ডেস্ক নিউজ : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সশস্ত্র বাহিনীকে আরও শক্তিশালী করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, আমি সশস্ত্র বাহিনীর ফ্যামিলির সন্তান। আমাদের দায়িত্ব রয়েছে যারা দায়িত্বে আছেন তাদের প্রতি। এ সশস্ত্র বাহিনীকে আমরা আরও শক্তিশালী করতে চাই। সশস্ত্র বাহিনী যে কারণে গঠিত হয়েছে, আমরা সেই উদ্দেশ্যই মনে রাখব। আমরা সবাই যেন দেশের জন্য কাজ করতে পারি, ভালো থাকবেন সবাই। জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে বৃহস্পতিবার সশস্ত্র বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা বলেন।
সকাল ৯টায় জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে কুচকাওয়াজ শুরু হয়। অভিবাদন মঞ্চ থেকে সালাম গ্রহণ করেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। সুসজ্জিত মোটর শোভাযাত্রাসহ ১০টার দিকে প্যারেড গ্রাউন্ডে উপস্থিত হন রাষ্ট্রপতি। তাকে অভ্যর্থনা জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী আহমেদ আযম খান, প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. একেএম শামসুল ইসলাম, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ নাজমুল হাসান, বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন ও মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের সচিব ইসরাত চৌধুরী। এর আগে সকাল ৯টা ৫৫ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্যারেড গ্রাউন্ডে পৌঁছালে তাকে স্বাগত জানান মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী এবং তিন বাহিনীর প্রধান। প্রধানমন্ত্রীর পাশে বসে মনোজ্ঞ এ আয়োজন উপভোগ করেন তার কন্যা জাইমা রহমান।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতসহ দেশি-বিদেশি অতিথিবৃন্দ। জাতীয় সংগীত পরিবেশনের পর সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক মো. সাহাবুদ্দিনকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। খোলা জিপে প্যারেড পরিদর্শন করেন তিনি।
কুচকাওয়াজ প্রদর্শনী উপভোগ করতে শিশু-কিশোরসহ নানা বয়সি হাজারো দর্শনার্থী জাতীয় প্যারেড স্কয়ারে জড়ো হন। দর্শনার্থীদের অনেকের হাতে ও মাথায় শোভা পায় লাল-সবুজের জাতীয় পতাকা।
কুচকাওয়াজে উপস্থিত অতিথি ও দর্শনার্থীরা বলেন, দীর্ঘ বিরতির পর এই কুচকাওয়াজ শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি জাতির সাহস, ঐক্য ও অদম্য স্বাধীনতার প্রতীক হয়ে আবারও স্মরণ করিয়ে দিল-এই দেশ অর্জিত হয়েছে অসীম ত্যাগ আর বীরত্বের বিনিময়ে। সঙ্গে নিজ অস্তিত্বের জানান দিল বাংলাদেশ।
২০০৮ সালের পর অর্থাৎ ১৮ বছর পর এবার ২৬ মার্চের আনুষ্ঠানিকতায় যুক্ত হলো এ প্রদর্শনী। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এই কুচকাওয়াজ বন্ধ ছিল। চব্বিশের আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও ২৬ মার্চের কুচকাওয়াজ বা প্যারেড প্রদর্শনী বন্ধ ছিল। তবে ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস উদ্যাপনে এ আয়োজন থাকত। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর এবার স্বাধীনতা দিবসে জাঁকজমকভাবে এ আয়োজন করতে রোজার শুরু থেকে প্যারেড স্কয়ার মাঠে প্রস্তুতি শুরু হয়। মঙ্গলবার ‘চূড়ান্ত রিহার্সেলের’ মাধ্যমে তার প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়।
এক্স-ফোর্সেস অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট লেফটেন্যান্ট (অব.) সাইফুল্লাহ খান সাইফ যুগান্তরকে বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস আমাদের রাষ্ট্রীয় ইতিহাস, ত্যাগ ও গৌরবের প্রতীক। এই দিবস ঘিরে কুচকাওয়াজ ছিল শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং জাতির সামরিক সক্ষমতা, শৃঙ্খলা ও আত্মমর্যাদার এক উজ্জ্বল বহিঃপ্রকাশ। দীর্ঘদিন এই গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য বন্ধ থাকার ফলে একটি শূন্যতা অনুভূত হচ্ছিল, যা আজ পূরণ হলো।
সম্মিলিত বাহিনীর বর্ণাঢ্য কুচকাওয়াজে অভিবাদন মঞ্চ থেকে সালাম গ্রহণ করেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে কুচকাওয়াজের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। মিলিটারি পুলিশের সুসজ্জিত মোটর শোভাযাত্রাসহ ১০টার দিকে প্যারেড গ্রাউন্ডে উপস্থিত হন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে জাতীয় সংসদের স্পিকার, মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, সংসদ-সদস্য, ঊর্ধ্বতন সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতসহ দেশি-বিদেশি অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন।
আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানায়, মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস কুচকাওয়াজ-২০২৬ মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায়, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের নির্দেশনায় এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৯ পদাতিক ডিভিশনের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় অনুষ্ঠিত হয়। কুচকাওয়াজে বীর মুক্তিযোদ্ধা, সশস্ত্র বাহিনী, আধা-সামরিক বাহিনী এবং ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সদস্যরা অংশগ্রহণ করেন। প্যারেড কমান্ডার হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন জেনারেল অফিসার কমান্ডিং ৯ পদাতিক ডিভিশন ও এরিয়া কমান্ডার সাভার এরিয়া মেজর জেনারেল এসএম আসাদুল হক এবং প্যারেড উপ-অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেন ৭১ মেকানাইজড ব্রিগেডের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ শাফকাত-উল-ইসলাম। কুচকাওয়াজে বিভিন্ন বাহিনীর সর্বমোট ২৫টি কন্টিনজেন্ট রাষ্ট্রপতিকে সালাম প্রদান করে।
জাতীয় সংগীত পরিবেশনের পর রাষ্ট্রপতি ও সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক মো. সাহাবুদ্দিনকে সম্মান জানিয়ে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। খোলা জিপে প্যারেড পরিদর্শন করেন তিনি। তার সঙ্গী হিসাবে জিপে ছিলেন প্যারেড অধিনায়ক মেজর জেনারেল এসএম আসাদুল হক। এ সময় বাদ্য দল ‘জন্ম আমার ধন্য হলো’ গানের সুর বাজাতে থাকে। প্রায় ১৫ মিনিটের রাষ্ট্রপতির প্যারেড পরিদর্শনের পর অধিনায়ক আবারও ঘোড়ায় আরোহণ করে রাষ্ট্রপ্রধানকে ধন্যবাদ জানান। এরপর অধিনায়ক কুচকাওয়াজ শেষ করার জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে অনুমতি চেয়ে ঘোড়ায় চড়ে সামনের দিকে এগিয়ে যান। অধিনায়কের নেতৃত্বে প্রত্যেকটি দল রাষ্ট্রপতিকে সালাম প্রদর্শনের জন্য এগিয়ে আসতে থাকে। ছন্দবদ্ধ পায়ে সম্মুখে এই দৃপ্ত যাত্রা, মুষ্টিবদ্ধ হাত আর তাল মিলিয়ে প্রত্যয়ী শপথের এই প্রদর্শনী চলতে থাকে জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে। প্রথমেই খোলা গাড়িতে বহনকারী মুক্তিযোদ্ধাদের কন্টিনজেন্ট এগিয়ে যায়।
মার্চপাস্টের প্রথমে থাকে বিভিন্ন পতাকাবাহী তিনটি কন্টিনজেন্ট। এরপর পর্যায়ক্রমে রাষ্ট্রপতিকে সালাম দিতে দিতে এগিয়ে যেতে থাকে সেনাবাহিনীর বিশেষায়িত ইউনিট প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্ট, সাঁজোয়া রেজিমেন্ট কন্টিনজেন্ট, ইস্ট বেঙ্গল কন্টিনজেন্টসহ সেনাবাহিনীর একাধিক কন্টিজেন্ট। এরপর জাতীয় পতাকাবাহী কন্টিজেন্টের সদস্যরা রাষ্ট্রপতিকে সালাম জানান। দলটি সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় গ্যালারিতে থাকা বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরা সালাম প্রদর্শন করেন আর অন্যান্য দর্শকরা দাঁড়িয়ে সম্মান জানান।
এরপর পর্যায়ক্রমে আসে প্যারাকমান্ডো কন্টিনজেন্ট, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনীসহ একাধিক বাহিনীর কন্টিনজেন্ট। এরপরই ১০ হাজার ফুট উপর থেকে মূল মঞ্চের দুদিকে ২৬ জন প্যারাট্রুপার প্যারেড গ্রাউন্ডে নামেন। প্যারাট্রুপাররা জাতীয় পতাকাসহ বিভিন্ন বাহিনীর পতাকা বহন করেন। এর মধ্যেই মাথার উপরে উড়ে যায় আর্মি অ্যাভিয়েশনের বিমান। পর্যায়ক্রমে আর্মি অ্যাভিয়েশনের বিমান ও হেলিকপ্টার, বিজিবি এয়ার উইংয়ের হেলিকপ্টার, র্যাব এয়ার উইংয়ের হেলিকপ্টার, নেভাল অ্যাভিয়েশনের বিমান ও হেলিকপ্টার উড়ে যায়। এরপর প্যারেড গ্রাউন্ডে একে একে এগিয়ে আসে বিভিন্ন বাহিনীর যান্ত্রিক বহর।
এরপর শুরু হয় কুচকাওয়াজের অন্যতম আকর্ষণ বিমানবাহিনীর ‘অ্যারোবেটিক শো’ মহড়া। ‘বাংলার আকাশ রাখিব মুক্ত’ এই প্রতিপাদ্যে বিমানবাহিনীর যুদ্ধ বিমানসহ প্রশিক্ষণ বিমান ও হেলিকপ্টারগুলো বিভিন্ন ফরমেশনে উড্ডয়ন কৌশল প্রদর্শিত হয়। পাঁচটি এফ-সেভেন যুদ্ধবিমান বর্ণিল রঙ ছাড়তে ছাড়তে প্যারেড গ্রাউন্ড প্রদক্ষিণ করে। ‘লো লেভেল’ ফ্লাইং বিমান প্রদর্শনীর পর যোগ দেয় মিগ-২৯ যুদ্ধবিমান। এই আধুনিক যুদ্ধবিমানটি রাষ্ট্রপতিকে ‘ফ্লাইং স্যালুট’ প্রদর্শন করে। মূল মঞ্চের পেছন দিক থেকে এসে ‘ভিক্টোরি রোল’ প্রদর্শন করে উপরের দিকে মেঘের আড়ালে চলে যায় মিগ-২৯। যেটিকে ‘চূড়ান্ত প্রদর্শনী’ হিসাবে ঘোষণা করা হয়।
কুচকাওয়াজের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয় ১১টা ৫৯ মিনিটে। এরপর রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন প্রদর্শনীতে নেতৃত্ব দেওয়া বিভিন্ন বাহিনীর কর্মকর্তাদের সামনে গিয়ে তাদের সঙ্গে হাত মেলান। পরে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে হাত মিলিয়ে বিদায় জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ১২টা ৬ মিনিটে প্যারেড গ্রাউন্ড ত্যাগ করে রাষ্ট্রপতির গাড়িবহর। এরপর প্রধানমন্ত্রী কর্মকর্তাদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন।
কিউএনবি/আয়শা/২৭ মার্চ ২০২৬,/দুপুর ২:২৫