শনিবার, ০৭ মার্চ ২০২৬, ০৯:৩৯ অপরাহ্ন
শিরোনাম

অমিত সম্ভাবনার বাংলাদেশ: উন্নয়নের চাবিকাঠি নারীশক্তির হাতেই

Reporter Name
  • Update Time : শনিবার, ৭ মার্চ, ২০২৬
  • ২৮ Time View

ডেস্ক নিউজ : আগামীকাল ৮ মার্চ, আন্তর্জাতিক নারী দিবস। এ বছরের বৈশ্বিক থিম— ‘Rights. Justice. Action. For ALL women and girls’। ২০২৬ সালের এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের জন্য এই প্রতিপাদ্যটি কেবল একটি স্লোগান নয় বরং আমাদের টিকে থাকার এবং এগিয়ে যাওয়ার মূলমন্ত্র। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জেন্ডার স্টাডিজ নিয়ে পড়াশোনার সুবাদে আমি দেখেছি, উন্নত বিশ্ব কিভাবে তাদের জনসংখ্যার অর্ধেক—অর্থাৎ নারীদের—অর্থনৈতিক ও নীতি-নির্ধারণী মূলস্রোতে অন্তর্ভুক্ত করে উন্নয়নের শিখরে পৌঁছেছে। বাংলাদেশের জন্য আজ সেই সময় এসেছে যখন নারী অধিকারকে কেবল মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে নয় বরং একটি অপরিহার্য ‘অর্থনৈতিক ও কাঠামোগত কৌশল’ হিসেবে দেখতে হবে।

বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে নারী শ্রমিকের অবদান আজ সর্বজনবিদিত। কিন্তু আমরা কি জানি, শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ বর্তমানের ৪২.৭% থেকে বাড়িয়ে যদি পুরুষের সমান (৮১%) করা যেত, তবে আমাদের জাতীয় উৎপাদন বা জিডিপি প্রায় ১৪% বৃদ্ধি পেত? ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, এটি অর্থনীতির জন্য প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলারের সমতুল্য। অর্থাৎ, নারীকে ঘরে বসিয়ে রাখা মানেই হচ্ছে অর্থনীতির চাকা অর্ধেক সচল রাখা।

তবে সমস্যাটি এখন আর কেবল অংশগ্রহণের নয় বরং কাঠামোগত। বিবিএস (BBS)-এর তথ্যমতে, এখনো ৯৭% কর্মজীবী নারী অনানুষ্ঠানিক (Informal) খাতে কাজ করেন, যেখানে নেই কোনো চাকরির নিরাপত্তা বা ন্যায্য মজুরি। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে (SME) নারীদের অংশগ্রহণ বাড়লেও মাত্র ৭.২% নিবন্ধিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক নারী। এই বৈষম্য দূর করতে হলে ‘স্মার্ট ফাইন্যান্সিং’ ও জামানতবিহীন ঋণের পরিধি তৃণমূল পর্যন্ত বিস্তৃত করতে হবে। আর এই অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করতে না পারলে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে।

যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনার সময় আমরা একটি টার্ম প্রায়ই পড়তাম— ‘The Gender Wall’। বাংলাদেশের রাজনীতি ও নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে এই দেয়ালটি বেশ উঁচু। যদিও আমাদের দেশে দীর্ঘ সময় নারী নেতৃত্ব ছিল, কিন্তু তৃণমূল বা নীতি-নির্ধারণী উচ্চতর পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ এখনো সীমিত। কাঠামোগত উন্নয়নের অর্থ কেবল বড় বড় দালান তৈরি নয় বরং এমন একটি প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করা যেখানে একজন নারী নির্ভয়ে নীতি নির্ধারণ করতে পারবেন। তবে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এই অংশগ্রহণ তখনই ফলপ্রসূ হবে, যখন সমাজ ও কর্মক্ষেত্র নারীর জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ হয়ে উঠবে।

উন্নয়ন তখনই টেকসই হয় যখন তা নিরাপদ হয়। ২০২৩-২৪ সালের পুলিশি তথ্য ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচের রিপোর্ট অনুযায়ী, নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতা এখনো আমাদের অগ্রযাত্রার পথে বড় অন্তরায়। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ১৫-৪৯ বছর বয়সি প্রায় ৫২% বিবাহিত নারী কোনো না কোনো সময় সঙ্গীর দ্বারা নির্যাতনের শিকার হন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ‘Violence Against Women Act (VAWA)’-এর মতো শক্তিশালী আইনগুলো যেভাবে প্রয়োগ করা হয়, আমাদের দেশেও ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন’ এবং ‘পারিবারিক সুরক্ষা আইন’-এর বাস্তবায়ন ততটাই কঠোর হওয়া প্রয়োজন। নিরাপত্তার অভাব থাকলে নারীর মেধা ও শ্রমের পূর্ণ বিকাশ অসম্ভব। নিরাপত্তার এই সুদৃঢ় ভিত্তিই মূলত নারীদের আধুনিক বিশ্বের নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আত্মবিশ্বাসী করে তুলবে।

২০২৬ সালে বাংলাদেশ যখন এলডিসি (LDC) থেকে চূড়ান্ত উত্তরণ ঘটাবে, তখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে প্রযুক্তিগত দক্ষতা। বর্তমানে আইসিটি ও স্টেম (বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত) খাতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়লেও তা এখনো সন্তোষজনক নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অটোমেশনের এই যুগে আমাদের নারী শক্তিকে যদি ডিজিটাল স্কিল দিয়ে প্রস্তুত না করি, তবে আমরা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ব।

বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিক্রমায় নারী আর কেবল ‘সুবিধাভোগী’ নয়, তারা এখন ‘পরিবর্তনের কারিগর’। ঘরের কাজ থেকে শুরু করে ফ্রিল্যান্সিং কিংবা এভারেস্ট জয়—সবখানেই তারা শক্তির জানান দিচ্ছে। তবে এই সম্ভাবনাকে পূর্ণতা দিতে হলে রাষ্ট্র, সমাজ এবং পরিবারকে একসাথে কাজ করতে হবে। নারীবান্ধব কর্মপরিবেশ, ডিজিটাল নিরাপত্তা এবং সম্পত্তিতে সমানাধিকার নিশ্চিত করাই হোক এবারের নারী দিবসের অঙ্গীকার।

লেখক পরিচিতি: মিনারা নাজমীন, নারী অধিকার ও জেন্ডার সমতা বিশেষজ্ঞ।

 

কিউএনবি/আয়শা/০৭ মার্চ ২০২৬,/রাত ৮:০০

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

March 2026
M T W T F S S
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
2425262728  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit