মঙ্গলবার, ০৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১০:০৬ অপরাহ্ন

‘সুপার-আর্থে’ প্রাণের বিকাশ নিয়ে আরও আশাবাদী হলেন বিজ্ঞানীরা

Reporter Name
  • Update Time : বুধবার, ২৮ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৩৪ Time View

তথ্যপ্রযুক্তি ডেস্ক : সাম্প্রতিক এক গবেষণা অনুযায়ী, সৌরজগতের বাইরের ‘সুপার-আর্থ’ বা পৃথিবীর চেয়ে বড় গ্রহগুলোর ক্ষতিকর বিকিরণ থেকে নিজেদের রক্ষা করার নিজস্ব ব্যবস্থা থাকতে পারে। এর ফলে এসব গ্রহে প্রাণের বিকাশ ও টিকে থাকার সম্ভাবনা আরও জোরালো হচ্ছে। সুপার-আর্থ হলো এমন সব গ্রহ যা আয়তনে পৃথিবীর চেয়ে বড় কিন্তু নেপচুনের চেয়ে ছোট। মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতে এখন পর্যন্ত সন্ধান পাওয়া ভিনগ্রহগুলোর (সৌরজগতের বাইরের গ্রহ) মধ্যে এই ঘরানার গ্রহের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি।

বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেছেন, এসব গ্রহের অনেকগুলোই তাদের নক্ষত্রের ‘বাসযোগ্য অঞ্চলে’ (হ্যাবিটেবল জোন) অবস্থিত। কোনো নক্ষত্র থেকে নির্দিষ্ট দূরত্বে থাকা এই অঞ্চলে তরল পানি থাকা সম্ভব, যা প্রাণের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য অপরিহার্য। আর এ কারণেই কোটি কোটি বছর ধরে এসব গ্রহ প্রাণধারণের অনুকূল পরিবেশ বজায় রাখতে সক্ষম কি না, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। নতুন এই গবেষণা বলছে, অনেক সুপার-আর্থ শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি করতে সক্ষম। তবে পৃথিবীর মতো গ্রহের কেন্দ্রভাগ থেকে নয়, বরং এই চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি হয় কেন্দ্র এবং ম্যান্টলের মাঝামাঝি থাকা গলিত পাথরের একটি স্তর থেকে।

নিউইয়র্কের ইউনিভার্সিটি অব রচেস্টারের আর্থ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও এই গবেষণার প্রধান মিকি নাকাজিমা এক বিবৃতিতে বলেন, ‘‘একটি গ্রহের প্রাণের অস্তিত্বের জন্য শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুপার-আর্থগুলো তাদের কেন্দ্র অথবা ম্যাগমার স্তরে ডায়নামো (চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরির প্রক্রিয়া) তৈরি করতে পারে, যা গ্রহগুলোর বাসযোগ্য হওয়ার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়।’’গবেষকদের মতে, গত ১৫ জানুয়ারি ‘নেচার অ্যাস্ট্রোনমি’ সাময়িকীতে প্রকাশিত এই গবেষণার ফলাফল একটি দীর্ঘদিনের রহস্যের সমাধান করেছে। পৃথিবীর তুলনায় অভ্যন্তরীণ গঠন ভিন্ন হওয়া সত্ত্বেও সুপার-আর্থগুলো কীভাবে চৌম্বক ক্ষেত্র বজায় রাখে, সেই অমীমাংসিত প্রশ্নের উত্তর মিলেছে এই গবেষণায়।

নেচার অ্যাস্ট্রোনমির সিনিয়র এডিটর লুকা মালতাগলিয়াতি এই গবেষণার সারসংক্ষেপ তুলে ধরে এক নিবন্ধে লিখেছেন, ‘‘অন্যান্য অনেক বিষয়ের মতো ভিনগ্রহগুলো চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরির ক্ষেত্রেও যে সৌরজগতের চেনা নিয়ম মেনে চলবে, এমনটা নাও হতে পারে। যেসব গ্রহের ভর পৃথিবীর চেয়ে ৩ থেকে ৬ গুণ বেশি, তাদের চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরির মূল ইঞ্জিনটি পৃথিবীর মতো কেন্দ্রে না থেকে বরং কেন্দ্র ও ম্যান্টলের মধ্যবর্তী কোনো স্তরে থাকতে পারে।’’কোনো গ্রহকে বাসযোগ্য করে তোলার ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী চৌম্বকীয় ঢাল থাকা অপরিহার্য বলে মনে করা হয়। কারণ, এটি নক্ষত্র থেকে আসা প্রবল বায়ুপ্রবাহ বা স্টেলার উইন্ডের ঝাপটা থেকে বায়ুমণ্ডলকে রক্ষা করে এবং গ্রহের পৃষ্ঠকে মহাজাগতিক ক্ষতিকর বিকিরণ থেকে বাঁচায়।

এ ধরনের সুরক্ষা ব্যবস্থা না থাকলে, কোনো গ্রহ নক্ষত্রের বাসযোগ্য অঞ্চলে থাকা সত্ত্বেও সেখানে প্রাণের টিকে থাকার মতো পরিবেশ বজায় রাখা কঠিন হতে পারে। এর অর্থ হলো, ম্যাগমা-চালিত এই চৌম্বক ক্ষেত্রগুলো পুরো ছায়াপথ জুড়ে সুপার-আর্থগুলোকে বাসযোগ্য করে তোলার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র প্রায় ৩০০ কোটি বছরেরও বেশি সময় ধরে সক্রিয় রয়েছে। এটি মূলত তৈরি হয় আমাদের গ্রহের কঠিন অন্তঃকেন্দ্রকে (ইনার কোর) ঘিরে থাকা তরল লোহার স্তরের নড়াচড়ার ফলে। এই কঠিন অন্তঃকেন্দ্রটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি থেকে নির্গত তাপ ও হালকা উপাদানগুলো বাইরের গলিত স্তরকে সচল রাখে, যার ফলে পৃথিবী তার চৌম্বক ক্ষেত্র বজায় রাখতে পারে।

তবে বিজ্ঞানীদের ধারণা, সুপার-আর্থের মতো বড় পাথুরে গ্রহগুলোর কেন্দ্রভাগ পুরোপুরি কঠিন অথবা পুরোপুরি তরল হয়ে থাকে। আর এ কারণেই এসব গ্রহে পৃথিবীর মতো প্রথাগত উপায়ে চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরির প্রক্রিয়াটি বাধাগ্রস্ত হয়। নাকাজিমা এবং তার দল ‘বাসাল ম্যাগমা ওশেন’ (বিএমও) নামক একটি বিকল্প প্রক্রিয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। এটি মূলত কেন্দ্র এবং ম্যান্টলের মাঝে অবস্থিত গলিত পাথরের একটি স্তর। নতুন এই গবেষণা অনুযায়ী, গ্রহ গঠনের প্রাথমিক পর্যায়ে বারবার বড় ধরনের সংঘর্ষের ফলে বিশ্বজুড়ে ম্যাগমা মহাসাগর তৈরি হয়। পরবর্তীতে এই ম্যাগমা আংশিকভাবে স্ফটিক আকারে জমাট বাঁধে এবং এর গভীর স্তরে আয়রন-সমৃদ্ধ গলিত পদার্থ ঘনীভূত হয়ে এমন স্তর তৈরি করে।

বিএমও-চালিত এই ডায়নামো বা চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরির ধারণাটি প্রথম প্রস্তাব করা হয়েছিল পৃথিবীর ইতিহাস ব্যাখ্যা করার জন্য। পৃথিবীর কঠিন অন্তঃকেন্দ্র গঠনের আগে শুরুর দিকে আমাদের গ্রহ কীভাবে চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি করেছিল, তা এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বোঝার চেষ্টা করা হয়। নতুন এই গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, চাঁদ তৈরির সময়কার সেই বিশাল সংঘর্ষের পর পৃথিবীতে এমন একটি স্তরের সৃষ্টি হয়েছিল, যা সম্ভবত প্রায় ১০০ কোটি বছর পর জমাট বেঁধে কঠিন হয়ে যায়। বিপরীত দিকে, সুপার-আর্থগুলো আকারে বড় হওয়ায় এগুলোর অভ্যন্তরে প্রচণ্ড চাপ থাকে। গবেষকদের মতে, এমন পরিস্থিতিতে গ্রহগুলোর গভীরের ম্যাগমা মহাসাগর দীর্ঘ সময় টিকে থাকতে পারে এবং কোটি কোটি বছর ধরে চৌম্বক ক্ষেত্র বজায় রাখতে সক্ষম হয়।

ম্যাগমার এই গভীর স্তরগুলো আসলেই চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে কি না, তা পরীক্ষা করতে নাকাজিমা ও তার দল একটি বিশেষ পরীক্ষা চালিয়েছেন। এই পরীক্ষায় তারা পাথর গঠনকারী উপাদানগুলোকে প্রচণ্ড চাপে সংকুচিত করেন, যা সাধারণত পৃথিবীর চেয়ে কয়েক গুণ বড় গ্রহগুলোর অভ্যন্তরে দেখা যায়। ল্যাবরেটরিতে পাওয়া এই ফলাফলগুলোকে গবেষকরা পরবর্তীতে গ্রহের বিভিন্ন মডেলের সঙ্গে মিলিয়ে দেখেন। এর মাধ্যমে তারা নিশ্চিত হতে চেয়েছেন যে, একটি সুপার-আর্থ কত বড় হলে তা নিজস্ব চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি করতে সক্ষম হবে।

গবেষণায় দেখা গেছে, এমন প্রচণ্ড চাপে আয়রন-সমৃদ্ধ ম্যাগমা ধাতব অবস্থায় রূপ নেয় এবং বিদ্যুৎ পরিবাহীতে পরিণত হয়। এর মাধ্যমে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, যেসব সুপার-আর্থের ভর পৃথিবীর চেয়ে প্রায় তিন থেকে ছয় গুণ বেশি, সেগুলো কয়েকশ কোটি বছর ধরে এই ‘বিএমও-চালিত’ চৌম্বক ক্ষেত্র বজায় রাখতে পারে। এই চৌম্বক ক্ষেত্রগুলো পৃথিবীর মতো শুধু ধাতব কেন্দ্র থেকে তৈরি হওয়া চৌম্বক ক্ষেত্রের চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী এবং সম্ভবত আরও বেশি শক্তিশালী হতে পারে।

সূত্র: স্পেসডটকম। 

 

 

কিউএনবি/খোরশেদ/২৮ জানুয়ারী ২০২৬,/দুপুর ১২:১২

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

February 2026
M T W T F S S
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit