আন্তর্জাতিক ডেস্ক : মার্কিন বিমানবাহিনীর সমরাস্ত্র ভাণ্ডারে স্টিলথ (রাডার ফাঁকি দিতে সক্ষম) বিমানের আধিপত্য থাকলেও সম্প্রতি আলোচনায় উঠে এসেছে বোয়িংয়ের সেই পুরনো প্রজেক্ট এফ-ফিফটিন এসই সাইলেন্ট ঈগল। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক জ্যাক বাকবি সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখিয়েছেন, কীভাবে ২০০৯ সালের এই কনসেপ্টটি বর্তমান সময়ের যুদ্ধকৌশলে পুনরায় প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে পারত। বিশেষ করে ইরান বা মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে যেখানে রাডার ফাঁকি দেওয়া এবং বিশাল পরিমাণ বোমা বহন করা; উভয়ই সমান গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে সাইলেন্ট ঈগল হতে পারত এক অনন্য সমাধান। আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে পঞ্চম প্রজন্মের বিমানের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও এই ভারী ফাইটারের উপযোগিতা নিয়ে নতুন করে কাটাছেঁড়া শুরু হয়েছে।
সাইলেন্ট ঈগলের মূল বিশেষত্ব ছিল এর গঠনশৈলী যা চতুর্থ প্রজন্মের একটি শক্তিশালী বিমানকে পঞ্চম প্রজন্মের স্টিলথ সক্ষমতা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। বোয়িংয়ের এই নকশায় ব্যবহার করা হয়েছিল কনফরমাল ওয়েপন বে বা অভ্যন্তরীণ অস্ত্রাগার যা সাধারণত এফ-থার্টিফাইভের মতো বিমানে দেখা যায়। এর ফলে বিমানের বাইরে মিসাইল ঝুলে থাকার বদলে পেটের ভেতরে লুকানো থাকত যা রাডার সিগন্যালকে অনেকাংশেই বিভ্রান্ত করতে পারত। এছাড়াও এর খাড়া লেজ বা ভার্টিক্যাল স্ট্যাবিলাইজারগুলোকে কিছুটা কোণাকুণি করে তৈরি করা হয়েছিল যাতে শত্রুপক্ষের রাডার তরঙ্গ সরাসরি প্রতিফলিত হতে না পারে।
তবে প্রশ্ন জাগতে পারে যে এতসব বিশেষত্ব থাকা সত্ত্বেও কেন এই বিমানটি শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখল না। মার্কিন বিমানবাহিনী সাইলেন্ট ঈগলের বদলে বেছে নিয়েছিল এফ-ফিফটিন ইএক্স ইগল টু নামক একটি আধুনিক কিন্তু নন-স্টিলিথ সংস্করণ। এর প্রধান কারণ ছিল সাইলেন্ট ঈগলের ‘সীমিত স্টিলথ’ ক্ষমতা যা কোনোভাবেই এফ-থার্টিফাইভের পূর্ণাঙ্গ অদৃশ্য হওয়ার সক্ষমতাকে টেক্কা দিতে পারছিল না। পেন্টাগন মনে করেছিল যে একটি পুরনো কাঠামোকে জোড়াতালি দিয়ে স্টিলথ বানানোর চেয়ে ডেডিকেটেড স্টিলথ বিমান এবং বিশাল অস্ত্রবাহী সাধারণ বিমানের সংমিশ্রণই হবে যুদ্ধের জন্য বেশি সাশ্রয়ী ও কার্যকর।
বর্তমানের জটিল রণকৌশলে দেখা যায় যে যুদ্ধের প্রথম ধাপে স্টিলথ বিমানগুলো শত্রুর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করে দেয় এবং এরপরই ভারী যুদ্ধবিমানের প্রয়োজন পড়ে। এফ-থার্টিফাইভ বিমানটি রাডার ফাঁকি দিতে পারলেও এর অস্ত্র বহন করার ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে কম। অন্যদিকে সাইলেন্ট ঈগল যদি আজ সার্ভিসে থাকত তবে এটি একইসাথে কিছুটা রাডার ফাঁকি দিয়ে এবং বিশাল পরিমাণ অস্ত্র নিয়ে আক্রমণ চালাতে পারত। এটি মূলত একটি ‘মিসাইল ক্যারিয়ার’ হিসেবে কাজ করতে পারত যা বর্তমানের এফ-ফিফটিন ইএক্স এর চেয়েও বেশি সুরক্ষিত থাকতি।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে সাইলেন্ট ঈগল ছিল একটি হাইব্রিড ধারণা যা সময়ের চেয়ে কিছুটা এগিয়ে ছিল আবার কিছুটা পিছিয়েও ছিল। ২০০৯ সালে যখন এটি উন্মোচন করা হয় তখন অনেক দেশই এফ-থার্টিফাইভের মতো শতভাগ স্টিলথ প্রযুক্তির পেছনে ছুটছিল। ফলে কোনো আন্তর্জাতিক ক্রেতা এই অর্ধ-স্টিলথ বিমানের পেছনে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হয়নি। দক্ষিণ কোরিয়া বা ইসরায়েলের মতো দেশগুলোও শেষ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ পঞ্চম প্রজন্মের বিমানের দিকেই ঝুঁকে পড়েছিল যার ফলে বোয়িংয়ের এই উচ্চাভিলাষী প্রজেক্টটি কেবল একটি প্রোটোটাইপ বা পরীক্ষামূলক সংস্করণ হিসেবেই রয়ে যায়।
ইরানের মতো দেশগুলোর বিরুদ্ধে অভিযানে সাইলেন্ট ঈগলের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে জ্যাক বাকবি বেশ জোরালো যুক্তি দিয়েছেন। ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বর্তমানে আগের চেয়ে অনেক বেশি উন্নত এবং সেখানে কেবল সাধারণ চতুর্থ প্রজন্মের বিমান পাঠানো বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। সাইলেন্ট ঈগলের রাডার শোষণকারী প্রলেপ এবং ভেতরের অস্ত্রাগার একে সাধারণ বিমানের তুলনায় অনেক বেশি টিকে থাকার ক্ষমতা দিত। এটি এমন এক ধরণের বিমান হতে পারত যা শত্রুর রাডারে ধরা পড়ার আগেই বড় ধরণের ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে ফিরে আসতে সক্ষম ছিল।
বর্তমানে মার্কিন বিমানবাহিনী যে এফ-ফিফটিন ইএক্স ব্যবহার করছে তা ২৯,৫০০ পাউন্ড পর্যন্ত অস্ত্র বহন করতে পারে যা এফ-থার্টিফাইভের তুলনায় অনেক বেশি। কিন্তু এই বিমানের কোনো স্টিলথ ক্ষমতা নেই বললেই চলে যার ফলে এটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সবসময় বাড়তি সুরক্ষার প্রয়োজন হয়। সাইলেন্ট ঈগল যদি আজ থাকত তবে পেন্টাগনের হাতে এমন এক অস্ত্র থাকত যা একইসাথে শক্তি এবং গোপনীয়তার ভারসাম্য রক্ষা করত। এটি মূলত ভারী বোমারু বিমান এবং অদৃশ্য ফাইটারের মাঝখানের শূন্যস্থানটি পূরণ করতে পারত যা এখন একটি অপূর্ণ স্বপ্ন হিসেবেই রয়ে গেছে।
কিউএনবি/অনিমা/১২ মার্চ ২০২৬,/সকাল ১১:১৬