বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬, ০১:৩২ অপরাহ্ন
শিরোনাম

শিক্ষার্থীদের ফের ‘গিনিপিগ’ বানানো হচ্ছে

Reporter Name
  • Update Time : রবিবার, ৪ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৭৬ Time View

ডেস্ক নিউজ : কারিকুলাম ও মূল্যায়ন নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার অন্ত নেই। প্রতিনিয়ত শিক্ষার্থীদের ‘গিনিপিগ’ বানানো হচ্ছে। একটি পদ্ধতি চাপিয়ে দেওয়ার পর তা আবার বাতিল করার ঘটনা ঘটছে। এতে বিপদে পড়ছে শিক্ষার্থীরা।

অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে এসেও প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের ফের ‘গিনিপিগ’ বানানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। এ বছর থেকে প্রাথমিকে নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।

গত ২১ ডিসেম্বর প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) চেয়ারম্যান মো. মাহবুবুল হক পাটওয়ারী স্বাক্ষরিত একটি চিঠি পাঠানো হয়।

প্রাথমিক স্তরে ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তুত করা মূল্যায়ন নির্দেশিকা ২০২৬ অনুমোদন প্রসঙ্গে এই চিঠি পাঠানো হয়। সেখানে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির মূল্যায়ন নির্দেশিকাও যুক্ত করা হয়।

চিঠিতে বলা হয়, শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পর্যায়ের অংশীজন তথা প্রাথমিক স্তরের শ্রেণি শিক্ষক, প্রধান শিক্ষক, পিটিআই ও ইউপিইটিসি ইনস্ট্রাক্টর, সহকারী থানা শিক্ষা কর্মকর্তা, থানা শিক্ষা কর্মকর্তা, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রতিনিধি, জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমির প্রতিনিধি, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি, এনসিটিবির বিশেষজ্ঞ, জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির (এনসিসিসি) সদস্যসহ মূল্যায়ন বিশেষজ্ঞ ও একাডেমিকগণের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব ও মতামতের ভিত্তিতে মূল্যায়ন নির্দেশিকাটি প্রস্তুত করা হয়েছে। প্রাথমিক স্তরে ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে সুষ্ঠুভাবে মূল্যায়ন কার্যক্রম পরিচালনা এবং শিক্ষার্থীদের শিখন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে মূল্যায়ন নির্দেশিকা ২০২৬-এর চূড়ান্ত অনুমোদন ও নির্দেশনা জারি প্রয়োজন।

এনসিটিবির চেয়ারম্যান মো. মাহবুবুল হক পাটওয়ারী বলেন, ‘আমরা প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে একটি মূল্যায়ন নির্দেশিকা পাঠিয়েছি। তবে এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ওই মন্ত্রণালয়ই নেবে।’

অভিভাবকরা বলছেন, ‘২০২৩ সালে নতুন শিক্ষাক্রম চালু করা হয়েছিল। সেখানে পরীক্ষা ছিল না বললেই চলে। এতে প্রতিদিনই নানা শিক্ষা উপকরণ কেনার পেছনে আমাদের দৌড়াতে হয়েছে।

শিক্ষার্থীদের মধ্যে পড়ালেখার বালাই ছিল না। ফ্যাসিস্ট সরকার পতনের পর সেই কারিকুলাম থেকে সরে আসে অন্তর্বর্তী সরকার। ২০১২ সালের কারিকুলাম ও মূল্যায়ন কিছুটা পরিমার্জন করে ২০২৪ সালের আগস্ট মাস থেকে আবার চালু করা হয়। এখন যদি আবার নতুন একটা মূল্যায়ন পদ্ধতি প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয় তা হবে বুমেরাং।’

অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি জিয়াউল কবির দুলু বলেন, “জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আমরা শিক্ষায় কোনো পরিবর্তন চাই না। আমাদের সন্তানদের আমরা আর ‘গিনিপিগ’ বানাতে চাই না। যদি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় মূল্যায়ন নিয়ে নতুন করে কোনো সিদ্ধান্ত নেয় তা হবে ‘হঠকারী সিদ্ধান্ত’।”

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন ধার্য করা হয়েছে। এরপর নতুন যে নির্বাচিত সরকার আসবে স্বাভাবিকভাবে তাদের শিক্ষা নিয়ে ভিন্ন পরিকল্পনা থাকবে। তারা নিশ্চয়ই ২০১২ সালের কারিকুলাম যুগোপযোগী করবে। এ ছাড়া এনসিটিবি জানিয়েছে, তারা ২০২৭ সালের জন্য নতুন কারিকুলাম ও মূল্যায়ন নিয়ে কাজ করছে। ফলে মাত্র এক বছরের জন্য যদি নতুন কোনো মূল্যায়ন পদ্ধতি আনা হয় তাহলে তা হবে শিক্ষার্থীদের ‘গিনিপিগ’ বানানোর পাশাপাশি কয়েক শ কোটি টাকা খরচের মহোৎসব।

মূল্যায়ন নির্দেশিকা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়েছে। নতুন এই পদ্ধতিতে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে আগে শ্রেণি কার্যক্রম থাকলেও ২০২৬ সালে সামষ্টিক মূল্যায়নে (লিখিত পরীক্ষা) যুক্ত করা হয়েছে। তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণিতে শ্রেণি মূল্যায়ন ও সামষ্টিক মূল্যায়নের সঙ্গে নতুন করে ব্যাবহারিক ও মৌখিক পরীক্ষা যুক্ত করা হয়েছে।

প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে বাংলা, ইংরেজি ও গণিতে ধারাবাহিক নম্বর রাখা হয়েছে ৫০ এবং লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় রাখা হয়েছে বাকি ৫০ নম্বর। এই দুই শ্রেণিতে অন্য বিষয়গুলোতে ৫০ নম্বরের মধ্যে ২৫ ধারাবাহিক মূল্যায়নে এবং ২৫ সামষ্টিক মূল্যায়নে রাখা হয়েছে। তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণিতে বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়, বিজ্ঞান ও ধর্ম শিক্ষা বিষয়ে ১০০ নম্বরের মধ্যে ৩০ ধারাবাহিক নম্বর এবং ৭০ সামষ্টিক (লিখিত ও মৌখিক বা ব্যাবহারিক পরীক্ষা) নম্বর রাখা হয়েছে। শিল্পকলা এবং শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য শিক্ষা বিষয়ে ৫০ নম্বরের মধ্যে ধারাবাহিক মূল্যায়নে ১৫ ও সামষ্টিক মূল্যায়নে ৩৫ নম্বর রাখা হয়েছে।   

জানা যায়, এ বছর জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও রোজার কারণে স্বাভাবিকভাবে পাঠদান কার্যক্রম দুই মাস ব্যাহত হবে। নতুন এই মূল্যায়ন প্রস্তাব বাস্তবায়ন করতে শিক্ষকদের ব্যাপক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। এ জন্য তিন-চার মাস সময় প্রয়োজন। ফলে নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতির পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে অন্তত ছয় মাস সময় চলে যাবে। ফলে বাকি ছয় মাসে এই মূল্যায়ন চালুর পর আগামী বছর অর্থাৎ ২০২৭ সালে নতুন কারিকুলাম চালু হলে তা আবার বাতিল হয়ে যাবে। ফলে শিক্ষার্থীদের ‘গিনিপিগ’ হওয়ার পাশাপাশি প্রশিক্ষণ প্রদানে অর্থের অপচয় হবে।

এনসিটিবির একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আগ্রহের পরিপ্রেক্ষিতেই এসংক্রান্ত নির্দেশিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। এখানে এনসিটিবির নিজস্ব মতামত নেই বললেই চলে। সাম্প্রতিক সময়ে এনসিটিবি দুই ভাগ করা নিয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সোচ্চার। তাই এখন যে নতুন কোনো মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু করা ঠিক হবে না, সে ব্যাপারটি নিয়ে এনসিটিবি কোনো বিরোধে যেতে চায়নি।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, একটি মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু করতে গেলে সেখানে প্রশিক্ষণসহ নানা ধরনের খরচের ব্যাপার থাকে। দেখা গেল, এখানে কয়েক শ কোটি টাকার একটি বাজেট থাকবে। একটি প্রকল্প বা কর্মসূচিও হতে পারে। অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে এসে এ ধরনের একটি আয়োজন থেকে বড় অঙ্কের বাণিজ্য করতে চায় একটি সিন্ডিকেট। এ জন্য শিক্ষার্থীদের যা-ই হোক না কেন তারা নতুন এই মূল্যায়ন নির্দেশিকা চূড়ান্ত করতে বদ্ধপরিকর।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবু নূর মো. শামসুজ্জামান বলেন, ‘প্রাথমিকের মূল্যায়ন নির্দেশিকা এখনো খসড়া পর্যায়ে আছে। এ সপ্তাহেই এই নির্দেশিকা নিয়ে মন্ত্রণালয়ে একটি বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। যেহেতু সামনেই জাতীয় সংসদ নির্বাচন, নতুন সরকারের কারিকুলাম নিয়ে ভিন্ন পরিকল্পনা থাকতেই পারে। তাই এ মুহূর্তে নতুন মূল্যায়ন বাস্তবায়নের বিষয়টি অবশ্যই ভেবে দেখার বিষয়। আমরা বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে আলোচনা করব। শিক্ষার্থীদের ক্ষতি হয় এমন কিছু আমরা করব না।’ সূত্র: কালের কণ্ঠ

কিউএনবি /অনিমা/০৪ জানুয়ারি ২০২৬,/সকাল ১১:৫৭

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

August 2026
M T W T F S S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit