন থেকেই এই অঞ্চলে ইরানি সংস্কৃতি, স্থাপত্য এবং সাহিত্যের প্রভাব পড়তে শুরু করে। এই গভীর ঐতিহাসিক সম্পর্কের কারণেই কাশ্মীরকে দীর্ঘকাল ধরে ‘ইরান-এ-সগির’ বা ছোট ইরান হিসেবে অভিহিত করা হয়। বর্তমান সংকটের মুহূর্তে সেই পুরনো আত্মিক টানই যেন নতুন করে রাজপথে আছড়ে পড়েছে।
শ্রীনগরের জাদিবাল এলাকায় দেখা গেছে এক আবেগঘন দৃশ্য, যেখানে শত শত নারী তাদের রান্নাঘরের তামার তৈজসপত্র দান করছেন। স্থানীয় প্রথা অনুযায়ী এই তামা ও পিতলের আসবাবপত্র মায়েরা তাদের মেয়ের বিয়ের জন্য তিলে তিলে সংগ্রহ করেন। ৭৩ বছর বয়সী তাহেরা জানের মতে, মেয়েরা যুদ্ধে তাদের মা বা বোনকে হারিয়েছেন, তাদের সাহায্য করাই এখন বড় ধর্ম। এমনকি সাকাত আলী মীরের মতো একজন সাধারণ মিনি-ট্রাক চালক তার জীবিকার প্রধান মাধ্যম দুটি ট্রাকের মধ্যে একটি দান করে দিয়েছেন ইরানের শরণার্থী ও আহতদের সহায়তায়।
ইরানের প্রতি এই অভূতপূর্ব ভালোবাসা কেবল শিয়া সম্প্রদায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই বরং সুন্নি পরিবারগুলোও এই মহতী উদ্যোগে শামিল হয়েছে। অনেক সুন্নি পরিবার তাদের ঈদের কেনাকাটা ও খাবারের বাজেট কমিয়ে সেই অর্থ ইরানিদের জন্য পাঠিয়ে দিচ্ছেন। বাডগামের আইনপ্রণেতা আগা সৈয়দ মুনতাজির মেহেদী তার এক মাসের পুরো বেতন এই তহবিলে দিয়েছেন। রাজনৈতিক ভেদাভেদ ভুলে সব দলের নেতারা এবং ধর্মীয় স্কলাররা এই মানবিক আবেদনে সাধারণ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করছেন, যা পুরো উপত্যকায় এক অনন্য সংহতি তৈরি করেছে।
এখন পর্যন্ত পাওয়া স্থানীয় প্রশাসনের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, কাশ্মীর থেকে প্রায় ৬০০ কোটি টাকার সমপরিমাণ সাহায্য সংগৃহীত হয়েছে। এর মধ্যে নগদ টাকা ছাড়াও রয়েছে প্রচুর পরিমাণ স্বর্ণালঙ্কার, গবাদি পশু, সাইকেল এবং জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জাম। দিল্লির ইরান দূতাবাস এই মহানুভবতার জন্য কাশ্মীরি জনগণের প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে। দূতাবাসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, ভারত থেকে পাঠানো মোট ত্রাণের প্রায় ৪০ শতাংশই আসছে এই ছোট্ট উপত্যকা থেকে, যা কাশ্মীরি মানুষের বড় হৃদয়ের পরিচয় দেয়।
তবে এই বিশাল সংগ্রহ অভিযানের মাঝে নিরাপত্তা নিয়ে কিছুটা উদ্বেগ প্রকাশ করেছে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ বিভাগ। যথাযথ অনুমতি বা নথিপত্র ছাড়া সাধারণ মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে যারা টাকা তুলছেন, তাদের বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর আশঙ্কা, এই মানবিক আবেগকে পুঁজি করে কোনো কোনো অসাধু চক্র সংগৃহীত অর্থের অপব্যবহার করতে পারে। তাই সরাসরি ইরান দূতাবাসে অর্থ জমা দেওয়ার জন্য উৎসাহিত করা হচ্ছে এবং স্বেচ্ছাসেবকদের প্রতিটি অনুদানের হিসাব স্বচ্ছতার সঙ্গে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সূত্র: আল জাজিরা
কিউএনবি/অনিমা/১৬ এপ্রিল ২০২৬,/দুপুর ২:৩৮