রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবীর বিশ্বাস, খালাস পাবেন হাসিনা : রায়ের তারিখ ঘোষণার পর শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের পক্ষে রাষ্ট্র নিয়োজিত আইনজীবী মো. আমির হোসেনও গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন। মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রসিকিউশন থেকে যথেষ্ট সহযোগিতা পেয়েছেন উল্লেখ করে এই আইনজীবী সেদিন বলেন, ‘আমার প্রত্যাশা, আমার ক্লায়েন্টরা (মক্কেলরা) খালাস পাবেন। এটা আমি বিশ্বাস করি।’ বিচারকাজ শেষ করে মামলাটি রায়ের পর্যায়ে নিয়ে আসার জন্য ট্রাইব্যুনালের বিচারকদের ধন্যবাদ জানান আইনজীবী আমির হোসেন।
গত বছরের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের পর মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করা হয়। এরপর চলতি বছরের ২৫ মে থেকে ৮ অক্টোবরের মধ্যে মানবতাবিরোধী অপরাধে যেসব মামলায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে, তার মধ্যে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় করা মামলা আটটি। এর মধ্যে পাঁচটি মামলায় অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরু করেছেন ট্রাইব্যুনাল। বিচারাধীন পাঁচটি মামলার মধ্যে শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে এই মামলাটি ট্রাইব্যুনালের দ্বিতীয় মামলা।
রক্তক্ষয়ী লাগাতার আন্দোলনে গত বছর ৫ আগস্ট পতন ঘটে শেখ হাসিনা সরকারের। এরপর নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান করে গঠন করা হয় অন্তর্বর্তী সরকার। জুলাই অভ্যুত্থানে পতিত সরকার মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে দাবি করে অন্তর্বর্তী সরকার ঘোষণা দেয়, এই অপরাধের বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে করা হবে। ঘোষণা অনুযায়ী পরে ট্রাইব্যুনাল, প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থা পুনর্গঠন করা হয়। পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনাল গত বছর ১৭ অক্টোবর দুই মামলার বিষয়ে প্রথম শুনানি হয়। সেদিন প্রসিকিউশনের আবেদনে ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদেরসহ এই ৪৬ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন
তার আগে গত বছর ১৪ আগস্ট শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশনে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ দাখিল করা হয়। তদন্ত শুরু হয় গত বছর ১৪ অক্টোবর। ছয় মাস ২৮ দিনে তদন্ত শেষ করে গত ১২ মে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। আসামিদের বিরুদ্ধে সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলি (ঊর্ধ্বতনের নির্দেশনার দায়), হত্যা, হত্যাচেষ্টা, ব্যাপক মাত্রায় পদ্ধতিগত হত্যা, অপরাধে প্ররোচনা, উসকানি, সহায়তা, সম্পৃক্ততা, ষড়যন্ত্রসহ অন্যান্য অমানবিক আচরণ, সংঘটিত অপরাধ প্রতিহত না করার মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের পাঁচটি অভিযোগ আনা হয়।
গত ১ জুন প্রসিকিউশন ‘আনুষ্ঠানিক অভিযোগ’ দাখিল করলে তা আমলে নেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এর মধ্যে পলাতক শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খানকে আত্মসমর্পণ করতে ১৬ জুন সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দেওয়া হয়। পরদিন সেই বিজ্ঞপ্তি দুটি জাতীয় সংবাদপত্রে ছাপা হয়। আত্মসমর্পণ না করায় তাঁদের পলাতক দেখিয়ে গত ১০ জুলাই মামলার অভিযোগ করে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। তাঁদের পক্ষে রাষ্ট্রীয় খরচে আইনজীবী মো. আমির হোসেনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। ওই দিন আসামি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন এ মামলার রাজসাক্ষী হতে ট্রাইব্যুনালের কাছে আবেদন করেন। পরে তাঁর আবেদন মঞ্জুর করা হয়। গত ৩ আগস্ট চিফ প্রসিকিউটরের সূচনা বক্তব্যের মধ্য দিয়ে শুরু হয় বিচারকাজ। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাসহ ২৮ কার্যদিবসে ৫৪ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করেন ট্রাইব্যুনাল।
দৈনিক আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান ও জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সাক্ষ্য দেন এ মামলায়। রাজসাক্ষী হিসেবে গত ২ সেপ্টেম্বর সাক্ষ্য দেন আসামি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন। গত ৮ অক্টোবর সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হলে ১২ অক্টোবর থেকে শুরু হয় যুক্তিতর্ক। টানা পাঁচ দিন যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। গত ১৬ অক্টোবর প্রসিকিউশনের যুক্তিতর্ক শেষ হলে ২০ অক্টোবর থেকে আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক শুরু হয়। রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী টানা তিন দিন শেখ হাসিনা-কামালের পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন। সেই ধারাবাহিকতায় গত ২৩ অক্টোবর পাল্টা যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করে দুই পক্ষই। তার আগে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান ট্রাইব্যুনালে সমাপনী বক্তব্য দেন। সেদিন ট্রাইব্যুনাল জানিয়ে দেন বৃহস্পতিবার রায়ের তারিখ ঘোষণা করা হবে।
সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী : শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় ঘিরে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থাকছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী। দিনটি (১৭ নভেম্বর) ঘিরে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের নাশকতামূলক অপতৎপরতা প্রতিহত করতে নেওয়া হয়েছে সমন্বিত নিরাপত্তা ছক। গতকাল দুপুরে পটুয়াখালী সার্কিট হাউসের সামনে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী সাংবাদিকদের জানান, তিনি মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় ঘিরে বিশৃঙ্খলার কোনো শঙ্কা দেখছেন না। তবে দেশজুড়ে অতিরিক্ত সতর্কতা বজায় থাকবে।
এর আগে রায়ের তারিখ ঘোষণার দিন ১৩ নভেম্বর লকডাউন কর্মসূচি ঘিরে চালানো ককটেল হামলা ও আগুনসন্ত্রাসের পুনরাবৃত্তি প্রতিরোধে সারা দেশে পুলিশ সুপারদের (এসপি) বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। যেকোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি মোকাবেলায় রাজধানীর প্রতিটি মোড়ে চোখে পড়ছে র্যাব, পুলিশ, বিজিবি, সেনাবাহিনীসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের সতর্ক অবস্থান। রায়ের দিন আগামীকাল সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আশপাশের এলাকায় কয়েক স্তরের নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে। গত শুক্রবার রাজধানীসহ আশপাশের জেলায় সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ১২ প্লাটুন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়েছে।
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ১৭ নভেম্বর সর্বোচ্চ সতর্ক থাকবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী। নাশকতা ঠেকাতে পুলিশের চেকপোস্ট জোরদার করা হবে। ফুট প্যাট্রলিং ও মোবাইল প্যাট্রলিং বাড়ানো হয়েছে। সার্বক্ষণিক গোয়েন্দা নজরদারি থাকবে সম্ভাব্য সব জায়গায়। রাজধানীর হোটেল, মোটেল, মেস ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে বাসাবাড়িতেও রেড দেওয়া হবে। পুলিশ সদর দপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা জানান, আগুনসন্ত্রাসসহ রায় ঘিরে যেকোনো নাশকতা ঠেকাতে প্রতিদিনই জেলা এসপিদের কড়া নির্দেশনা অব্যাহত রাখা হয়েছে। জেলা ও উপজেলা শহর থেকে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ঢাকামুখী যাত্রা ঠেকাতে আগে যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল, সেটি বহাল রাখা হয়েছে। র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী বলেন, ১৩ নভেম্বর লকডাউন কর্মসূচি ঘিরে র্যাবের যেমন তৎপরতা ছিল, ১৭ নভেম্বর ঘিরেও একই ধরনের তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।