আন্তর্জাতিক ডেস্ক : অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে ঠাসা লাখ লাখ ডলারের মার্কিন জেটগুলো ইরানের সাধারণ কিছু অস্ত্রের মুখে বড় ধরনের ঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। বিশেষ করে ‘ম্যানপ্যাড’ নামক এক ধরণের কাঁধে রেখে ব্যবহারযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র এখন পেন্টাগনের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলছে। এই অস্ত্রগুলো দামে সস্তা এবং সহজে বহনযোগ্য হলেও যুদ্ধক্ষেত্রে মার্কিন শ্রেষ্ঠত্বকে চ্যালেঞ্জ জানানোর সক্ষমতা রাখে।
সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ইরানের কোনো শক্তিশালী রাডার বা বিমান বিধ্বংসী ব্যবস্থা নেই এবং মার্কিন বিমানগুলো সেখানে নির্বিঘ্নে চলাচল করছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র অনেকটা ভিন্ন বলে মনে করছেন সামরিক বিশেষজ্ঞরা। জানা গেছে, গত ৩ এপ্রিল একটি এফ-১৫ ই এবং একটি এ-১০ ওয়ার্থহগ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়েছে। এছাড়া সৌদি আরবে বেশ কিছু মার্কিন রিফুয়েলিং এয়ারক্রাফট বা জ্বালানি সরবরাহকারী বিমানও আক্রমণের শিকার হয়েছে, যা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বিমান বাহিনীর একচ্ছত্র আধিপত্যের ওপর বড় আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইরানের এই সামরিক শক্তির নেপথ্যে চীন রয়েছে বলে দীর্ঘদিনের অভিযোগ যুক্তরাষ্ট্রের। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দাবি অনুযায়ী, চীন অন্তত ১০০০ ম্যানপ্যাড (বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র) ইরানের কাছে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে। যদিও বেইজিং শুরু থেকেই তেহরানকে কোনো প্রকার অস্ত্র সরবরাহের কথা অস্বীকার করে আসছে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সরাসরি রপ্তানি না করে মধ্য এশিয়ার কোনো তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে চীন এই অস্ত্রগুলো ইরানে পাঠাচ্ছে যাতে ট্রাম্প প্রশাসনের সরাসরি রোষানল থেকে নিজেদের রক্ষা করা যায়।
ম্যানপ্যাড মূলত এমন একটি প্রযুক্তি যা একজন সৈনিক একাই পরিচালনা করতে পারেন এবং এটি ইনফ্রারেড বা তাপ অনুসরণ করে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম। এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর সবচেয়ে বড় ভয়ের জায়গা হলো এদের কোনো নির্দিষ্ট রাডার সিগনেচার নেই। ফলে মার্কিন বোমারু বিমান বা ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে এগুলোকে আগে থেকে শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব। পাহাড়ি দুর্গম এলাকায় বা সাধারণ ঝোপঝাড়ের আড়ালে লুকিয়ে এই অস্ত্র দিয়ে খুব সহজেই নিম্ন উচ্চতায় ওড়া বিমানগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা যায়।
বর্তমানে মার্কিন বিমান বাহিনী উচ্চ উচ্চতায় অপারেশন পরিচালনা করলেও যখনই পদাতিক বাহিনীর সাহায্যের জন্য তাদের নিচের দিকে নামতে হয়, তখনই এই ম্যানপ্যাডগুলো ঘাতক হয়ে ওঠে। ইরানের পাহাড়ি ভূখণ্ড এই ধরণের লুকানো যুদ্ধের জন্য আদর্শ জায়গা হিসেবে পরিচিত। মার্কিন গোয়েন্দাদের মতে, যদি যুক্তরাষ্ট্র ইরানে কোনো স্থল অভিযান শুরু করে, তবে এই ছোট ছোট ক্ষেপণাস্ত্রগুলো মার্কিন ক্যাজুয়ালটি বা ক্ষয়ক্ষতির হার কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। চীনের কিউডাব্লিউ-২ বা কিউডাব্লিউ-১৮ মডেলের ক্ষেপণাস্ত্রগুলোই এখন ইরানের প্রধান শক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অস্ত্র সরবরাহের বাইরেও চীনের অন্যান্য প্রযুক্তিগত সহায়তা পাওয়ার খবর প্রকাশ্যে আসছে। দাবি করা হচ্ছে, ২০২৪ সালে ইরানের রেভোল্যুশনারি গার্ড কোর চিনা গোয়েন্দা স্যাটেলাইট টিইই-০১বি সংগ্রহ করেছিল, সেটি ব্যবহার করে মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়েছে। এমনকি বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী স্টিলথ ফাইটার এফ-৩৫ ধ্বংস করার ক্ষেত্রেও ইরানি প্রকৌশলীরা চীনা একটি টিউটোরিয়াল ভিডিওর সাহায্য নিয়েছিল বলে গুজব ছড়িয়েছে। এই ধরণের সহযোগিতা চীন ও ইরানের মধ্যে গভীর সামরিক সম্পর্কের ইঙ্গিত দেয়।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চীন নিজেদের শান্তি রক্ষাকারী হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইলেও নেপথ্যে তাদের কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা করে চলেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে চিঠি লিখে ইরানে অস্ত্র বিক্রি না করতে অনুরোধ করলেও তাতে বিশেষ কাজ হয়েছে বলে মনে হচ্ছে না। ট্রাম্প যদিও হুমকি দিয়েছেন যে ইরানের কাছে অস্ত্র বিক্রি করলে সংশ্লিষ্ট দেশের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে, তবুও বেইজিং কৌশলে তাদের সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে বলে সামরিক পর্যবেক্ষকদের বিশ্বাস।
সামগ্রিকভাবে ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের এই ছায়াযুদ্ধ এখন একটি জটিল মোড় নিয়েছে। সমুদ্রসীমায় মার্কিন নৌবাহিনীর জন্য চীনা সুপারসনিক অ্যান্টি-শিপ মিসাইল সিএম-৩০২ এর হুমকি যেমন বাড়ছে, তেমনি আকাশে ম্যানপ্যাড মার্কিন পাইলটদের জন্য যমদূত হয়ে দাঁড়িয়েছে। চীনের এই পরোক্ষ হস্তক্ষেপ এবং ইরানের ভৌগোলিক সুবিধা আগামীর যুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। ফলে অত্যাধুনিক সব প্রযুক্তিতে সজ্জিত হওয়া সত্ত্বেও মার্কিন জেটগুলো এখন ইরানের আকাশে নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য হচ্ছে।
এনডিটিভির বিশ্লেষণ
কিউএনবি/অনিমা/১৬ এপ্রিল ২০২৬,/দুপুর ২:২২